৯ জুলাই ২০০৬ — ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে এমন কিছু ঘটেছিল, যা এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় অনেকের। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে সেদিন নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলতে নামা জিদান খেলা চলাকালীন এক পর্যায়ে মাতেরাজ্জির বুকে মাথা ঠুকে দেন। সাথে সাথেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মাতেরাজ্জি। আর তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয় ফ্রান্স ও ইতালি। ম্যাচের ৭ম মিনিটেই পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন জিদান। কিন্তু ১৯তম মিনিটে হেড থেকে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান মার্কো মাতেরাজ্জি।
৯০ মিনিট শেষে স্কোর ছিল ১-১। অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ চলছিল যখন ঘটে সেই মুহূর্ত—মাঠের মাঝমাঠে হঠাৎ করেই মাতেরাজ্জির বুকে মাথা ঠুকে দেন জিদান। রেফারি হোর্হে লারিওন্ডা প্রথমে ঘটনাটি দেখেননি, তবে সহকারীরা ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভার) এর মতো প্রযুক্তি ছাড়াই ভিডিও রিপ্লে দেখে তাকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড—জিদান বিদায় নেন মাঠ থেকে, ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে।
কেন করেছিলেন এই হেডবাট?
পরে জানা যায়, ম্যাচ চলাকালীন মাতেরাজ্জি জিদানের বোনকে নিয়ে ব্যক্তিগত ও অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন। জিদান জানিয়েছেন, ওই মন্তব্য সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন।
মাতেরাজ্জি অবশ্য স্বীকার করেছিলেন যে কথা-কাটাকাটি হয়েছিল, তবে তিনি দাবি করেন—জিদানের বোন সম্পর্কে “সামান্য” ব্যঙ্গ করেছিলেন মাত্র। যাই হোক, সেই উত্তপ্ত মুহূর্তের ফলাফল হয়ে ওঠে কালজয়ী। ১০ জনের ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে যায় ইতালির কাছে। ৫-৩ ব্যবধানে পেনাল্টিতে জয় পায় ইতালি—তাদের ইতিহাসের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা।
তবে এই কাণ্ড সত্ত্বেও জিদান জিতেছিলেন সেবছর বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল, অর্থাৎ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ব্রাজিল, স্পেন, পর্তুগাল—সব কটি বড় দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনিই। ঘটনার পর গোটা বিশ্বে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। কেউ বলেন “জিদান নিজের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না”, আবার কেউ বলেন “ওই মন্তব্যই ছিল উসকানিমূলক এবং অশালীন, জিদানের প্রতিক্রিয়া মানবিক”।
আজ ৯ জুলাই ২০২৫—ঘটনার ১৯ বছর পরেও সেটি রয়ে গেছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত হিসেবে। ‘জিদানের হেডবাট’ শুধু একটি ঘটনার নাম নয়, এটি ভালোবাসা, রাগ, সম্মানবোধ, এবং আবেগের এক অবিস্মরণীয় বহিঃপ্রকাশ। একজন কিংবদন্তি যেমন ফুটবল দিয়ে হৃদয় জয় করেছিলেন, তেমনি তার এক প্রতিক্রিয়াতেই বিশ্ব হতবাক হয়ে দেখেছিল—সবকিছুর পরেও, তিনিও একজন মানুষ। জিদানের সোনালী শেষ, কিন্তু ছায়াপাতও রয়ে গেল
