বাফুফের খসড়া গঠনতন্ত্রে বড় পরিবর্তন: তিন মেয়াদের বেশি কোনো পদে নয়

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) প্রশাসনিক কাঠামোয় আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তাবিথ আউয়াল গঠনতন্ত্র সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এর ধারাবাহিকতায় ড. মোহাম্মদ জাকারিয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যাদের কাজ ছিল বিদ্যমান গঠনতন্ত্র নতুনভাবে সাজানো। কয়েক মাসের কাজ শেষে তারা যে খসড়া প্রণয়ন করেছেন, সেটি গত শনিবার নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়।

নতুন খসড়ার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো মেয়াদ সীমা। খসড়ার ৩৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে— নির্বাহী কমিটির কোনো পদে টানা বা বিরতি দিয়ে সর্বোচ্চ তিনবার দায়িত্ব পালন করা যাবে। তিন মেয়াদের বেশি কেউ সভাপতি, সহ-সভাপতি বা সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। এই ধারা কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থাকা অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার যুগ শেষ হবে। তবে বিদ্যমান সদস্যদের জন্য বিশেষ ছাড় রাখা হয়েছে। “নতুন গঠনতন্ত্র পাস হওয়ার পরবর্তী নির্বাচন থেকেই মেয়াদ গণনা শুরু হবে” বলে ৯১ অনুচ্ছেদের ট্রানজিশনাল প্রভিশনে উল্লেখ আছে। ফলে বর্তমান নির্বাহী সদস্যরা আবারও প্রার্থী হতে পারবেন।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায়ও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এতদিন সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচিত হতেন সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। খসড়ায় বলা হয়েছে, এসব পদে নির্বাচিত হতে হলে বৈধ ভোটের অন্তত ৫০ শতাংশ পেতে হবে। যেমন, কোনো পদে তিন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে এবং একজন ৪০ ভোট পেলেও, যদি মোট ভোট ১০০ হয়, তবে তিনি নির্বাচিত হবেন না। সর্বনিম্ন ভোট পাওয়া প্রার্থী বাদ গেলে বাকিদের মধ্যে পুনরায় ভোট হবে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না একজন প্রার্থী অর্ধেকের বেশি ভোট পান। অন্যদিকে সদস্য পদে এখনো সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট।

প্রার্থিতার নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। সভাপতি ও সহ-সভাপতি পদে লড়তে হলে এখন ন্যূনতম পাঁচ জন প্রস্তাবক ও সমর্থক প্রয়োজন হবে, যেখানে আগে দুই জন হলেই চলত। সদস্য পদের জন্য পুরোনো নিয়ম বহাল থাকছে।

বয়সসীমার বাধ্যবাধকতা খসড়া থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান গঠনতন্ত্রে ২৫ বছরের নিচে এবং ৭২ বছরের ওপরে হলে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ ছিল না। নতুন নিয়মে বয়স যাই হোক, যে কেউ প্রার্থী হতে পারবেন। এ কারণে চার বারের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনেরও আবার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে।

নির্বাহী কমিটির কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও নারী সদস্যের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত দুই জন নারী থাকতেই হবে। যদিও নারী প্রার্থীরা আলাদা আসনে লড়বেন কি না, নাকি অন্যদের সঙ্গে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন—সে বিষয়ে খসড়ায় অস্পষ্টতা রয়েছে।

খসড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো বিচারিক ও নিয়ন্ত্রক কমিটিগুলোকে স্বাধীন করা। “ডিসিপ্লিনারী, আপিল, নির্বাচন কমিশন ও অডিট কমপ্ল্যায়েন্স কমিটিকে সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে নির্বাচিত করতে হবে”—এমন বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এসব কমিটিতে নির্বাহী সদস্য, ক্লাব কর্মকর্তা, এমনকি আত্মীয় বা ব্যবসায়িক অংশীদারও থাকতে পারবেন না।

এছাড়া খসড়ায় প্রতি বছর চারটি নির্বাহী সভা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এসেছে, যেখানে বিদ্যমান নিয়মে ছিল তিনটি। নির্বাহী কমিটির অর্ধেক সদস্য শূন্য হলে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে পদ পূরণ হবে, তবে সেটি পূর্ণ এক মেয়াদ হিসেবেই গণনা হবে।

ফুটবলের গ্রাসরুট উন্নয়নে কিছু অগ্রগতি থাকলেও বিতর্ক থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ, পাইওনিয়ার লিগকে প্রথমবারের মতো বাফুফের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবে ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি। একইভাবে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতার শীর্ষ তিন দলকে ভোটাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরাসরি ভোটাধিকার পেত।

এখন নির্বাহী কমিটির সদস্যদের এক মাসের মধ্যে খসড়া নিয়ে মতামত দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ফিফার সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে সাধারণ পরিষদে গৃহীত হলে নতুন গঠনতন্ত্র কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো গঠনে এই খসড়া গঠনতন্ত্র তাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

Exit mobile version