বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা মানেই আবেগের আরেক নাম। সেই আবেগ কখনো চোখের জলে ভাসে, কখনো উল্লাসে, আবার কখনো আশ্রয় নেয় ছোট ছোট বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাসেরই এক অনন্য প্রতিচ্ছবি দেখা গেল দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইর সিদ্ধান্তে। স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিতে তিনি স্টেডিয়ামে যাবেন না। হাজারো আমন্ত্রণ, বিশ্বনেতাদের উপস্থিতির সম্ভাবনা-সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে তিনি ফাইনাল দেখবেন নিজের সরকারি বাসভবন থেকেই।
মাইলেইর কাছে এটি কেবল একটি ম্যাচ নয়; এটি বিশ্বাসেরও পরীক্ষা। তাঁর ধারণা, টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সাতটি ম্যাচই তিনি অলিভোস প্রেসিডেন্সিয়াল রেসিডেন্স থেকে একইভাবে দেখেছেন এবং প্রতিবারই দল জিতেছে। সেই সৌভাগ্যের ধারাবাহিকতা ভাঙতে তিনি নারাজ।
স্থানীয় রেডিও এল অবজারভাদর-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাইলেই অকপটেই স্বীকার করেছেন, ফাইনালে মাঠে না যাওয়ার পেছনে কাজ করছে কুসংস্কার বা আর্জেন্টাইনদের ভাষায় ‘কাবালা’। তাঁর ভাষায়, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দিন একটি ভারী তেল কোম্পানির লোগোযুক্ত জ্যাকেট পরে ছিলেন তিনি। গরম লাগায় একবার জ্যাকেট খুলতেই আর্জেন্টিনা গোল হজম করে। পরে আবার জ্যাকেটটি গায়ে চাপিয়ে দেন। এরপর থেকে আর সেটি খোলেননি। তাই ফাইনালের দিনও একই জ্যাকেটই হবে তাঁর ‘সৌভাগ্যের সঙ্গী’।
ফুটবল সংস্কৃতির অংশ
আর্জেন্টিনায় ‘কাবালা’ কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি যেন ফুটবল সংস্কৃতিরই অংশ। কেউ প্রতিটি ম্যাচে একই পোশাক পরে বসেন, কেউ বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রিয় জার্সিটি ধোয়ান না। কেউ আবার ঘরের একই জায়গায় বসে খেলা দেখেন। এমনও বিশ্বাস রয়েছে- যে মুহূর্তে দল গোল করে, তখন যদি কেউ বাথরুমে থাকে, তবে পরের ম্যাচেও তাকে ঠিক সেই সময়টাতেই বাথরুমে থাকতে হবে।

বিশ্বকাপ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা গোল করা শুরু করতেই কয়েকজন সমর্থক বাইবেল পাঠ শুরু করেন। এরপর প্রতিটি ম্যাচেই একই আচার অনুসরণ করেছেন তারা। আবার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের নাম লেখা কাগজ কিংবা ছোট মূর্তি ফ্রিজে রেখে দেওয়ার মতো অদ্ভুত রীতিও অনেক সমর্থকের কাছে সৌভাগ্যের প্রতীক।
মেনেম গিয়েছিলেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে
আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতিদের মাঝেও এই বিশ্বাসের শেকড় অনেক গভীরে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম জাতীয় দলের ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। এরপরই উদ্বোধনী ম্যাচে ক্যামেরুনের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। সেই পরাজয়ের পর মেনেমকে অনেকে ‘মুফা’-অর্থাৎ অশুভ বা অপয়া-বলে আখ্যা দেন। এরপর থেকে দায়িত্বে থাকা কোনো আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্টকে জাতীয় দলের বিশ্বকাপ ম্যাচে মাঠে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি।
তাই স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে হাভিয়ের মাইলেইর সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত কুসংস্কারের গল্প নয়; এটি ফুটবলপ্রেমী একটি জাতির বিশ্বাস, আবেগ ও ইতিহাসেরও প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, অলিভোসের সেই পরিচিত কক্ষে, একই ভারী জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে বসে থাকা প্রেসিডেন্টের ‘কাবালা’ আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপার হাসি উপহার দিতে পারে কি না।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই


