বাংলাদেশের কাছে হারের পর চাপে লাবুশেন, টেস্ট ক্যারিয়ারই কি এবার শঙ্কায়?

বাংলাদেশের কাছে ডারউইনে লজ্জাজনক হারের পর বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে মার্নাস লাবুশেনকে নিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও স্বীকার করেছেন, দলে জায়গা ধরে রাখতে লাবুশেনের এখন ‘বড় রান’ করা জরুরি।

ডারউইনে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে লাবুশেন দুই ইনিংসে করেন ১ ও ৩১ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩১ রান করার সময় তাকে ভালো ছন্দেই দেখা যাচ্ছিল। বল ভালোভাবে দেখছিলেন, প্যাডের ওপরের বল ক্লিপ (ফ্লিক) করছিলেন এবং ব্যাকফুটে গিয়ে সোজা ব্যাটে শট খেলছিলেন। কিন্তু আবারও ইনিংস বড় করতে ব্যর্থ হন তিনি।

এই ৩১ রানই এখন লাবুশেনের জন্য বড় আক্ষেপের কারণ। কারণ, টেস্টে তার সেঞ্চুরি-খরা এখন ৪২ ইনিংসে পৌঁছেছে। সর্বশেষ সেঞ্চুরি করেছিলেন ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। এরপর ৪২ ইনিংসে তার ব্যাটিং গড় মাত্র ২৫ দশমিক ৩২। এই সময়ে পেয়েছেন মাত্র নয়টি ফিফটি।

আবারও বাদ পড়ার শঙ্কা

লাবুশেনকে এর আগে গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তখন তাকে নিজের ব্যাটিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্তভাবে ফিরে আসেন তিনি।

গত মৌসুমের শুরুতে কুইন্সল্যান্ডের হয়ে শেফিল্ড শিল্ড ও ওয়ানডে ক্রিকেট মিলিয়ে মাত্র নয় ইনিংসে পাঁচটি সেঞ্চুরি করেন লাবুশেন। সেই পারফরম্যান্সের জোরেই অ্যাশেজ সিরিজে আবার অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা করে নেন।

অ্যাশেজের শুরুতে দুটি ফিফটি করে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই ব্যাটে রান নেই। সর্বশেষ নয় টেস্ট ইনিংসে তার সংগ্রহ মাত্র ১৬৬ রান, গড় ১৮ দশমিক ৪৪। শেষ চার ইনিংসের তিনটিতে ৩০ রানের ঘর পার করলেও কোনোটিকেই ফিফটিতে রূপ দিতে পারেননি।

তাই বাংলাদেশ সিরিজের পর আবারও নির্বাচকদের কাঠগড়ায় লাবুশেন।

‘শেষ পর্যন্ত ৩১ রানই’

লাবুশেনের ব্যাটিং পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার কোচ ম্যাকডোনাল্ড। তবে তার মতে, ব্যাটিংয়ে উন্নতি কিংবা ভালো শুরুর চেয়ে শেষ পর্যন্ত রানটাই গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যাকডোনাল্ড বলেন, লাবুশেনের দ্বিতীয় ইনিংসের ৩১ রান পর্যন্ত তাকে ভালোই মনে হচ্ছিল। তার মুভমেন্ট ভালো ছিল, প্যাডের বল ঠিকভাবে খেলছিলেন এবং সোজা ব্যাটে ব্যাকফুট থেকে শটও খেলছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি ৩১ রানই। বড় স্কোর নয়।

কোচ আরও জানান, লাবুশেন নিজেও বিষয়টি বুঝতে পারছেন এবং হতাশ। তাকে ফর্মে ফেরাতে শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচিং স্টাফদেরও দায়িত্ব রয়েছে। লাবুশেন যে কিছু পরিবর্তন করেছেন, চাপের মধ্যেও তার কিছুটা প্রয়োগ করতে পেরেছেন—এটি ইতিবাচক দিক। তবে সেই পরিবর্তনের সুফল পেতে হলে সেটিকে বড় রানে পরিণত করতে হবে।

দ্বিতীয়বার বাদ পড়লে ফেরাটা কঠিন

লাবুশেনকে নিয়ে এবারের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অন্যদের তুলনায় বেশি। কারণ, ৩২ বছর বয়সে ৬৪ টেস্ট খেলার পর যদি এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার দল থেকে বাদ পড়েন, তাহলে তার টেস্ট ক্যারিয়ারে ফেরাটা কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও লাবুশেন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। স্টিভেন স্মিথ আর কতদিন টেস্ট খেলবেন, তা নিশ্চিত নয়। তাই স্মিথের বিদায়ের পর তিন নম্বর পজিশনে একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার হিসেবে লাবুশেনকে প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা ছিল অস্ট্রেলিয়ার।

ওয়ানডেতেও একই ধরনের পরিকল্পনা ছিল। স্মিথ ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর লাবুশেনকে দলের পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সফরেও ওয়ানডে দলে তার জায়গা ধরে রাখা হয়েছিল। এমনকি ফর্ম ভালো না থাকলেও তাকে বাদ না দিয়ে ব্যাটিং অর্ডারে সাত নম্বরে নামানো হয়েছিল। কারণ, আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠেয় ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় লাবুশেনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে অস্ট্রেলিয়া।

পরিবর্তনের দাবিতে চাপ বাড়ছে

বাংলাদেশের কাছে হারের পর অস্ট্রেলিয়া দলে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়েছে। তবে কোচ ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, জয় পেলেও দলের পরিবর্তনের দাবি ওঠে, তাই এমন হারের পর সেই দাবি ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

তার মতে, যারা প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারছেন না, তাদের নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

ওয়েদারাল্ডও চাপে

শুধু লাবুশেন নন, অস্ট্রেলিয়ার আরেক ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ডও বড় চাপের মধ্যে রয়েছেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে তিনি করেন ২৩ ও শূন্য রান ।

জেক ওয়েদারাল্ডও টেস্ট শেষে চাপে পড়েছেন।

১২টি টেস্ট ইনিংস শেষে ওয়েদারাল্ডের ব্যাটিং গড় এখন মাত্র ২০ দশমিক ৩৬। অ্যাশেজের পর নিজের ব্যাটিং সেটআপে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। মূলত বারবার এলবিডব্লিউ হওয়ার সমস্যা কাটাতেই এই পরিবর্তন।

কিন্তু নতুন সেটআপের কারণে অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলার সিদ্ধান্তে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনি এমন দুটি বলে আউট হয়েছেন, যেগুলোর একটি এজ হয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে যায় এবং অন্যটি ব্যাটে লেগে স্টাম্পে ফিরে আসে।

ম্যাকডোনাল্ড মনে করেন, ছোট নমুনা দেখে ওয়েদারাল্ডের নতুন পদ্ধতি সফল হয়েছে কি না, এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

বিকল্প ব্যাটার কে?

লাবুশেন ও ওয়েদারাল্ডকে বাদ দিলে অস্ট্রেলিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাদের জায়গায় খেলবেন কে?

বাংলাদেশ সিরিজের সময় ঘরোয়া ক্রিকেটও চলছে না। ফলে নির্বাচকদের হাতে বিকল্প খুব বেশি নেই। ১৩ সদস্যের দলে একমাত্র অতিরিক্ত ব্যাটার জশ ইংলিশ। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মাত্র ছয়বার টপ থ্রিতে ব্যাট করেছেন তিনি।

এর বাইরে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বর্ধিত দলের সঙ্গে অনুশীলন করেছিলেন ম্যাট রেনশ ও কুপার কনোলি।

তিনজনের মধ্যে টপ থ্রিতে খেলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে ৩০ বছর বয়সী রেনশকে। গত শেফিল্ড শিল্ড মৌসুমে ১০ ইনিংসে তিনটি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। ব্যাটিং গড় ছিল ৪৯ দশমিক ৯০, গত মৌসুমে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের মধ্যে শীর্ষ ২৫ জনের মধ্যে যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

ম্যাকেতে রেনশর রেকর্ডও ভালো। সেখানে তিনটি শেফিল্ড শিল্ড ইনিংসের দুটিতেই করেছেন সেঞ্চুরি, ১৭০ ও ১৩৫ রান।

তরুণদের সুযোগের দাবী, কিন্তু বিকল্প সীমিত

বাংলাদেশের কাছে হারের পর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার দাবিও উঠেছে। কিন্তু নির্বাচকদের সামনে সমস্যাও আছে। কারণ, ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের দিক থেকে শক্তিশালী বিকল্প খুব বেশি নেই।

২২ বছর বয়সী কুপার কনোলি দুই মাস আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেছিলেন। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত মাত্র একবার টপ থ্রিতে ব্যাট করেছেন তিনি। এমনকি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এখনো সেঞ্চুরি নেই তার।

স্যাম কনস্টাস ও ক্যাম্পবেল কেলাওয়ে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সাম্প্রতিক প্রস্তুতি ম্যাচেও খুব একটা নজর কাড়তে পারেননি। তবে প্রাক-মৌসুমে নিজেদের নিয়ে কাজ করছেন তারা। ধারণা করা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরের ভারত সফরে অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের সঙ্গে তাদের পাঠানো হতে পারে।

‘পরবর্তী সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’

অস্ট্রেলিয়ার কোচ ম্যাকডোনাল্ডও স্বীকার করেছেন, দলের বয়স, বর্তমান পারফরম্যান্স এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে হারের পর পরিস্থিতি, সবকিছু মিলিয়ে পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হবেই।

তার মতে, এই খেলোয়াড়দের সামনে এখনো অনেক ক্রিকেট বাকি। তবে দল কোন পথে এগোবে, সেটি ঠিক করাই এখন মূল বিষয়।

বাংলাদেশের কাছে ঐতিহাসিক হারের পর অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, সেটিও উল্লেখ করেছেন ম্যাকডোনাল্ড। তার ভাষায়, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট হারানো খেলোয়াড়দের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। এখন আবেগ সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য।

আর সেই পথের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত আসতে পারে লাবুশেন ও ওয়েদারাল্ডকে ঘিরে। ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্টের আগে নির্বাচকদের বৈঠকেই নির্ধারিত হতে পারে তাদের ভবিষ্যৎ।

বিশেষ করে লাবুশেনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি হতে পারে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। একদিকে ৬৪ টেস্টের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে দীর্ঘ সেঞ্চুরি-খরা ও টানা কম রান, বাংলাদেশের বিপক্ষে হারের পর আবারও বাঁচা-মরার লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়ার তিন নম্বর ব্যাটার।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles