বাংলাদেশ-আফগানিস্তান টেস্ট
বাংলাদেশ আফগানিস্তান একমাত্র টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ম্যাচটি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে বড় সংগ্রহ গড়ার সুবিধায় এগিয়ে, কিন্তু আফগানিস্তানের প্রতিরোধ ম্যাচটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশ ৩৪৬ রানে অলআউট হওয়ার পর আফগানিস্তান ২য় দিন শেষে ৪ উইকেটে ২১১ রান করে ১৩৫ রানের পিছিয়ে থাকলেও লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে আর বাংলাদেশ ৩য় দিনে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে অভিজ্ঞতায়।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, ৩৪৬ রানের সংগ্রহকে মোটের ওপর কার্যকর বলা যায়। তবে ইনিংসের শুরুতে যে গতিতে রান উঠেছিল, সেই তুলনায় শেষ দিকে ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা কমে যায় বিশেষ করে অধিনায়ক শান্ত, মুশফিক ও মুমিনুল এই ৩টি উইকেট ৪ রানের ব্যবধানে পড়লে বাংলাদেশ গেম প্ল্যান থেকে ছিটকে যায় তবে লিটন এবং মিরাজ অনেকটাই রিকভার করলেও তাদের যতটা পথ যাওয়া উচিৎ ছিল সে পর্যন্ত দলকে টেনে নিয়ে যেতে পারেননি।

তানজিদের দ্রুত ৮৩ রান বাংলাদেশের ইনিংসকে শক্ত ভিত্তি দেয়। ৮টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংস আফগান বোলারদের শুরুতেই চাপে ফেলে। আবার সাদমান ইসলামের দায়িত্বশীল ব্যাটিং ১১১ বলে ৬৭ রান বাংলাদেশকে ভাল শুরু এনে দেয়। সাদমানের ইনিংস ছিল তুলনামূলক ধীরস্থির। তানজিদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সঙ্গে তাঁর স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের ইনিংসকে ভারসাম্য দিয়েছে।
অন্যুদিকে লিটন দাসের দায়িত্বশীল ব্যাটিং ৫৩ রানে তিনি যেমন ফর্মে ফিরেছেন তেমনি বাংলাদেশকে ৩০০ রানের গণ্ডি পেরোতে সাহায্য করেছে, আবার নাঈম হাসানের অপরাজিত ৩৫ রানও শেষ দিকে দলের সংগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে তাইজুলের কাছে আরেকটু সাপোর্ট পেলে দল আরো ২০ বা ২৫ রান বেশী পেতো।
বাংলাদেশের দুর্বলতা ছিল-শুরুর ভালো অবস্থানকে আরও বড় সংগ্রহে রূপ দিতে না পারা। বিশেষ করে মাঝের দিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারানোয় আফগানিস্তান ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায়। শেষ পর্যন্ত ৩৪৬ রান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহ হলেও, ব্যাটিংয়ের শুরু বিবেচনায় ৩৭০-৪০০ রান হলে বাংলাদেশ আরেকটু নিশ্চিত থাকতে পারতো।
আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংস:
চাপ সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে অনেকটাই সফল বলা যায় কারণ ২য় দিন শেষে আফগানিস্তান ৪ উইকেটে ২১১ রানের সংগ্রহকে খারাপ বলা যাবেনা। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুরুতে উইকেট হারালেও পরবর্তী সময়ে ব্যাটিংয়ে স্থিতি ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। দিন শেষে তারা বাংলাদেশের চেয়ে ১৩৫ রান পিছিয়ে, তবে হাতে রয়েছে ৬টি উইকেট। ইকরাম আলিখিল ক্যারিয়ারের ৩য় টেস্টে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে ২৬ রানে অপরাজিত থেকে অপরাজিত থেকে রহমত শাহকে সঙ্গ দিচ্ছেন। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৭২ রানের জুটি আফগানিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জুটি ভাঙতে না পারায় দিন শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশ আর কোনো উইকেট নিতে পারেনি বাংলাদেশ যদি এই জুটি ভাঙ্গতে পারতো তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্য একটা সফলতা হত কারণ রহমত শাহ ৮৪ রানে অপরাজিত রয়েছেন তিনি ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সাথে আফগানিস্তানের প্রথম টেস্টে ১০২ রান করেছিলেন প্রথম ইনিংসে, টেস্ট ক্রিকেটে ৩টি সেঞ্চুরি ও ৬টি হাফসেঞ্চুরি আছে তার তাই কাল সকালে তার উইকেট দ্রুত নিতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য হুমকি হবে।

আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ের ইতিবাচক দিক হলো, তারা শুরুতে উইকেট হারানোর পর অযথা আক্রমণাত্মক না হয়ে পরিস্থিতি বুঝে খেলেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বোলাররা প্রথম দিকে উইকেট পেলেও দিনের শেষ ভাগে চাপ ধরে রাখতে পারেননি।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে ৩৪৬ রান তোলায় তাদের হাতে এখনো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আগামীকাল ৩য় দিন প্রথম সেশন বা প্রথম ঘন্টায় যদি বাংলাদেশ দলের স্পিনার তাইজুল, নাইম ও মিরাজ টার্ন পেতে পারেন সেক্ষেত্রে লাগামটা পেতে পারে আবার হাসান মাহমুদ ও ইবাদত যদি বিশেষ করে হাসান যদি একটা ব্রেকথ্রু দিতে পারেন তখন আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসবে। বাংলাদেশ যদি ৭০-৮০ রানের লিড ও নিতে পারে সেটাও ম্যাচ জয়ের জন্য অনেক কাজ দিবে।
অপরদিকে আফগানিস্তানের সুবিধা হল ৪ উইকেট হারিয়েও দলটি ইনিংস ভেঙে পড়তে দেয়নি। রহমত ও ইকরামের জুটি তাদের আরও ভালো অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রহমত বড় ইনিংস খেলতে পারেন আর ইকরাম নতুন হলেও সাপোর্ট দিতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে। তারা যদি ১ম সেশন কাটিয়ে দিতে পারেন তাহলে আবার লাগামটা তাদের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
২য় দিন শেষে দু-দলের মূল পার্থক্য হল বাংলাদেশ রান তোলার দিক থেকে এগিয়ে; আফগানিস্তান উইকেট বাঁচিয়ে রাখার দিক থেকে এগিয়ে।
বাংলাদেশের বোলাররা আফগানিস্তানের প্রথম দিকের ব্যাটারদের আউট করে ম্যাচে ভালো শুরু করেছিল। হাসান মাহমুদ ও এবাদত হোসেন উইকেটও পেয়েছেন। কিন্তু রহমত শাহ ও ইকরামের জুটি দিনের শেষ দিকে বাংলাদেশের বোলিংয়ের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী ইনিংসে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে- এক. রহমত শাহকে দ্রুত আউট করা, তিনি দীর্ঘ সময় ব্যাট করলে আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসের ব্যবধান দ্রুত কমে যাবে। দুই. ইকরামের সঙ্গে জুটি ভাঙা, শুধু রান আটকানো নয়, নিয়মিত উইকেট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তিন. বোলিংয়ে ধৈর্য ধরে রাখা, লাইন ও লেংথ ঠিক রেখে অফ স্টাম্পের বাইরে প্রলুব্ধকর বল এবং প্যাড লক্ষ্য করে বল করার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। অতিরিক্ত আলগা বল দিলে ব্যাটাররা সহজে চাপমুক্ত হয়ে যাবে।
তৃতীয় দিন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ যেভাবে বদলাতে পারে:
১. বাংলাদেশ দ্রুত আফগানিস্তানের অবশিষ্ট ৬ উইকেট দ্রুত তুলে নিয়ে তাদের স্কোর ২৫০-২৮০ রানের মধ্যে আটকে রাখতে পারলে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৬৬-৯৬ রানের লিড পাবে। তখন দ্বিতীয় ইনিংসে বড় সংগ্রহ গড়ে ম্যাচে শক্ত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
২. রহমত ও ইকরাম যদি দীর্ঘ সময় ব্যাট করেন এবং আফগানিস্তান ৩০০-৩৪০ রানে পৌঁছে যায়, তাহলে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের লিড অনেকটাই কমে আসবে। ম্যাচে চাপ বাড়বে বাংলাদেশের ওপর।
৩. আফগানিস্তান যদি ৩৪৭ বা তার বেশি রান করে, তাহলে তারা প্রথম ইনিংসে এগিয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ ৪র্থ ইনিংসে এই মাঠে রান করা সহজ হবেনা যার গড় রান ১৩৬ রান।
দ্বিতীয় দিনের শেষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো। প্রথম ইনিংসে ৩৪৬ রান তাদের একটি কার্যকর ভিত্তি দিয়েছে। তবে আফগানিস্তানকে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে রাখতে হলে তৃতীয় দিনে দ্রুত উইকেট নেওয়া জরুরি। আফগানিস্তানের পক্ষে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক রহমত শাহের ৮৪ রানের অপরাজিত ইনিংস এবং ইকরাম আলিখিলের সঙ্গে তাঁর জুটি। এই জুটি ভেঙে দিতে পারলে বাংলাদেশ আবারও ম্যাচে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
সারকথা: বাংলাদেশের পাল্লা ভারী, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতে নেই। তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনই হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়-বাংলাদেশ যদি দ্রুত উইকেট নেয়, তাহলে তাদের সুবিধা বাড়বে; আর আফগানিস্তান যদি বর্তমান জুটি ধরে রেখে ব্যবধান কমায়, তাহলে ম্যাচ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্ত বোলারদের কিভাবে ব্যবহার করে ব্রেকথ্রু তুলে নিবেন সেটা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে অবাক হবোনা।


