বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ফিরে দেখা ২০২৫ । বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ২০২৫ সালটা ছিল বেশ ঘটনাবহুল। ছিল চড়াই, ছিল উৎরাই। কখনো বড় আপসেট, আবার কখনো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। তবে একপাক্ষিকভাবে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। চলুন ফিরে দেখি বাংলাদেশের ক্রিকেটে ২০২৫ ।
২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি
২০২৫ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু হয় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দিয়ে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ২০২৫-এর আসর। এই আসরের ড্রয়ে গ্রুপ ‘এ’-তে পড়ে বাংলাদেশ। গ্রুপের বাকি দলগুলো ছিল ভারত, পাকিস্তান এবং নিউজিল্যান্ড।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফলাফল বাংলাদেশের জন্য একেবারেই শুভকর ছিল না। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই হোঁচট খায় বাংলাদেশ। নিয়মিত উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ২২৮ রানেই গুটিয়ে যায় দল। জবাবে ২১ বল হাতে রেখেই সহজ জয় তুলে নেয় ভারত। এই ম্যাচে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাপ্তি ছিল তাওহীদ হৃদয়ের শতক। তিনি ১১৮ বলে ১০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এই ম্যাচেও আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্তর ৭৭ রান এবং জাকের আলীর ৪৫ রানের ইনিংসের বদৌলতে ২৩৬ রানের পুঁজি দাঁড় করায় দল। ২৩৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ২৩ বল হাতে রেখেই ৫ উইকেটের জয় তুলে নেয় নিউজিল্যান্ড।
বাংলাদেশের শেষ ম্যাচটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। তবে বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি বাতিল হওয়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নেয় দুই দল। কোনো ম্যাচ না জিতেও গ্রুপ ‘এ’-তে ৩ নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে বাংলাদেশ, কারণ পাকিস্তানের চেয়ে নেট রান রেটে এগিয়ে ছিল তারা।
২০২৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ
এপ্রিলে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে ৩ উইকেটের জয় পায় জিম্বাবুয়ে। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে দাপুটে পারফরম্যান্সে ইনিংস ও ১০৬ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। এই সিরিজে ১৫ উইকেট ও ১১৬ রান করে ম্যান অব দ্য সিরিজ হন মেহেদী হাসান মিরাজ।

২০২৫ সালে মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি
মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। এই সিরিজটি সম্ভবত ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন ছিল। প্রথম ম্যাচে জয় পেলেও দ্বিতীয় ম্যাচে আগে ব্যাট করে ২০৫ রান করেও হেরে যায় বাংলাদেশ। বোলার ও ফিল্ডারদের বাজে পারফরম্যান্সে শেষ ওভারে ম্যাচ হারতে হয়। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচেও হার মানে বাংলাদেশ। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হেরেই আমিরাত ছাড়ে দল।

২০২৫ সালে মে মাসেই পাকিস্তানে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ
মে মাসেই পাকিস্তানে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে যায় বাংলাদেশ। সেই সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হেরে ধবলধোলাই হয় দল।
২০২৫ সালে জুলাইয়ে শ্রীলংকা সফর
জুলাইয়ে দুই টেস্ট, তিন ওয়ানডে ও তিন টি-টোয়েন্টির সিরিজ খেলতে শ্রীলংকা সফর করে বাংলাদেশ। সিরিজটির ফলাফল ছিল মিশ্র। প্রথম টেস্ট ড্র করে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে দুই ইনিংসেই শতক হাঁকান নাজমুল হোসেন শান্ত এবং ম্যাচসেরাও হন তিনি। তবে পরের টেস্টে ইনিংস ও ৭৮ রানের ব্যবধানে নাস্তানাবুদ হয় বাংলাদেশ।

শ্রীলংকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ ছিল জমজমাট। প্রথম ম্যাচ জেতে শ্রীলংকা, দ্বিতীয় ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করে ২৪৮ রান করে বাংলাদেশ। তানভীর ইসলামের ঘূর্ণির জাদুতে ২৩২ রানে গুটিয়ে যায় শ্রীলংকা। ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন তানভীর ইসলাম। যদিও শেষ ওয়ানডে হেরে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারে বাংলাদেশ।
টি-টোয়েন্টি সিরিজটি ছিল বাংলাদেশের। প্রথম ম্যাচ হারলেও শেষ দুই ম্যাচ জিতে দারুণ কামব্যাক করে দল। পুরো সিরিজে ১১৪ রান করেন লিটন দাস। রান ও নেতৃত্বের জন্য তাকেই প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ ঘোষণা করা হয়।
জুলাইতেই দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ
জুলাইতেই দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। এই সিরিজেও দাপট দেখায় টাইগাররা। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ নিশ্চিত করে নেয় তারা। যদিও তৃতীয় ম্যাচ জিতে হোয়াইটওয়াশ এড়ায় পাকিস্তান। ফিনিশিংয়ে দারুণ পারফরম্যান্সের জন্য ম্যান অব দ্য সিরিজ হন জাকের আলী।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজ খেলে বাংলাদেশ
এরপর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। এখানেও নেদারল্যান্ডসকে উড়িয়ে দেয় টাইগাররা। বৃষ্টির কারণে শেষ ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ায় ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। ১৪৫ রান করে এই সিরিজে ম্যান অব দ্য সিরিজ হন লিটন দাস।
২০২৫ সালের এশিয়া কাপ
বাংলাদেশের পরবর্তী মিশন ছিল ২০২৫ সালের এশিয়া কাপ। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে ৮টি দল অংশ নেয়। গ্রুপ ‘বি’-তে পড়ে বাংলাদেশ, যেখানে অন্য দলগুলো ছিল শ্রীলংকা, আফগানিস্তান ও হংকং। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত এই আসরে বাংলাদেশের অভিযান শুরু হয় হংকংয়ের বিপক্ষে। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে হংকংকে ১৪৩ রানে আটকে দিয়ে ১৪ বল হাতে রেখেই ৭ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ। ম্যাচসেরা হন লিটন দাস।

পরের ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশ। মাত্র ১৩৯ রান করে দল। জাকের আলীর ৪১ ও শামীম হোসেনের ৪২ রান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। জবাবে ৩২ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটের বড় জয় পায় শ্রীলংকা।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একরকম নকআউট ম্যাচ খেলতে হয় বাংলাদেশকে। আগে ব্যাট করে ১৫৪ রান তোলে দল। নাসুম, তাসকিন ও মুস্তাফিজদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে আফগানিস্তান থামে ১৪৬ রানে। ৮ রানের জয় নিয়ে সুপার ফোর নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
সুপার ফোরে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ছিল শ্রীলংকার বিপক্ষে। ১৬৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় পায় বাংলাদেশ। ৪৫ বলে ৬১ রান করে ম্যাচসেরা হন সাইফ হাসান।
পরের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ৪১ রানে হারে বাংলাদেশ।
শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনালের সমীকরণ থাকলেও ১৩৬ রান তাড়া করতে নেমে ১২৪ রানেই থামে বাংলাদেশের ইনিংস। এভাবেই শেষ হয় বাংলাদেশের এশিয়া কাপ অভিযান।
আফগানিস্তান অধ্যায়
এশিয়া কাপের পর শুরু হয় আফগানিস্তান অধ্যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন ম্যাচের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি সিরিজে আফগানিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। সিরিজসেরা হন নাসুম আহমেদ।
তবে ওয়ানডে সিরিজে ব্যাটারদের ব্যর্থতায় ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয় বাংলাদেশ।

অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ
অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। ওয়ানডে সিরিজে দুটি ম্যাচ জিতে সিরিজ জয় পায় বাংলাদেশ। সিরিজসেরা হন রিশাদ হোসেন, যিনি ১২ উইকেট নেন।
কিন্তু টি- টোয়েন্টিতে গল্প পুরোপুরিই ঘুরে যায়। টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হেরে উল্টো হোয়াইট ওয়াশ হয় বাংলাদেশ।

বছরের শেষ সিরিজ
বছরের শেষ সিরিজ ছিল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। টেস্ট সিরিজে দুটি ম্যাচই জিতে নেয় বাংলাদেশ। ম্যান অব দ্য সিরিজ হন তাইজুল ইসলাম। এই সিরিজের সবচেয়ে বড় হাইলাইট ছিল মুশফিকুর রহিমের শততম টেস্ট ও সেই ম্যাচে তার শতক। টি-টোয়েন্টি সিরিজে প্রথম ম্যাচ হারলেও শেষ দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ জিতে নেয় বাংলাদেশ। সিরিজসেরা হন মেহেদী হাসান।

২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে। ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে শ্রীলংকা ও ভারতের মাটিতে। বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই। এই মেগা টুর্নামেন্টকে সামনে রেখেই ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বর্ষ শেষ করেছে বাংলাদেশ।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩




















