বাস্তবতা, অর্থনীতি ও কাঠামোগত সংকট : একটি হালনাগাদ বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড (BCB) পরিচালিত ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজনগুলো মূলত উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়। ফলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই আয়োজনগুলোতে আয় অপেক্ষা ব্যয় অনেক বেশি হয়। বাস্তবতা হলো, ঘরোয়া ক্রিকেট বাংলাদেশে এখনো একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেলে রূপ নিতে পারেনি।
আসুন জেনে নেওয়া যাক ঘরোয়া ও দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট আয়োজনের আয়-ব্যয় এবং এর পেছনের কাঠামোগত চিত্র।
প্রধান ঘরোয়া আয়োজনসমূহ
- জাতীয় ক্রিকেট লিগ (NCL) – চারদিন ও একদিন ফরম্যাট
- বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (BCL) – চারদিন
- ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (DPL) – লিস্ট ‘এ’
- জাতীয় লিগ টি–২০ / বিসিএল টি–২০
- বয়সভিত্তিক ক্রিকেট (U-14, U-16, U-18)
- নারী ঘরোয়া ক্রিকেট
- বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের টুর্নামেন্ট
- স্কুল ক্রিকেট
এই আয়োজনগুলো জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন, কিন্তু এগুলোকে কখনোই বাণিজ্যিকভাবে সাজানো হয়নি।
ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আয়ের উৎস
ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বিসিবির আয়ের উৎসগুলো অত্যন্ত সীমিত :
- স্পনসরশিপ (খুবই কম)
- লিগ টাইটেল স্পনসর (কিছু নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টে)
- সীমিত বোর্ড ও গ্রাউন্ড বিজ্ঞাপন
- টিভি সম্প্রচার: বাস্তবতা হলো, NCL, BCL, DPL-এর অধিকাংশ ম্যাচের কোনো টিভি সম্প্রচার নেই
- কিছু ম্যাচ ডিজিটাল বা ইউটিউব/ফেসবুক স্ট্রিমিং
- টিকিট বিক্রি: প্রায় নগণ্য; অধিকাংশ ঘরোয়া ম্যাচে দর্শকরা ফ্রি প্রবেশ করে
- অন্যান্য নামমাত্র আয় (রেজিস্ট্রেশন, ফি ইত্যাদি)
ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বার্ষিক মোট আয় (আনুমানিক)
- নন-BPL ঘরোয়া ক্রিকেট: সর্বোচ্চ ৫–৭ কোটি টাকা
- BPL আলাদা একটি ইভেন্ট, যার টিকিট ও স্পনসর আয় তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ BPL বাদ দিলে ঘরোয়া ক্রিকেট কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য রাজস্ব তৈরি করে না।
ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যয়ের প্রধান খাত
ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল যা অপরিহার্য ও বটে। ব্যয়ের খাতসমূহ :
- খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ও ম্যাচ ফি
- ভেন্যু ও স্টেডিয়াম পরিচালনা ব্যয়
- মাঠ প্রস্তুতি (পিচ, আউটফিল্ড, পানি, বিদ্যুৎ)
- নিরাপত্তা ও মেডিক্যাল সাপোর্ট
- হোটেল ও ভ্রমণ ব্যয়
- দল, আম্পায়ার ও ম্যাচ অফিসিয়ালদের যাতায়াত
- আম্পায়ার ও ম্যাচ অফিসিয়াল ফি
- কিউরেটর, গ্রাউন্ডসম্যান ও সহায়ক স্টাফ
- প্রশাসনিক ও লজিস্টিক খরচ
ঘরোয়া ক্রিকেটে বার্ষিক মোট ব্যয় (আনুমানিক) ৮০–৯০ কোটি টাকা
সারসংক্ষেপ :
- মোট আয়: সর্বোচ্চ ৫–৭ কোটি টাকা
- মোট ব্যয়: ৮০–৯০ কোটি টাকা
- বার্ষিক ভর্তুকি/লোকসান: ৭৫–৮০ কোটি টাকা
ঘরোয়া ক্রিকেট লোকসানী হওয়ার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে :
- মাঠে দর্শক প্রায় নেই
- টিভি সম্প্রচার ও মিডিয়া রাইটস নেই
- স্পনসরদের আগ্রহ অত্যন্ত সীমিত
- ঘরোয়া ক্রিকেটকে কখনোই “বিক্রয়যোগ্য পণ্য” হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি
- দুর্বল মার্কেটিং ও পরিকল্পনার অভাব
এই কারণেই ঘরোয়া ক্রিকেটকে বিসিবি ব্যবসা নয়, উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ হিসেবে পরিচালনা করে আসছে বছরের পর বছর ধরে।
দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সিরিজ আয়োজন – আয়-ব্যয়ের একটা আনুমানিক পরিসংখ্যান
আইসিসির Future Tours Programme (FTP) অনুযায়ী বিসিবিকে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজন করতে হয়।
একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের ব্যয় :
সিরিজভেদে আনুমানিক ১৫–২০ কোটি টাকা, যার মধ্যে রয়েছে:
- বিদেশি দলের হোটেল, খাবার ও স্থানীয় যাতায়াত
- আন্তর্জাতিক ভ্রমণ (ফ্লাইট, ভিসা, কার্গো)
- স্টেডিয়াম ও ম্যাচ আয়োজন
- নিরাপত্তা, মেডিক্যাল ও লজিস্টিক
- ICC এলিট ও ইন্টারন্যাশনাল আম্পায়ার
- ব্রডকাস্ট প্রোডাকশন সাপোর্ট (আংশিকভাবে বিসিবির ব্যয়)
- প্রশাসনিক খরচ
দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে আনুমানিক আয় (সিরিজভেদে) :
- ভারত: ১২০–১৫০ কোটি টাকা
- অস্ট্রেলিয়া / ইংল্যান্ড: ১২–১৪ কোটি টাকা
- পাকিস্তান / শ্রীলংকা / দক্ষিণ আফ্রিকা: ৮–১০ কোটি টাকা
- জিম্বাবুয়ে / আয়ারল্যান্ড / ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৫–৬ কোটি টাকা
নেট লাভ / লোকসান :
- ভারত: ১০০–১২০ কোটি টাকা লাভ
- অস্ট্রেলিয়া / ইংল্যান্ড: ৫–৭ কোটি টাকা লোকসান
- পাকিস্তান / শ্রীলংকা / দক্ষিণ আফ্রিকা: ৭–৯ কোটি টাকা লোকসান
- জিম্বাবুয়ে / আয়ারল্যান্ড / ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ১০–১২ কোটি টাকা লোকসান
BCB এসব লোকসানী সিরিজ খেলতে বাধ্য হয় ICC র FTP বাধ্যবাধকতা, র্যাংকিং ও ম্যাচ প্র্যাকটিস, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ঘরোয়া দর্শকের জন্য মাঠে বসে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার সুযোগ করে দেয়ার তাগিদে। যে কারনে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজন বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক কোনো কার্যক্রম নয়; বরং এটি উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের অংশ।
বিসিবি এই লোকসান সামলায় কীভাবে?
বিসিবির মূল আর্থিক ভরকেন্দ্র হলো:
- ICC Revenue Sharing (সবচেয়ে বড় উৎস)
- ভারত সিরিজ ও BPL থেকে অর্জিত আয়
- এশিয়া কাপ ও বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজন
- ব্যাংক সুদ (FDR)
- সীমিত স্পনসরশিপ
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোকে শক্তিশালী করার যৌক্তিক দাবি উঠে যা বিসিবির কাছে প্রায়শই গুরুত্বহীন থেকে যায়। শক্তিশালী ক্রিকেট কাঠামো বলতে এমন একটি সমন্বিত, ধারাবাহিক ও টেকসই ব্যবস্থাকে বোঝায় যার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়মিতভাবে মানসম্মত ক্রিকেটার তৈরি, ধরে রাখা এবং উন্নত করা সম্ভব হয়।
এটি শুধু জাতীয় দল নয়; বরং পুরো ক্রিকেট ইকোসিস্টেম। যার মূল উপাদানই হলো গুড গভর্নেন্স এবং Efficient & Effective Representation। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যার কোনোটাই বিসিবিতে অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাস্তবতা
ঘরোয়া ক্রিকেট আছে, কিন্তু গভীরতা ও ধারাবাহিকতা কম, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট আছে, কিন্তু কোয়ালিটি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল,ঘরোয়া ক্রিকেট আছে কিন্ত দূর্বল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও মার্কেটিং পলিসির কারনে নেই কোন স্পন্সর, সাথে নেই গুড গভর্নেন্স। যে কারনে বাংলাদেশে ক্লাব ক্রিকেটের নির্ভরশীলতা কাটছে না, রিজিওনাল ক্রিকেট কাঠামো গড়ে উঠছে না। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশে প্রতিভা আসে অনিয়মিতভাবে যেটা অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা অন্যান্য দেশগুলোতে আসে নিয়মিতভাবে এবং সিস্টেম থেকে।
শেষ কথা
আমরা দীর্ঘ সময় পার করলে ও ঘরোয়া ক্রিকেটের আবেদন কিংবা জৌলুশ বাড়াতে পারিনি, ক্রিকেটকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারিনি, বানাতে পারিনি ঘরোয়া ক্রিকেট টাকে বিক্রয় যোগ্য পন্য, পারিনি স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেভাবে ক্রিকেটে আকৃষ্ট করতে। শংকার বিষয় হচ্ছে বিপিএল ও দিন দিন এর জৌলস হারাচ্ছে আয়োজনের সাংগঠনিক ও পলিসিগত দূর্বলতার কারনে। বিসিবির দূর্বল ও ভিশনারী মার্কেটিং পলিসির কারনে ও আমরা আর্থিকভাবে আইসিসি থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর দিনদিন নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করতে না পারলে আইসিসির রেভিনিউ শেয়ারিং এর পরিমান ও দিন দিন কমে আসবে।
বর্তমান বাস্তবতা হলো ICC রেভিনিউ শেয়ারিং ছাড়া বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেট বর্তমান কাঠামোতে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে আমরা যদি আইসিসির সাথে নুতন করে বিরোধে জড়িয়ে পড়ি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ক্রিকেট যে আর্থিক সহ নানাবিধ গভীর সংকটে পতিত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আসুন ক্রিকেট কূটনীতির মাধ্যমে বর্তমান চলমান সংকটের সমাধানের পথ খুজে বের করি, নিজেদের সে যোগ্যাতার অভাব থাকলে,পরস্পর কে শ্রদ্ধার পাশাপাশি পরীক্ষিত ও যোগ্যদের সহযোগিতা নেই, আমাদের প্রানপ্রিয় ক্রিকেটটাকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করি।
লেখক পরিচিতি:
সাবেক বিসিবি পরিচালক।
