বাংলাদেশের ক্রিকেট – আয়-ব্যয় ও কাঠামোগত সংকট

বাংলাদেশের ক্রিকেট - আয়-ব্যয় ও কাঠামোগত সংকট

বাংলাদেশের ক্রিকেট - আয়-ব্যয় ও কাঠামোগত সংকট

বাস্তবতা, অর্থনীতি ও কাঠামোগত সংকট : একটি হালনাগাদ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড (BCB) পরিচালিত ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজনগুলো মূলত উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়। ফলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই আয়োজনগুলোতে আয় অপেক্ষা ব্যয় অনেক বেশি হয়। বাস্তবতা হলো, ঘরোয়া ক্রিকেট বাংলাদেশে এখনো একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেলে রূপ নিতে পারেনি।

আসুন জেনে নেওয়া যাক ঘরোয়া ও দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট আয়োজনের আয়-ব্যয় এবং এর পেছনের কাঠামোগত চিত্র।

প্রধান ঘরোয়া আয়োজনসমূহ

এই আয়োজনগুলো জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন, কিন্তু এগুলোকে কখনোই বাণিজ্যিকভাবে সাজানো হয়নি।

ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আয়ের উৎস

ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বিসিবির আয়ের উৎসগুলো অত্যন্ত সীমিত :

ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বার্ষিক মোট আয় (আনুমানিক)

ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যয়ের প্রধান খাত

ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল যা অপরিহার্য ও বটে। ব্যয়ের খাতসমূহ :

ঘরোয়া ক্রিকেটে বার্ষিক মোট ব্যয় (আনুমানিক) ৮০–৯০ কোটি টাকা

সারসংক্ষেপ :

ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আয়ে , ব্যয়ের সারসংক্ষেপ

ঘরোয়া ক্রিকেট লোকসানী হওয়ার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে :

এই কারণেই ঘরোয়া ক্রিকেটকে বিসিবি ব্যবসা নয়, উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ হিসেবে পরিচালনা করে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সিরিজ আয়োজন – আয়-ব্যয়ের একটা আনুমানিক পরিসংখ্যান

আইসিসির Future Tours Programme (FTP) অনুযায়ী বিসিবিকে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজন করতে হয়।

একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের ব্যয় :

একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের ব্যয়

সিরিজভেদে আনুমানিক ১৫–২০ কোটি টাকা, যার মধ্যে রয়েছে:

দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে আনুমানিক আয় (সিরিজভেদে) :

দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে আনুমানিক আয় (সিরিজভেদে)

নেট লাভ / লোকসান :

বাংলাদেশের ক্রিকেট – আয়-ব্যয় ও কাঠামোগত সংকট

BCB এসব লোকসানী সিরিজ খেলতে বাধ্য হয় ICC র FTP বাধ্যবাধকতা, র‍্যাংকিং ও ম্যাচ প্র্যাকটিস, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ঘরোয়া দর্শকের জন্য মাঠে বসে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার সুযোগ করে দেয়ার তাগিদে। যে কারনে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজন বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক কোনো কার্যক্রম নয়; বরং এটি উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের অংশ।

বিসিবি এই লোকসান সামলায় কীভাবে?

বিসিবির মূল আর্থিক ভরকেন্দ্র হলো:

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোকে শক্তিশালী করার যৌক্তিক দাবি উঠে যা বিসিবির কাছে প্রায়শই গুরুত্বহীন থেকে যায়। শক্তিশালী ক্রিকেট কাঠামো বলতে এমন একটি সমন্বিত, ধারাবাহিক ও টেকসই ব্যবস্থাকে বোঝায় যার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়মিতভাবে মানসম্মত ক্রিকেটার তৈরি, ধরে রাখা এবং উন্নত করা সম্ভব হয়।
এটি শুধু জাতীয় দল নয়; বরং পুরো ক্রিকেট ইকোসিস্টেম। যার মূল উপাদানই হলো গুড গভর্নেন্স এবং Efficient & Effective Representation। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যার কোনোটাই বিসিবিতে অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাস্তবতা

ঘরোয়া ক্রিকেট আছে, কিন্তু গভীরতা ও ধারাবাহিকতা কম, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট আছে, কিন্তু কোয়ালিটি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল,ঘরোয়া ক্রিকেট আছে কিন্ত দূর্বল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও মার্কেটিং পলিসির কারনে নেই কোন স্পন্সর, সাথে নেই গুড গভর্নেন্স। যে কারনে বাংলাদেশে ক্লাব ক্রিকেটের নির্ভরশীলতা কাটছে না, রিজিওনাল ক্রিকেট কাঠামো গড়ে উঠছে না। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশে প্রতিভা আসে অনিয়মিতভাবে যেটা অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা অন্যান্য দেশগুলোতে আসে নিয়মিতভাবে এবং সিস্টেম থেকে।

শেষ কথা

আমরা দীর্ঘ সময় পার করলে ও ঘরোয়া ক্রিকেটের আবেদন কিংবা জৌলুশ বাড়াতে পারিনি, ক্রিকেটকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারিনি, বানাতে পারিনি ঘরোয়া ক্রিকেট টাকে বিক্রয় যোগ্য পন্য, পারিনি স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেভাবে ক্রিকেটে আকৃষ্ট করতে। শংকার বিষয় হচ্ছে বিপিএল ও দিন দিন এর জৌলস হারাচ্ছে আয়োজনের সাংগঠনিক ও পলিসিগত দূর্বলতার কারনে। বিসিবির দূর্বল ও ভিশনারী মার্কেটিং পলিসির কারনে ও আমরা আর্থিকভাবে আইসিসি থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর দিনদিন নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করতে না পারলে আইসিসির রেভিনিউ শেয়ারিং এর পরিমান ও দিন দিন কমে আসবে।

বর্তমান বাস্তবতা হলো ICC রেভিনিউ শেয়ারিং ছাড়া বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেট বর্তমান কাঠামোতে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে আমরা যদি আইসিসির সাথে নুতন করে বিরোধে জড়িয়ে পড়ি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ক্রিকেট যে আর্থিক সহ নানাবিধ গভীর সংকটে পতিত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আসুন ক্রিকেট কূটনীতির মাধ্যমে বর্তমান চলমান সংকটের সমাধানের পথ খুজে বের করি, নিজেদের সে যোগ্যাতার অভাব থাকলে,পরস্পর কে শ্রদ্ধার পাশাপাশি পরীক্ষিত ও যোগ্যদের সহযোগিতা নেই, আমাদের প্রানপ্রিয় ক্রিকেটটাকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করি।

লেখক পরিচিতি:
সাবেক বিসিবি পরিচালক।

Exit mobile version