ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর শুরু হতে আর মাত্র কিছুদিন বাকি। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যখন শেষের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ফিফা সংকটের মুখে পড়েছে। বিশ্বের দুই জনবহুল দেশ চীন ও ভারতে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা এখনও কাটেনি। প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের এই বিশাল বাজারে বিশ্বকাপের সম্প্রচার নিশ্চিত না হওয়ায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীন ও ভারতের বাজারে স্থবিরতা কেন?
সাধারণত বিশ্বকাপের অন্তত দুই-তিন বছর আগেই বড় বাজারগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন।
ভারতের চিত্র:
ভারতে স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং বাজারে এখন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে মরীয়া হয়ে কাজ করছে রিলায়েন্স এর (Viachom18/JioCinema) মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে ডিজনি স্টারের সাথে তাদের মার্জার বা একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ার কারণে ফিফার কাঙ্ক্ষিত বিশাল অংকের বিনিময়ে সম্প্রচার স্বত্ব কেনার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না কোনো পক্ষই। ফিফা যে পরিমাণ অর্থ দাবি করছে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করছে।
চীনের পরিস্থিতি:
চীনে ফুটবল জনপ্রিয় হলেও দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের কিছু নতুন নীতিমালার কারণে বড় কোনো নেটওয়ার্ক এখনও ফিফার শর্তে রাজি হয়নি। চীনের কেন্দ্রীয় টেলিভিশন (CCTV) বরাবরই বড় অংক খরচ করলেও এবার তারা দরাদরি করছে অনেক বেশি।
ফিফার উদ্বেগ ও মাথাব্যথার কারণ
ফিফার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো সম্প্রচার স্বত্ব। চীন ও ভারত হলো বিশ্বের সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ও টেলিভিশন বাজার। ফিফা তাদের বাজেটে এই দুই দেশ থেকে শত শত মিলিয়ন ডলার আয় ধরে রেখেছিল।
যে সব চ্যালেঞ্জের মুখে ফিফা?
যদি এই দুই দেশের সাথে চুক্তি না হয়, তবে ফিফা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা ২০২৬ বিশ্বকাপের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় বড় প্রভাব ফেলবে।
কোকাকোলা বা এডিডাসের মতো গ্লোবাল স্পনসররা চায় তাদের ব্র্যান্ড যেন চীন ও ভারতের বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছায়। সেখানে এই দুই দেশে এবারের বিশ্বকাপ সম্প্রচার বন্ধ থাকলে স্পনসররা ভবিষ্যতে চুক্তি নবায়নে অনীহা দেখাতে পারে।
ফিফা ফুটবলকে বিশ্বের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে দিতে চায়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যদি বিশ্বকাপ দেখতে না পারে, তবে ফুটবলের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ফিফার সর্বশেষ অবস্থান
ফিফা বর্তমানে সরাসরি এই দেশগুলোর বড় স্ট্রিমিং জায়ান্টদের সাথে আলোচনা করছে। ভারতের ক্ষেত্রে রিলায়েন্সের পাশাপাশি অ্যামাজন প্রাইম বা নেটফ্লিক্সের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথেও ফিফা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বিশাল এক জনগোষ্ঠী আইনিভাবে বিশ্বকাপ দেখা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
সমাধান কী?
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ফিফাকে হয়তো শেষ পর্যন্ত তাদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে সমঝোতায় আসতে হবে। কারণ চীন ও ভারতের মতো বাজারকে বাইরে রেখে একটি ‘বিশ্বকাপ’ সফল করা প্রায় অসম্ভব।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যদি এই জট না খোলে, তবে ফিফাকে ইতিহাসের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, শেষ মুহূর্তে ফুটবলের জাদুর কাছে বাণিজ্যিক জটিলতা হার মানে কি না।
