ক্রিয়েটর বনাম ওয়াইল্ড ফিনিশার
বিশ্বকাপ শেষ, তবে বিশ্বকাপের রেশ যেন শেষ হইয়াও হইলো না শেষ। কারণ ভক্তদের নানা চাওয়া থেকে পাওয়ার যেন শেষ নেই। খেলোয়াড়দের চেয়ে ভক্ত সমর্থকরাই যেন তার প্রিয় ফুটবলারদের কাছে বেশী পেতে চান আর সেটা হল পারফরম্যান্স গোল অথবা জয় এ কারণেই খেলোয়াড়রা তাদের সাধ্যমত দিতে মরিয়া হয়ে উঠেন বিশ্ব মঞ্চে। বিশ্বকাপে নতুনদের যেমন আগমনী বার্তা থাকে তেমনী আবার পুরনোরা অভিজ্ঞতা বলে হয়ে উঠেন ম্যাচ উইনার। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এইসব ম্যাচ জয়ী তারকাদের মধ্যে স্পেনের লামিনে ইয়ামাল ও ফ্রান্সের এমবাপ্পে ছিলেন মেসির পরেই লাইম লাইটের আলোতে। আর এসব কারনেই মধুর তর্ক আর বাক যুদ্ধে নেমে পড়ে দর কষাকষি করে তাদের সমর্থকরা যে “এমবাপ্পে নাকি ইয়ামাল কে বেশী ট্রফি জিতেছেন” আর তাই ট্রফির হিসেব কষে আমরাও দেখবো আসলেই ফুটবল ক্রিয়েটর বনাম ওয়াইল্ড ফিনিশারের দ্বৈরথে কে এগিয়ে।

খেলার ধরনে ভিন্নতা:
বিশ্বকাপে দু-জনার প্লেইং রোল প্রায় একই ধরনের হলেও খেলার ধরনে কিছুটা ভিন্নতাও ছিল। যেমন ইয়ামালে রাইট উইঙ্গারে খেলে থাকেন অপরদিকে এমবাপ্পে লেফট উইঙ্গার ও স্ট্রাইকার পজিশনে খেলেন। ইয়ামালের খেলার মূল শক্তি হল ড্রিবলিং, ক্রিয়েটিভিটি ও সুযোগ তৈরী করা অপরদিকে এমবাপ্পে তার গতি, ফিনিশিং এ গোল করতে অভ্যস্ত। ইয়ামালের ড্রিবলিং এ ছোট জায়গায় বল পায়ে রেখে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে জাগয়া বের করতে পারার মুন্সিয়ানা আছে, আর এমবাপ্পে গতি ব্যবহার করে ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলেন। ইয়ামাল সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দিতে বেশি দক্ষ, এমবাপ্পে নিজেই গোল করার ক্ষেত্রে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেন।
আক্রমনের ধরন: ইয়ামাল ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা বানিয়ে দেন। এমবাপ্পে বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে নিজেই গোলের দিকে ছুটে যান। পাসিং; ক্রস, কাটব্যাক ও থ্রু পাসে দুর্দান্ত। এমবাপ্পে পাসিং এ ভাল তবে গোল মুখে আক্রমন বেশী করেন। ফাইনাল থার্ডে লামিনে সতীর্থকে দিয়ে গোল করান, এমবাপ্পে নিজেই গোল করতে ভালো বাসেন।
ইয়ামালের ফিনিশিং উন্নতিশীল আর এমবাপ্পে ইতি মধ্যে প্রমানিত হয়েছেন সারাবিশ্বে। শারিরিক বৈশিষ্ট্য ইয়ামালের যেমন তাতে সে টেকনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত খেলায় বেশি নির্ভরশীল আর এমবাপ্পে গতি ও শক্তির অসাধারণ সমন্বয়ে বেশ পারদর্শী। এক কথায় বলা যায় ইয়ামাল হলেন ক্রিয়েটর আর এমবাপ্পে ওয়াইল্ড ফিনিশার। তবে ইয়ামাল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোলস্কোরিংয়ে আরও কার্যকর হয়ে উঠছেন, আর এমবাপ্পেও শুধু গোলস্কোরার নন-প্রয়োজনে আক্রমণ তৈরি করতেও পারেন।

বিশ্বকাপ জয়: ২০১৭ সালে ফ্রান্স জাতীয় দলে অভিষেকের পর এমবাপ্পে ১০৬ ম্যাচে ৬৬ গোল করেছেন আর লামিনে ইয়ামালের স্পেন জাতীয় দলে ২০২৩ সালে অভিষেক হওয়ার পর ৩৩ ম্যাচ খেলে ৭ গোল কটরেছেন। দুজনেই বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য হয়েছেন। এমবাপ্পে ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে আর সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপ জিতে স্পেনের হয়ে ইয়ামাল।
ট্রফি জয়ে কে এগিয়ে: কিলিয়ান এমবাপ্পের আন্তর্জাতিক খেলা শুরুর ৬ বছর পর লামিনে ইয়ামালের অভিষেক হয়েছে আর এরই মধ্যে ইয়ামাল এখন পর্যন্ত মোট ৮টি বড় ট্রফি জিতেছেন জাতীয় দল ও ক্লাবের সিনিয়র দলের হয়ে যথা- লা লিগা-৩ বার, কোপা দেল রে-১ বার, স্প্যানিশ সুপার কাপ-২ বার, ইউরো-১ বার এবং বিশ্বকাপ-১ বার। অপরদিকে এমবাপ্পে জাতীয় দল ও সিনিয়র ক্লাব দলের হয়ে মোট ২১টি ট্রফি জিতেছেন যথা- জাতীয় দলের হয়ে ফিফা বিশ্বকাপ ও উয়েপা নেশন্স লিগ। ক্লাব ফুটবলে মোনাকোর হয়ে লিগ-১ একবার, পিএসজির হয়ে লিগ-১ ৬বার, কুপ দে ফ্রান্স ৪ বার, কুপ দেলা লিগ ২ বার, ফরাসি সুপার কাপ ৩ বার, অপরদিকে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বাপ্পে ৩টি শিরোপা ঘরে তুলেছেন যথা- উয়েফা সুপার কাপ, ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ এবং স্প্যানিশ সুপার কাপ।
যেখানে এগিয়ে ইয়ামাল: আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর ইয়ামাল তার ক্যারিয়ারের সবগুলো অর্থাৎ ৮টি শিরোপা জিতেছেন আর এই সময়ে এমবাপ্পে জিতেছেন ৬টি আরেকটু খোলাসা করা যাক ব্যাপারটি। ২০২৩ সাল থেকে এমবাপ্পে মোট ৬টি শিরোপা জিতেছেন আর ইয়ামাল তার ক্যারিয়ারের সবগুলোই ৮টি জিতেছেন একই সময়ের মধ্যেই। তবে এই হিসেবটা মুখ্য নয়। কারণ ট্রফি জয়ের হিসেব করলে অভারঅল পুরো ক্যারিয়ারের সবগুলো ট্রফির হিসেবই ধরা হবে।
সারকথায় বলা যায় এমবাপ্পে খুবই ডিসিপ্লিন ফুটবলার হিসেবে সামনে হয়তো আরো ২টি বিশ্বকাপ তিনি খেলবেন বর্তমান বয়স ২৭ বছর, আর ক্লাব ফুটবল তো আছেই। অপরদিকে ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৯ এই বয়সে ৮টি শিরোপা কম ব্যাপার নয় সামনে আরো ৩টি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা রয়েছে যদি তিনি ডিসিপ্লিন থাকেন। এ কারণেই বলা যে তিনি এখনই যেভাবে চলাফেরা করছেন তাতে তার লাইফ স্টাইল অনেকটাই নেইমারের মত মনে হচ্ছে। ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করতে না পেরে আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে তার ক্যারিয়ার। তবে এমবাপ্পে ও ইয়ামাল দু-জনেই বিশ্ব ফুটবলের মহা তারকা তাতে কোন সন্দেহ নেই দু-জনের জন্যই রইল শুভ কামনা।


