৪০ বছর পর বিশ্বকাপের খুব কাছে ইরাক

২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর আবুধাবির মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্টেডিয়ামে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এশিয়ান বাছাইপর্বের ফুটবল ম্যাচের আগে ইরাকের খেলোয়াড়দের ফটোসেশন।

২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর আবুধাবির মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্টেডিয়ামে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এশিয়ান বাছাইপর্বের ফুটবল ম্যাচের আগে ইরাকের খেলোয়াড়দের ফটোসেশন।(ছবি: গেটি ইমেজেস)

প্লে-অফের ফাইনালে ইরাক

ইতোমধ্যে আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে ইরাক। তাদের সামনে এখন শেষ বাধা লাতিন আমেরিকার দল বলিভিয়া। ৩১ মার্চ মেক্সিকোর মন্টেরি শহরে অনুষ্ঠিত হবে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। সেখানে জয় পেলেই ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের খুব কাছে ইরাক পৌঁছে যাবে । প্রায় চার দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটবে, যা দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।

সংকট পেরিয়ে বিশ্বকাপের দ্বারপ্রান্তে ইরাক

রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, দুর্বল অর্থনীতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বহুমুখী সংকটে দীর্ঘদিন ধরেই বিপর্যস্ত ইরাক। এমন একটি দেশের ফুটবলে এতটা উন্মাদনা থাকতে পারে এই বিষয়টি-ই অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু সেই বাস্তবতাই সামনে এসেছে অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আরনল্ড-এর অভিজ্ঞতায়। তিনি যখন ইরাক জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব নেন, তখন অনেকেই বলেছিলেন যে, এই দলকে বিশ্বকাপে তোলা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হবে। অথচ সেই দল এখন বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন থেকে মাত্র এক ম্যাচ দূরে দাঁড়িয়ে।

এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আরনল্ড বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাকে সতর্ক করা হয়েছিল কাজটির কঠিনতা নিয়ে। ৪০ বছর ধরে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে না পারা একটি দলকে পুনরুজ্জীবিত করা সহজ নয়। তার ওপর প্রায় ৪৬ মিলিয়ন মানুষের ফুটবলপ্রেম। যেখানে প্রত্যাশা ও চাপ দুটোই থাকে আকাশছোঁয়া। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, এই আবেগই ইরাককে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আরনল্ডের নিজের অভিজ্ঞতাও অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি আগে তার নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়া-কে বিশ্বকাপে তুলেছিলেন এবং সেই মুহূর্ত দেশের মানুষের জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলেছিল তা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তার মতে, ইরাকের মানুষও ঠিক তেমনই আবেগপ্রবণ এবং ফুটবলপ্রেমী। অতীতে কোচিং কিংবা প্রতিপক্ষ হিসেবে ইরাকের বিপক্ষে খেলার সময় তিনি তাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই পেয়েছেন।

ইরাকের দীর্ঘদিন বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকার পেছনে অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন-এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দেশটি আরও অস্থির হয়ে পড়ে। যদিও ২০০৭ সালে তারা এশিয়ান কাপ জিতে ইতিহাস গড়েছিল, তারপরও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ

বর্তমানে দলকে বাইরের চাপ ও নেতিবাচক আলোচনা থেকে দূরে রাখতে খেলোয়াড়দের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন আরনল্ড। গত নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে জায়গা নিশ্চিত করার পথে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে শেষ মুহূর্তের গোলে হারানোর পর পুরো দেশ উৎসবে মেতে ওঠে। রাজধানী বাগদাদ-এর রাস্তায় নেমে আসে হাজারো মানুষ যাদের হাতে ছিলো জাতীয় পতাকা। আর এসবই প্রমাণ করে ফুটবল তাদের জন্য কতটা আবেগের।

আরনল্ড জানান,

ইরাকে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রায় সাত মাস বাগদাদে কাটিয়েছেন, যাতে দেশটির সংস্কৃতি ও মানুষের মনোভাব ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তবে জনসমাগমের কারণে তার ব্যক্তিগত জীবন প্রায় নেই বললেই চলে। বাইরে বের হলেই ভক্তদের ভিড়ে পড়তে হয়, সবাই ছবি তুলতে চায়।

সবশেষে তিনি বলেন,

ইরাক এখনো বিশ্বকাপে উঠেনি, তাই কাজ শেষ হয়নি। তবে খেলোয়াড়দের নিবেদন ও দেশের মানুষের আবেগই তাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই ঐতিহাসিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরাক কি না চার দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে।

Exit mobile version