ইতালি কি জিদানের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে?

ইতালি কি জিদানের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে

ইতালি কি জিদানের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে

ইতালি কি জিদানের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে ? ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতান জিনেদিন জিদান। ২০০৬ আসরেও ফরাসি কিংবদন্তি তারই পুনরাবৃত্তি করার পথে ছিলেন। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে সেই স্মরণীয় ও নাটকীয় রাতে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা হয়তো এমন হবে আশা ছিল না তার। প্রতিপক্ষ ফুটবলারকে ঢুস মেরে জিদানের লাল কার্ড দেখার পাশাপাশি ফ্রান্সের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আশাও অনেকটাই শেষ হয়ে যায়। ২০ বছর পর সেই ঘটনা আবারও ফুটবলাঙ্গনের আলোচনায়।

২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৮ দল চূড়ান্ত হয়েছে একদিন আগে। যেখানে নাম নেই চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালির। টানা তৃতীয়বার তারা বিশ্বকাপের মূলপর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। বাছাইয়ের প্লে-অফে ৬৬তম র‌্যাঙ্কিংধারী বসনিয়া হার্জেগোভিনার কাছে পেনাল্টি শ্যুটে আবারও হৃদয় ভাঙার গল্প লিখল আজ্জুরিরা। ইতালির এমন বিপর্যয়ে দেশটির ফুটবল ভক্ত, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে হতাশার অন্ধকার নেমেছে। এরই মাঝে ফুটবলভক্তদের কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে স্মরণ করছেন জিদানের সেই ঢুস মারার দৃশ্য। ওই আসরে জিতলেও এরপর থেকে ইতালির ফুটবল ব্যর্থতার বৃত্তে আটকা পড়েছে!

সমর্থকরা বলছেন,

এটি খুবই বেদনার। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল দল বারবার হৃদয় ভাঙার ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর পেছনে সঠিক কারণ কিংবা ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোরই উপায় কী? এই আলোচনা আসলেই কি চারবারের চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে?

আবার কারও মতে, জিদানের ‘অভিশাপের’ ঘটনা আসলেই বাস্তবিক। সেই অভিশাপ কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে সেটাও জিজ্ঞাসা ইতালিয়ান ভক্তদের।

তিন আসরে নেই সাবেক চ্যাম্পিয়ন

এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হলো ইতালি। ২০১৪ আসরের পর আর বিশ্বকাপ খেলা হয়নি তাদের। সাবেক চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে ইতালিই প্রথম দল, যাদের টানা তিন বিশ্বকাপে দেখা যাবে না। ২০০৬ সালে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের পর আরও দুই আসরে খেলে আজ্জুরিরা। ২০১০ ও ২০১৪ দুই আসরেই তাদের বিদায় হয় গ্রুপপর্ব থেকে। ২০১০ এ গ্রুপপর্বে টেবিলের তলানিতে, এরপর গ্রুপপর্বের তিনে থেকে। এর পরের তিন আসরে দেখতে হবে দর্শক সারি থেকে।

দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘গ্যাজেটা দেল্লো স্পোর্ত’ তাদের প্রথম পাতার সম্পাদকীয়তে সবশেষ ব্যর্থতাকে ‘তৃতীয় মহাপ্রলয়’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদান (বামে) বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ইতালি ও ফ্রান্সের মধ্যে ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করার পর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।
ছবি: জন ম্যাকডুগল / এএফপি (গেটি ইমেজেসের মাধ্যমে)

আরেক প্রথম সারির পত্রিকা ‘কোরিয়েরে দেল্লা সেরা’ ইতালির এই অবস্থার বর্ণনায় লিখেছে– বিশ্বকাপ অভিশাপ। কারণ ২০০৬ আসরের পর বিশ্বকাপে কেবল একটি ম্যাচে জিতেছে দেশটি। পত্রিকা দুটি বলছে, ‘এখন আর কোনো বিস্ময় বা অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের অনুভূতি নেই। এটা এখন স্বাভাবিক। আরেকটি গ্রীষ্মকালীন বিশ্বকাপে আমরা বাড়িতে কাটাব।’

কী ঘটেছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে?

ফাইনালে মুখোমুখি ইতালি ও ফ্রান্স। ১১০তম মিনিটের খেলা চলছিল, ফরাসি অধিনায়ক জিনেদিন জিদান যখন মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঢুস দেন, তখনও স্কোরবোর্ড ১-১ সমতায়। ওই ঘটনার পরপরই জিদানকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি। পরে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। পেনাল্টি শ্যুটআউটে ফ্রান্সকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে ইতালি চতুর্থবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। অথচ জিদান বিশ্বকাপজুড়ে দুর্দান্ত খেলেছিলেন, হাতে ওঠে ‘গোল্ডেন বল’ও। মাথা গরম না করলে হয়তো ফরাসিরা আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি শোকেসে তুলতে পারত।

৪ অক্টোবর ২০১৩ সালে কাতারের দোহা কর্নিশে স্থাপনের সময় বিদেশি শ্রমিকরা ফরাসি-আলজেরীয় বংশোদ্ভূত শিল্পী আদেল আবদেসেমেদের নির্মিত ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটি পরিষ্কার করছেন। কাতার মিউজিয়ামস অথরিটি এটি ক্রয় করে। “কুপ দ্য তেত” শিরোনামের এই ভাস্কর্যটি ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের সাবেক ফুটবল তারকা জিনেদিন জিদান ইতালির খেলোয়াড় মার্কো মাতেরাজ্জিকে যে হেডবাট করেছিলেন, সেই মুহূর্তটিকে অমর করে রেখেছে।
ছবি: করিম জাফার / আল-ওয়াতান দোহা / এএফপি (গেটি ইমেজেসের মাধ্যমে)

সেই ঘটনায় যা বলেছিলেন জিদান?

সেই ঘটনায় জিদান খ্যাতি ও সমালোচনা দুটোই কুড়িয়েছেন। এমনকি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তিনি নিজে এবং অভিযুক্ত মাতেরাজ্জিও। জিদান জানান,

মাতেরাজ্জি আমার জার্সি ধরে টানায় আমি ওকে বললাম, যদি সত্যিই সে জার্সিটা নিতে চায়, ম্যাচ শেষে আমি দিয়ে দিতে পারি। তখন সে কিছু বাজে কথা বলা শুরু করল। আমিও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখালাম। কেউ যখন আপনার মা-বোনকে নিয়ে অপমানজনক কথা বলবে, আপনি একবার-দু’বার না শোনার ভান করে থাকতে পারেন। কিন্তু তৃতীয়বার কেউ যদি একই কাজ করে, তখন প্রতিক্রিয়া দেখানোটাই স্বাভাবিক।

‘আমি তো আগে একজন মানুষ, তারপর ফুটবলার। এমন কিছু কথা বলা হয়েছিল যা যেকোনো মানুষের পক্ষে হজম করা কঠিন। যা মানুষকে ভীষণ আঘাত করতে পারে। এমন সব কথা যেটা শুনলে মনে হবে, ওর মুখে ঘুষি মেরে দিই। আমার আচরণ মনে হয় সঠিক ছিল না। কিন্তু এমন আচরণের পেছনে তো প্ররোচনাও ছিল। আমি ক্যারিয়ারে যতবার লাল কার্ড দেখেছি, সবই ওই রকম পরিস্থিতিতে, প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে।

জিদান আরও বলেন

আমার মনে হয়, যে মানুষটা এমন আচরণের প্ররোচনা দেয়, সে-ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট, আসল দোষী। রেফারির ভুল সিদ্ধান্তে ভুল মানুষটা শাস্তি পাচ্ছে, এমন তো আর কম হয়নি আমার সঙ্গে। একবার ভাবুন তো, বিশ্বকাপের ফাইনালে, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করার মাত্র ১০ মিনিট আগে আমার ইচ্ছা হয়েছিল বলে আমি ওই রকম আচরণ করব? অবশ্যই না।

মাতেরাজ্জির দোষ স্বীকার!

মাতেরাজ্জি নিজের দোষ স্বীকার করলেও, জিদানের প্রতিক্রিয়া বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে তার কাছে,

ওটা (ঢুস মারা) আমি একদমই কল্পনা করিনি। পুরো ঘটনা হঠাৎ ঘটেছিল যে আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। ভাগ্য ভালো যে, যদি আগে থেকে আঁচ করতে পারলে হয়তো দুজনেই লাল কার্ড খেতাম। বক্সের ভেতর আমাদের একটু ধাক্কাধাক্কি হচ্ছিল। ম্যাচের প্রথমার্ধেই জিদান গোল করে। আমাদের কোচ মার্সেলো লিপ্পি আমাকে বললেন, যেন ওকে (জিদানকে) ভালোভাবে মার্ক করি। তারপর বেশ কয়েকবার ওর সঙ্গে আমার ধাক্কাধাক্কি হয়। প্রথমবার ধাক্কা লাগার পরই আমি দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু জিদান খারাপভাবে সেটার প্রতিক্রিয়া দেখায়।

সেই ম্যাচে ইতালিকে সমতায় ফেরানো এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘তৃতীয়বার ধাক্কাধাক্কির সময় আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। জিদান আমাকে বলল, “তোমার জার্সি দরকার হলে ম্যাচের পরে এসো, দিয়ে দেব।” আমি বললাম, “জার্সির চেয়ে তোমার বোনকেই আমার বেশি পছন্দ।” কথাটা আসলেই নির্বোধের মতো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার মতো ছিল না। রোম, নেপলস, তুরিন, মিলান বা প্যারিসের যেকোনো পাড়ায় এর চেয়ে অনেক বাজে কথা রোজ শুনি।

মাতেরাজ্জি আরও বলেন,

অনেক পত্রিকায় লেখা হয়েছে আমি নাকি ওর মাকে নিয়ে বাজে কথা বলেছিলাম। আমি ওর মাকে নিয়ে কিছুই বলিনি। আমি যখন খুব ছোট, তখনই আমার মা মারা গিয়েছিলেন। আমি কোনো দিন কারও মাকে নিয়ে বাজে কথা বলিনি, বলব না।

Exit mobile version