খেলোয়াড় কিংবা আম্পায়ারদের বর্ণাঢ্য বিদায়ী সংবর্ধনা ক্রিকেট মাঠে নিয়মিত দৃশ্য। কিন্তু গ্যালারিতে বসে বছরের পর বছর দলকে নিঃস্বার্থ সমর্থন দিয়ে যাওয়া কোনো ‘সাধারণ দর্শক’ কি কখনো এভাবে আনুষ্ঠানিক অবসর নেন? সাধারণত এমনটা দেখা যায় না। তবে তিনি তো সাধারণ কেউ নন, বিশ্ব ক্রিকেটের এক চেনা মুখ, আবদুল জলিল, যাঁকে ক্রিকেট দুনিয়া একনামে চেনে ‘চাচা ক্রিকেট’ হিসেবে। দীর্ঘ কয়েক দশকের যাত্রা শেষে এবার গ্যালারিকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন ৭৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেট অনুরাগী।
বিদায়ের শেষ মঞ্চ
আগামী ৪ জুন লাহোরে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচটি হতে যাচ্ছে দেশের মাটিতে চাচা ক্রিকেটের শেষ ম্যাচ। তবে এখানেই তাঁর শেষ নয়; আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফরে তিন টেস্টের সিরিজে গ্যালারিতে শেষবারের মতো পতাকা হাতে দেখা যাবে তাঁকে।
গ্যালারির কোলাহল ছেড়ে এবার তিনি নিজের শহর শিয়ালকোটের উপকণ্ঠে একটি রেস্তোরাঁ ও জাদুঘর খোলার স্বপ্ন বুনছেন। ক্রিকেটীয় স্মৃতির ঝাঁপি নিয়ে ইএসপিএনক্রিকইনফোকে তিনি বলেন:
“এত বছর ধরে ক্রিকেটের যত স্মারক আমি সংগ্রহ করেছি, সব এই জাদুঘরে প্রদর্শন করব। ৫০০টি ম্যাচে গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে পাকিস্তানকে সমর্থন করার একটি লক্ষ্য ছিল আমার, যা আমি ইতিমধ্যে পূরণ করেছি।”
গ্যালারির আইকন হয়ে ওঠার গল্প
১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে ইংল্যান্ডের পাকিস্তান সফরের সময় লাহোরের গ্যালারিতে বসেই জীবনের প্রথম ম্যাচ উপভোগ করেছিলেন আবদুল জলিল। পরবর্তীতে আশি ও নব্বইয়ের দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের ম্যাচগুলোর এক নিয়মিত ও অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন তিনি।
ক্রিকেটকে ভালোবেসে আরব আমিরাতের চাকরিও ছেড়ে দিয়েছিলেন। গাঢ় সবুজ রঙের কুর্তা আর বিশেষ টুপি পরা জলিল রাতারাতি পাকিস্তানের ‘মাসকট’ ও ক্রিকেট-বিশ্বের এক চিরচেনা ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৯৯ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও ওয়াসিম আকরামের দলের হয়ে গলা ফাটাতে হাজির হয়েছিলেন তিনি। কাকতালীয়ভাবে, ঘরের মাঠে তাঁর বর্ণিল এই সফরের সমাপ্তিও ঘটছে সেই লাহোরেই, যেখানে শুরু হয়েছিল তাঁর প্রথম ম্যাচ দেখা।
স্মৃতির মণিকোঠায় জয়-পরাজয়ের খতিয়ান
বিদায়বেলায় পাকিস্তান দলের বর্তমান হতশ্রী পারফরম্যান্স ভাবিয়ে তুলছে এই প্রবীণ সমর্থককে। দলের টানা ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে তিনি ২০২৬ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও মাঠে যাননি। অতীতের সোনালী দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন:
- ১৯৮৬ সালের শারজা জয়: চেতন শর্মার শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই ঐতিহাসিক ছক্কার সময় তিনি মাঠেই উপস্থিত ছিলেন। ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে যাওয়া সেই দৃশ্য আজও তাঁর চোখে ভাসছে।
- ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি: ওভালের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটি তাঁর অন্যতম সেরা স্মৃতি।
তবে কিছু পরাজয় এখনো তাঁকে গভীরভাবে পোড়ায়। এর মধ্যে অন্যতম:
- ২০২৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ: নিউইয়র্কের মাঠে ভারতের বিপক্ষে মাত্র ১২০ রান তাড়া করতে না পারার ক্ষত এখনো দগদগে।
- ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল: মোহালিতে ভারতের ২৬০ রানের জবাবে পাকিস্তান ২৯ রান দূরে থাকতেই থমকে যায়। ৪৯.৫ ওভারে অলআউট হয় ২৩১ রানে। সেই ম্যাচটি স্মরণ করে তিনি বলেন, কত কষ্ট করে শ্রীলঙ্কা, করাচি ও শিয়ালকোট হয়ে সীমান্ত পার করে ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতে, ম্যাচটি জেতা সম্ভব ছিল।
পাকিস্তান ক্রিকেটের ক্রান্তিকাল
‘চাচা ক্রিকেট’ যখন গ্যালারি ছাড়ছেন, তখন পাকিস্তান ক্রিকেট পার করছে তাদের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার সময়। ২০২৩ সালের পর থেকে বিদেশের মাটিতে কোনো টেস্ট জিততে পারেনি তারা। এমনকি ঘরের মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে হারের তিক্ত স্বাদ পেতে হয়েছে তাদের।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সর্বশেষ চক্রের টেবিলের তলানিতে থাকা এবং গত চারটি আইসিসি সাদা বলের টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে উঠতে ব্যর্থ হওয়া দলটিকে নিয়ে চরম হতাশ এই নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক। এশিয়া কাপে ভারতের কাছে টানা হারের পর মাঠের বসে আর দলের পরাজয় দেখতে চাননি বলেই হয়তো এবার গ্যালারির মায়া ত্যাগ করছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের এই পরম বন্ধু।
