তারকা ফুটবলার থেকে যেভাবে স্পিকার মেজর হাফিজ

তারকা ফুটবলার থেকে যেভাবে স্পিকার মেজর হাফিজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ, ছবি : সংগৃহীত

এবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম। এরপর ঠাঁই পান মন্ত্রিসভায়। আজ তিনি আরও মর্যাদার পদে আসীন হয়েছেন। তাকে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করেছেন সংসদ সদস্যরা। সাবেক তারকা ফুটবলার থেকে যেভাবে মেজর হাফিজ স্পিকার হয়েছেন সেই যাত্রাটা অনেক দীর্ঘ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামরিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তার অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল একটি খেলোয়াড়ি জীবন রয়েছে। মূলত ফুটবলার হিসেবে তিনি ষাটের দশকের অন্যতম সেরা তারকা ছিলেন। সাবেক ফুটবলার এবং একজন বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা থেকে মন্ত্রী হয়ে ওঠার যে ধারা তার সূচনা হয়েছে মেজর (অব.) হাফিজের মাধ্যমে।

এক নজরে মেজর (অব.) হাফিজ

১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে খেলেছেন। স্বাধীনতার পর স্ট্রাইকার হিসেবে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ১৯৭৩ সালের ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগে ফায়ার সার্ভিসের বিপক্ষে ৬-০ গোলের ম্যাচে একাই ছয় গোল করে ডাবল হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব গড়েন। স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে যা ছিল প্রথম।

খেলা থেকে অবসরে যাওয়ার পর মেজর হাফিজ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। অ্যাথলেটিকসেও ছিল তার সাফল্য- স্বাধীনতার আগে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।

রাজনীতিতে এসে ১৯৮৬ সালে ভোলা থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে স্বতন্ত্র ও বিএনপির হয়েও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। সবমিলিয়ে ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ। এর আগে তিনবার মন্ত্রিত্ব পাওয়া এই রাজনীতিক নতুন সরকারেও পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে যান।

স্পিকার হিসেবে শপথ নিচ্ছেন মেজর (অব.) হাফিজ, ছবি : সংগৃহীত

তবে এখন তিনি নির্দলীয় একটি মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুসারেই চলবে সংসদ অধিবেশন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে সরকারি ও বিরোধী দলসমূহের আস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠবেন তিনি। আর তাই দীর্ঘ সময় যে দলীয় ব্যানারে এতোদিন সক্রিয় রাজনীতি করেছেন, সেই দল থেকে আজ পদত্যাগ করতে হয়েছে সংবিধান অনুসারে।

বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ার

ফুটবলার হিসেবে তার প্রথম পরিচিতি আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলার সময়। সেখানে আন্তঃবিভাগীয় ফুটবলে তিনি টানা দুটি হ্যাটট্রিক করে নজর কাড়েন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা লিগে ফায়ার সার্ভিস দলের হয়ে খেলা শুরু করেন। ওই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ক্লাব ঢাকা ওয়ান্ডারার্স এবং ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে কৃতিত্বের সাথে খেলেছেন।

মেজর (অব.) হাফিজ অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় ফুটবল দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন (১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে হাতেগোনা যে কজন ফুটবলার পাকিস্তান জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন, তিনি তাদের একজন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ঢাকা মোহামেডান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলেরও অধিনায়ক ছিলেন। তিনি মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাপ এবং ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার আরসিডি টুর্নামেন্টে অংশ নেন।

অ্যাথলেটিক্স ও অন্যান্য সাফল্য

ফুটবল ছাড়াও অ্যাথলেট হিসেবে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত। ১৯৬৪, ১৯৬৫ এবং ১৯৬৬ সালে তিনি টানা তিন মৌসুম পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব ছিলেন। ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে তিনি রেকর্ড টাইমিংয়ে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি খেলাধুলার সংগঠক ও প্রশাসক হিসেবেও সফল ছিলেন মেজর (অব.) হাফিজ। তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) নির্বাচিত সহ-সভাপতি এবং ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য।

ফুটবলে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি ফিফার সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফিফা অর্ডার অব মেরিট’ লাভ করেন। তাকে বিংশ শতাব্দীর সেরা বাংলাদেশি ফুটবলার ঘোষণা করে ফিফা। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বিশেষত্ব হলো, তিনি একই সাথে একজন জাতীয় স্তরের ফুটবলার, অ্যাথলেট, দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এবং সফল রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী ও এখন স্পিকার।

Exit mobile version