২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ: রেকর্ড ভাঙা দূরত্ব আর জলবায়ুর ওপর এক বিশাল আঘাত
অধিকাংশ ফুটবল ভক্তের কাছে নিজের দেশের হয়ে গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপের খেলা দেখাটা জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ কেবল ফুটবলের মহোৎসবই নয়, বরং খেলাধুলার ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ এবং পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর এক ভ্রমণে পরিণত হতে যাচ্ছে।
ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী বিশ্বকাপটি একটি পুরো মহাদেশ জুড়ে (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) অনুষ্ঠিত হবে এবং দলের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮টি। ‘বিবিসি স্পোর্টস’-এর এক বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই বিশাল আয়োজনের কারণে ভক্তদের হাজার হাজার মাইল বিমান ভ্রমণ করতে হবে, যার ফলে প্রতি জন ভক্তের পেছনে টন মেট্রোটন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হবে।
ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের আকাশছোঁয়া ভ্রমণপথ
যদি ইংল্যান্ড দল ফাইনালে পৌঁছায় এবং কোনো সমর্থক লন্ডন থেকে গিয়ে তাদের প্রতিটি ম্যাচ স্টেডিয়ামে বসে দেখতে চান, তবে তাকে প্রায় পৃথিবীর পরিধির দুই-তৃতীয়াংশ দূরত্ব বিমানে পাড়ি দিতে হবে।
- গ্রুপ পর্ব: কেবল গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর জন্যই ইংল্যান্ডের ভক্তদের এক শহর থেকে অন্য শহরে প্রায় ১,৭৬০ মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে।
- চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাইনালে গেলে: লন্ডন থেকে যাতায়াতসহ মোট ভ্রমণের দূরত্ব দাঁড়াবে অন্তত ১৪,৬৯৮ মাইল। এতে প্রতি জন ভক্তের জন্য কার্বন নির্গমনের পরিমাণ হবে প্রায় ৩.৪ টন ($CO_2e$)।
- রানার্স–আপ হয়ে ফাইনালে গেলে: ভ্রমণের দূরত্ব বেড়ে হবে ১৫,৩৮৫ মাইল, যা প্রায় ৩.৫ টন কার্বন নির্গমনের সমান।
সহজ ভাষায় ৩.৪ টন কার্বন নির্গমনের অর্থ কী?
জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা ‘থ্রাস্ট কার্বন’-এর মতে, একজন ইংল্যান্ড ভক্তের তৈরি এই ৩.৪ টন কার্বন নির্গমন ৩৪,০০০ প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরি অথবা যুক্তরাজ্যের একটি সাধারণ বাড়ি টানা ১৯ মাস উত্তপ্ত রাখার সমতুল্য! ‘সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপন্স’ (SGR)-এর ডক্টর স্টুয়ার্ট পার্কিনসন একে “গভীর উদ্বেগজনক” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, এই পরিমাণ কার্বন হাইতির মতো একটি দরিদ্র দেশের একজন মানুষের ২ থেকে ৩ বছরের মোট কার্বন নির্গমনের সমান।
একইভাবে, দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা স্কটল্যান্ডের ভক্তদেরও ফাইনালে যাওয়ার পথে প্রায় ১২,৪২০ থেকে ১৩,৭৭১ মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে, যা প্রায় ২.৮ থেকে ৩.৩ টন কার্বন নির্গমন ঘটাবে।
সবচেয়ে বেশি ও কম ভ্রমণ করতে হবে কাদের?
বিশ্বকাপের ৪৮টি দলের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান ও নকআউট পর্বের ম্যাচের ওপর ভিত্তি করে ভ্রমণের দূরত্ব একেক দলের জন্য একেক রকম হবে।
- সবচেয়ে বেশি সংকটে দক্ষিণ আফ্রিকা: আন্তর্জাতিক ফ্লাইটসহ দক্ষিণ আফ্রিকার ভক্তদের গ্রুপ পর্বের জন্যই পাড়ি দিতে হবে ২১,০৯০ মাইল। আর দল যদি ফাইনালে যায়, তবে এই দূরত্ব দাঁড়াবে ২৬,৮৩৪ মাইলে! এতে প্রতি ভক্তের কার্বন নির্গমন হবে ৫.৯ টন, যা একজন সাধারণ দক্ষিণ আফ্রিকানের পুরো এক বছরের গড় নির্গমনের (৫.৮ টন) চেয়েও বেশি।
- ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে চাপ: ইউরোপের শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে জার্মানির ভক্তদের সবচেয়ে বেশি (১৭,৯৩৫ থেকে ১৯,৭৭০ মাইল) পথ উড়তে হতে পারে।
- সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ফ্রান্স: অপরদিকে ফ্রান্সের গ্রুপ পর্বের ভ্রমণের দূরত্ব মাত্র ৩৭০ মাইল। এমনকি তাদের দুটি ভেন্যুর মধ্যে ট্রেনেই যাতায়াত করা সম্ভব।
“ইতিহাসের সবচেয়ে দূষিত বিশ্বকাপ“
২০২৫ সালে প্রকাশিত এসজিআর-এর একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপের মোট কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা নির্গমনের পরিমাণ ৯০ লাখ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এটি গত চারটি বিশ্বকাপের গড় নির্গমনের প্রায় দ্বিগুণ এবং এর ফলে এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে দূষিত বা পরিবেশের ক্ষতি করা টুর্নামেন্ট। এই বিশাল পরিমাণ কার্বন নির্গমন যুক্তরাজ্যের রাস্তায় এক বছর ধরে ৬০ লাখ গাড়ি চালানোর সমান। এই মোট ফুটপ্রিন্টের প্রায় ৮০-৯০% আসবে কেবল বিমানভ্রমণ থেকে।
ডক্টর পার্কিনসন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“ফিফা একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে টুর্নামেন্টের আকার বড় করে নিজেদের সেই প্রতিশ্রুতিকেই বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। তাদের উচিত ছিল টুর্নামেন্টের পরিধি ছোট করা, বড় করা নয়।”
তবে ফিফা এই পথ থেকে সরছে বলে মনে হয় না। কারণ ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজিত হবে মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেনে, যার উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ হবে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। আর ২০৩৪ বিশ্বকাপ হবে সৌদি আরবে, যেখানে শূন্য থেকে ১১টি নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করতে হবে।
আগের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রম
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে কম দূরত্বের বিশ্বকাপ। সেখানে স্টেডিয়ামগুলো কাছাকাছি হওয়ায় ভক্তরা গণপরিবহন ব্যবহার করে দিনে একাধিক ম্যাচও দেখতে পারতেন। এর আগে ২০১৪ (ব্রাজিল) বা ২০১৮ (রাশিয়া) সালের বিশ্বকাপগুলো বড় দেশে হলেও, সেগুলো ছিল একক দেশে এবং দল ছিল মাত্র ৩২টি। ফলে সামগ্রিক পরিবেশগত ক্ষতি এবারের মতো এত ভয়াবহ ছিল না।
ফিফার বক্তব্য
বিবিসি-কে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে ফিফা স্বীকার করেছে যে, বিমান ভ্রমণ যেকোনো বড় ইভেন্টের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তারা পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে:
নতুন স্টেডিয়াম তৈরি না করে বিদ্যমান স্টেডিয়াম ব্যবহার করা।
আঞ্চলিক গ্রুপ বিভাজন (Regional Model), যাতে ভক্তদের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে কম ছুটতে হয়।
স্টেডিয়ামগুলোতে পানির অপচয় রোধ, গণপরিবহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ব্যবহার বাড়ানো।
উত্তর আমেরিকা জুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা করা।
খেলা দেখার উন্মাদনা আর পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষা-এই দু’য়ের টানাপোড়েনে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন ও বিতর্কিত অধ্যায়ের জন্ম দিতে যাচ্ছে।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩
















