টেস্ট ক্রিকেটের পিচ্ছিল আঙিনায় এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অভিজ্ঞতা আর ঐতিহ্যে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে হোচট খেতে খেতেই জিতেছে টাইগাররা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের টেস্ট জয়ের সংখ্যা মোটে ১৯ টি। তবে এই ১৯ জয়ে পাঁচটি স্মরণীয় টেস্টও আছে। যেই ম্যাচগুলো বাংলাদেশকে বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয় লাভ করতে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে, মনোবল বাড়িয়েছে।
এই তালিকার শুরুতেই থাকবে বাংলাদেশের প্রথম জয়টা। প্রথম জয়ের গল্প কি ভোলা যায়? যায় না। প্রথম প্রেমের গল্প কি আপনি ভূলতে পেরেছেন?
২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশ। এরপর টেস্ট ক্রিকেটের শূন্য সাদা ক্যানভাসকে রঙিন আলোয় আলোকিত করে পাঁচ বছর দুই মাস, ৩১ পরাজয় আর অসংখ্য বিনিদ্র রাতের পর সেই আরাধ্য জয়। ১০ই জানুয়ারী, ২০০৫। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক দিন। এই দিনেই টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
মর্যাদা রক্ষার ম্যাচে জয়ের নেশায় মত্ত হয়ে টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ সেদিন রানের পাহাড় গড়ে, যেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে গিয়ে পা ফসকেছে জিম্বাবুয়ের। প্রথম ইনিংসে বাশারের ৯৪ আর দ্বিতীয়টায় ৫৫। ম্যাচের চতুর্থ দিন পর্যন্ত সেই চিত্রগল্পের নায়ক বাংলাদেশী অধিনায়ক। তবে ম্যাচের পঞ্চম দিনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মঞ্চটা একার করে নেন এনামুল হক জুনিয়র। প্রথম ইনিংসে উইকেটশূন্য এই স্পিনার দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়ে নেন ছয় ছয়টি উইকেট। ২২৬ রানের সেই জয়ে তাঁর হাতেই ওঠে ম্যাচসেরার পুরস্কার।
এরপর আসবে সেই ২০১৬ সালের টেস্ট জয়ের মূহুর্তটা। প্রতিপক্ষটা যেখানে ইংল্যান্ডের মতো দল। মিরপুরের মাঠে তামিমের সেঞ্চুরি। সাথে সাকিব, তামিম, ইমরুল কায়েস ও মুমিনুলদের অসাধারণ ব্যাটিং। আর বল হাতে মিরাজের দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২ উইকেট তোলার কীর্তি। অ্যালিস্টার কুকের নেতৃত্বে থাকা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়ের কীর্তিটা গড়ে ফেলে বাংলাদেশ। ইংলিশদের বিপক্ষে ১০৮ রান জয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিজের করে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
সেই আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করেই এর পরের বছর, ২০১৭ সালে আসে দুইটি অসাধারণ জয়। বাংলাদেশের শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কার মাটিতে লঙ্কান দূর্গ ভেঙে দেয় মুশফিকুর রহিমের বাংলাদেশ। মাইলফলক ছোঁয়ার সেই ম্যাচটিতে চার উইকেটের জয় পেয়েছিলো বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৪৯ আর দ্বিতীয়টায় ৮২ রান করে সেবার ম্যাচসেরা হন দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল খান। তাঁকে সঙ্গ দিয়ে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন তারকা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বল হাতে দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছিলেন ছয়টি উইকেট। মার্চে সেই ম্যাচ জয়ের চার মাস পর বাংলাদেশ রচনা করে ফেলে আরো একটি ইতিহাস। এবার প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার মতো টেস্ট খেলুড়ে দেশ। মিরপুরের মাটিতে সাকিবের দুই ইনিংসে দশ উইকেট শিকারে ডেভিড ওয়ার্নারের সেঞ্চুরিকে ম্লান করে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস রচনা টিম টাইগার্সদের।
এরপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। বাংলাদেশ যে টেস্ট ম্যাচ জিততে পারে সেই আত্মবিশ্বাসে রীতিমতন ভাটা পড়ে যায়। ২০১৯-এ তো বাংলাদেশকে ঘরের মাটিতেই টেস্টে হারিয়ে দেয় আফগানিস্তানের মতো নবীন দল। একের পর এক ধাক্কা খাওয়া দলটা মহামারীর পরেই দেখায় চমক।
সুস্থ্য বিশ্বে বাংলাদেশের এক অসাধারণ জয় ২০২২-এর প্রথম ম্যাচেই। নিউজিল্যান্ডকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে দেয় টিম টাইগার্স। মাউন্ট মঙ্গানুইতে বাঘের গর্জনে কেঁপে উঠে কিউই পাখিরা। ক্রিকেট ইতিহাসে কন্ডিশন আর প্রতিপক্ষ বিবেচনায় সেটিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা জয়। টস জিতে ফিল্ডিং নিয়ে প্রথম ইনিংসে লিড নেয়া। দেশের বাইরে এমন ঘটনা সেবারই প্রথম ঘটায় টাইগাররা। সেই ম্যাচের শেষ দিনে এবাদত-তাসকিনের দারুণ বোলিংয়ে মাত্র ২২ রান তুলতেই শেষ ৫ উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। ইনিংসে ৬ উইকেট শিকার করেন এবাদত। বাংলাদেশ কঠিন কন্ডিশনে ৪০ রানের লক্ষ্যে পৌছায় আট উইকেট হাতে রেখেই।
সেই জয়ের পর এবার আরো একটা ইতিহাস রচনা সেই কিউইদের বিপক্ষেই। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অধরা টেস্ট জয়টা এখন আর অধরা রইলো না। বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছে, তাও আবার দেড়শো রানে। যা কিনা আফগানিস্তান আর জিম্বাবুয়েকে বাদ দিলে রানের মার্জিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। এই ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। তাইজুলের ম্যাচ উইনিং বোলিং ফিগার, মাহমুদুল হাসান জয়ের ৮৬ রানের অনবদ্য শুরু, আর অধিনায়ক হিসেবে অভিষিক্ত শান্তর; শান্তির সেঞ্চুরি। পুরো টেস্টে বাংলাদেশ দলকে দেখে বেশ আত্মবিশ্বাসীই মনে হয়েছে। প্রতিপক্ষ বিবেচনায় এর আগে এতো বড় জয় পায়নি বাংলাদেশ।
এবার মিরপুরে কিউইদের বিপক্ষে সিরিজ জিতে ইতিহাসের পাতায় শান্তবাহিনী নতুন গল্প লিখতে পারে কিনা সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩















