একটি তারিখ কখনো কখনো ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। হয়ে ওঠে স্মৃতি, আবেগের ঠিকানা, কখনো বা পুরোনো ক্ষতের ওপর হাত রেখে দেওয়া এক প্রতীকী স্পর্শ। আর্জেন্টিনার জন্য ১৫ জুলাই এখন তেমনই একটি দিন। বিশ্বকাপ জয়ের দিন নয়, শিরোপা হাতে তুলে নেওয়ার দিনও নয়-তারপরও এই তারিখটিই এবার পেল বিশেষ মর্যাদা। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) ১৫ জুলাইকে ঘোষণা করেছে জাতীয় ফুটবল দল দিবস হিসেবে।
সিদ্ধান্তটি প্রথম শুনলে বিস্ময় জাগতেই পারে। তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২-তিনটি বিশ্বজয়েরই রয়েছে নিজস্ব মহিমা, নিজস্ব ইতিহাস। অথচ সেই তিনটি দিনের কোনোটিই জাতীয় ফুটবল দল দিবস হিসেবে বেছে নেয়নি এএফএ। কেন?
উত্তরটি খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ইংল্যান্ডের দিকে। ফিরে যেতে হয় ফুটবল, যুদ্ধ, রাজনীতি আর জাতীয়তাবোধের এক জটিল ইতিহাসের দিকে। ১৫ জুলাইয়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবল স্মৃতির গভীর যোগ তৈরি হয়েছে ইংল্যান্ডকে ঘিরেই। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুর্দান্ত জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। শুরুতে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল লিওনেল মেসির দল। সেই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় ছিল না; আর্জেন্টাইন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে আরেকটি প্রতীকী বিজয়।

তাই বিশ্বজয়ের তিনটি দিনকে পাশে রেখে ১৫ জুলাইকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আবেগের পাশাপাশি বার্তাও স্পষ্ট। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাওয়া সেই জয়কে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ করিয়ে দিতে চায় আর্জেন্টিনা। তবে গল্পটা শুধু ফুটবলের নয়। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের বিরোধ এই আবেগকে আরও তীব্র করেছে। ফুটবলের মাঠে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা সেই রাজনৈতিক ইতিহাসও মাঠে টেনে এনেছিলেন। ম্যাচ শেষে একটি ব্যানার প্রদর্শন করা হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল-‘ফকল্যান্ড আমাদেরই।’
ফকল্যান্ড নিয়ে ১৯৮২ সালের যুদ্ধ দুই দেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে গেছে। সেই ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। ফুটবল তাই দুই দেশের দ্বৈরথে বহু সময় শুধু ৯০ মিনিটের খেলা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে জাতীয় আবেগেরও বাহক। আর এই দ্বন্দ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ফুটবলীয় অধ্যায়গুলোর একটি লেখা হয়েছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে।
মেক্সিকোর মাটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচেই দিয়াগো ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল করেছিলেন। প্রথমটি ‘হ্যান্ড অব গড’- হাত দিয়ে করা গোল, যা নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। আর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই একক নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডের একের পর এক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করা সেই গোল, যেটি পরবর্তীতে পরিচিতি পায় ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে।
ম্যারাডোনার সেই দুই গোল যেন দুই বিপরীত গল্পের এক ফ্রেম। একদিকে বিতর্ক, অন্যদিকে শিল্প। কিন্তু ফলাফল ছিল একই-আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২-১ গোলে। পরে সেই বিশ্বকাপও জিতেছিল তারা। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয় আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে আলাদা একটি অধ্যায় হয়ে আছে।


