ক্ষমা প্রার্থনা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকিতে উয়েফা

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব ও মুনাফার অংশীদারত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ভুল স্বীকার করেছে ফিফা। কিন্তু তাতেও কাটছে না সংকট। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ক্ষমা চাওয়ার পরও তাঁর নেতৃত্বে আস্থা ফিরিয়ে নেয়নি ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। বরং বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকি বহাল রেখেছে তারা।

মরক্কোর রাবাতে বুধবার ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর সংস্থাটি স্বীকার করে, বিশ্বকাপের মুনাফা একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে ‘ভুল’ হয়েছিল। একই সঙ্গে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্ব ইনফান্তিনোর সভাপতিত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। ফিফা আশা প্রকাশ করে, এই বৈঠক ও ভুল স্বীকারের মাধ্যমে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর সংগঠনটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। কিন্তু ফিফার সেই অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করেছে উয়েফা।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে উয়েফা জানায়, ফিফার প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত। সংস্থাটির দাবি, বয়কট প্রত্যাহারের জন্য দুটি শর্ত ছিল-প্রথমত, ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব বা মালিকানা বিক্রির প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে; দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে ফুটবলের কাঠামোকে এভাবে পরিবর্তন করার কোনো উদ্যোগ আর নেওয়া হবে না-এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে।

উয়েফার ভাষ্য, দুটি শর্তের কোনোটিই যথাযথভাবে পূরণ হয়নি। এর সঙ্গে আরও বড় একটি রাজনৈতিক ও নেতৃত্বসংক্রান্ত সংকটের কথাও সামনে এনেছে ইউরোপীয় সংস্থাটি। উয়েফা বলেছে, তারা ইতিমধ্যে ইনফান্তিনোর সভাপতিত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল এবং সেই অবস্থান এখনো বহাল রয়েছে।

ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থনের ঘোষণাকেও গুরুত্ব দিতে নারাজ উয়েফা। তাদের বক্তব্য, ফিফা সভাপতির অধীনে কর্মরত কর্মকর্তারা তাঁর প্রতি সমর্থন জানানোয় পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই মন্তব্যে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।

একদিকে সমর্থন, অন্যদিকে অনাস্থা

ফিফার বৈঠকের পর ইনফান্তিনোকে ঘিরে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ছবি তুলে ধরলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর সমর্থন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ব ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রো ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার গভীর অপব্যবহারের’ অভিযোগ তুলেছে। একই সময়ে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও তাঁর পুনর্নির্বাচনে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও চলমান সংকটকে ফুটবল প্রশাসনে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ফলে একদিকে ফিফার অভ্যন্তরে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থনের ঘোষণা, অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসন, খেলোয়াড়দের সংগঠন ও ইংল্যান্ডের ফুটবল কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা-সব মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্ব এখন বড় পরীক্ষার মুখে।

আফ্রিকার সমর্থন ইনফান্তিনোর পাশে

ইউরোপে যখন ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অনাস্থা বাড়ছে, তখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে আফ্রিকা মহাদেশ।বৃহস্পতিবার আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) জানায়, তাদের নির্বাহী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ফিফা সভাপতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। আফ্রিকান ফুটবলের উন্নয়নে ইনফান্তিনোর ভূমিকার জন্য তাঁকে ধন্যবাদও জানিয়েছে সংস্থাটি।

ফিফা ও উয়েফা লোগো

সিএএফ সভাপতি প্যাট্রিস মোটসেপে বলেন, ফিফার বুধবারের বিবৃতিকে সংস্থাটি সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন করেছে।

অর্থাৎ ইনফান্তিনোকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অবস্থান এখন স্পষ্টতই দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে-একদিকে উয়েফা-র নেতৃত্বে ইউরোপের অনাস্থা, অন্যদিকে সিএএফ-এর প্রকাশ্য সমর্থন।

উত্তর আমেরিকা ও এশিয়াও ছিল বিরোধিতায়

বিশ্বকাপের মুনাফা বিক্রির ফিফার বিতর্কিত পরিকল্পনা শুরু থেকেই সর্বসম্মত সমর্থন পায়নি। উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)ও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছিল।

পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফিফা পরিকল্পনাটি বাতিল করে দেয়। ফিফার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যেও এই উদ্যোগ নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়। আর্সেন ওয়েঙ্গারসহ সংস্থাটির কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও পরিকল্পনা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন।

ফিফার মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রমও বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানানো শীর্ষ নেতৃত্বের দলে ছিলেন।

এখন প্রশ্ন, পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

বিশ্বকাপ বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা বাতিল হলেও এর রাজনৈতিক অভিঘাত এখনো শেষ হয়নি। উয়েফা-র সদস্য দেশগুলো যদি সত্যিই ফিফার প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করে, তাহলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা বিশ্বকাপও বড় সংকটে পড়তে পারে।

কারণ ইউরোপের দেশগুলো শুধু ফিফার প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান অংশগ্রহণকারীই নয়, বিশ্ব ফুটবলের আর্থিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোরও বড় অংশীদার।

ইনফান্তিনো তাই আপাতত দুটি বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সিএএফ-এর সমর্থন, অন্যদিকে উয়েফা-র প্রকাশ্য অনাস্থা, ইংল্যান্ডের সমর্থন প্রত্যাহার এবং ফিফপ্রো-র কঠোর সমালোচনা।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles