মেসির বিদায়ে এনজোর আবেগঘন চিঠি

লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায় শেষ হওয়ার ঘোষণায় আবেগ সামলাতে পারেননি এনজো ফার্নান্দেজ। মেসিকে নিজের আদর্শ মানা ২৫ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন হৃদয়ছোঁয়া এক চিঠি। সেখানে উঠে এসেছে ছোটবেলার স্বপ্ন, মেসির সঙ্গে একই মাঠে খেলার আকাঙ্ক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প।

প্রায় এক দশক আগে অভিমান করে মেসি যখন জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন এনজো। সেসময় তিনি ছিলেন কেবলই এক কিশোর। মেসির বয়স আর নিজের বয়সের হিসাব কষতেন এনজো-আদৌ কি কখনো আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর সঙ্গে খেলার সুযোগ হবে?

মেসি শেষ পর্যন্ত ফিরেছিলেন। আর এনজোর ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল কল্পনার চেয়েও সুন্দরভাবে। শুধু একসঙ্গে মাঠে নামাই নয়, একই ড্রেসিংরুম ভাগ করেছেন, কঠিন সময় পার করেছেন, আনন্দ উদযাপন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে বিশ্বকাপও জিতেছেন।

মেসিকে উদ্দেশ্য করে এনজো লিখেছেন, ‘লিও, তুমি যখন সেই সময় জাতীয় দল ছাড়ার কথা বলেছিলে, আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি তখন স্রেফ একটা বাচ্চা ছিলাম। তোমার বয়স আর আমার বয়সের হিসাব করতাম, ভাবতাম কোনো দিন তোমার সঙ্গে খেলতে পারব কি না।’

নিজের সেই শিশুসুলভ হিসাব-নিকাশের কথাও জানিয়েছেন এনজো। লিখেছেন, ‘এটা শুনতে হয়তো বোকা বোকা লাগে, কিন্তু আমি সত্যিই হিসাব করতাম। ভাবতাম, তোমার হাতে আর কত বছর আছে, আমার প্রথম বিভাগে পৌঁছাতে কত বছর লাগবে। আর স্বপ্ন দেখতাম, অন্তত একবার হলেও আর্জেন্টিনার হয়ে আমরা একসঙ্গে খেলব। ভাগ্য ভালো, তুমি ফিরে এসেছিলে।’

এরপর সেই স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবে রূপ নিয়েছিল, সেটিও লিখেছেন এনজো। মেসির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতীয় দলের ক্যাম্প, ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে কঠিন সময় ও আনন্দের মুহূর্ত-সবকিছুতেই তাঁরা ছিলেন একসঙ্গে।

এনজোর ভাষায়, ‘জীবন সেই ছোট্ট ছেলেটা যা কল্পনা করতে পেরেছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দরভাবে সবকিছু সাজিয়ে দিয়েছিল। আমি শুধু তোমার সঙ্গে খেলতেই পারিনি; আমরা একসঙ্গে জাতীয় দলের ক্যাম্প করেছি, ড্রেসিংরুম ভাগ করেছি, কথা বলেছি, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছি, কঠিন সময় পার করেছি, অসাধারণ মুহূর্ত উপভোগ করেছি এবং শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’

তবে এনজোর কাছে মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার হিসেবে নয়। জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর মেসি যেভাবে তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন, সেটিই বেশি মনে থাকবে তাঁর।

এনজো লিখেছেন, ‘সবচেয়ে বেশি আমি কৃতজ্ঞ থাকব, যেদিন থেকে আমি দলে এসেছি, সেদিন থেকেই তুমি যেভাবে আমার সঙ্গে আচরণ করেছ তার জন্য। আমি এখানে এসেছিলাম আমার আদর্শের সঙ্গে মাঠ ভাগ করে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু বদলে এমন একজন মানুষকে পেয়েছি, যিনি প্রথম মুহূর্ত থেকেই আমাকে দলের একজন মনে করিয়েছেন।’

মেসির ছোট ছোট আচরণও ভুলবেন না এনজো। তিনি লিখেছেন, ‘তোমার কাছ থেকে সবসময় একটি ভালো কথা, একটি পরামর্শ, একটি আলিঙ্গন কিংবা প্রয়োজনের সময় আমাকে স্বস্তি দেওয়ার মতো কোনো না কোনো কিছু পেয়েছি। আমি কখনোই সেটা ভুলব না।’

মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার পরবর্তী জাতীয় দলের ক্যাম্পের কথাও ভাবতে কষ্ট হচ্ছে এনজোর। তাঁর ভাষায়, ‘আজ আমার পক্ষে কল্পনা করা কঠিন যে, পরের জাতীয় দলের ক্যাম্প তোমাকে ছাড়া হবে। মাঠে গিয়ে সামনে তোমাকে না দেখা, ১০ নম্বর জার্সি পরে দাঁড়িয়ে না থাকা, এটা ভাবাই কঠিন। এত বছর ধরে তোমাকে সেখানে দেখে এসেছি যে, অন্যভাবে ভাবাটাই অসম্ভব মনে হচ্ছে।’

চিঠির শেষদিকে আবার ফিরে গেছেন ছোটবেলার সেই এনজোর কাছে। মেসির সঙ্গে খেলার স্বপ্ন পূরণ হওয়াকে জীবনের বড় সৌভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘কত ভাগ্যবান ছিলাম আমি, লিও। সেই ছোট্ট ছেলেটা কত ভাগ্যবান ছিল, যে তখন হিসাব কষত, সে আদৌ সময়মতো পৌঁছাতে পারবে কি না, সেটাই না জেনে। তুমি যেভাবে আমার সঙ্গে আচরণ করেছ, তার জন্য ধন্যবাদ। তুমি আমাকে যা শিখিয়েছ, তার জন্য ধন্যবাদ। আর তোমার গল্পের একটি অংশ আমাকে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্যও ধন্যবাদ।’

সবশেষে প্রিয় অধিনায়কের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে এনজো লিখেছেন, ‘আমরা তোমাকে অনেক মিস করব, ক্যাপ্টেন।’

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles