রোসারিও থেকে বিশ্বজয় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির মহাকাব্য!

২৪ জুন! ১৯৮৭ সাল! শীতের রাত! স্থানীয় সময় রাত ৮.৩০ মিনিট! আর্জেন্টিনার ছোট্ট শহর ‘রোসারিওর রাতের আঁধারে বাবা হোর্হে মেসির ঘর আলোকিত করে ধরাতে আসলেন মা সেলিয়া মারিয়ার কোল জুড়ে এক ফুটফুটে শিশু! কিন্তু সেই শিশুটি কোন সাধারন শিশু নয়! শিশুটি ছিল রোজারিওর গর্বের ধন আকাশের চাঁদ। শুরু হল রোজারিওর নতুন গল্প লেখার উপলক্ষ, পৃথিবী পেল ফুটবল দিগন্তের রক্তিম সূর্য নাম তার লিওনেল আন্দ্রেস মেসি! আন্দ্রেস মেসি! মেসি!

কাতার বিশ্বকাপ জয় করে মেসিরা

রোজারিও থেকে যে গল্পের শুরু সেই গল্প আজ বদলে দিয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চার লিওনেল মেসির পায়ে ছিল জাদু, চোখে ছিল স্বপ্ন- কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে ছিল অসংখ্য বাধা। বার্সেলোনার কিশোর প্রতিভা থেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে মেসি ক্লাব ফুটবলের প্রায় সব শিরোপাই জিতেছেন। কিন্তু একটা অপূর্ণতা তাকে তাড়া করে ফিরেছে বছরের পর বছর আর তা হল আর্জেন্টিনার জার্সিতে একের পর এক ব্যর্থতা, কান্না, হতাশা আবার কখনো অবসর, ক-খ-নো সমালোচনার ঝড়! কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষারও অবসান হয়েছে রাজকীয়ভাবে।

অপেক্ষার ফল নাকি মধুর হয়! তাই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গা অপেক্ষার ফল মেসি পেলেন কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, আর সবচেয়ে বড় আজীবনের লালিত স্বপ্ন- বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে। কাতারের আকাশে যখন মেসি তুলে ধরলেন বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি, তখন মেসির শুধু একটি শিরোপা পাওয়ার আশাই পূর্ণ হয়নি- সেদিন পূর্ণতা পেয়েছিল এক ফুটবল কিংবদন্তির গল্প।

৮টি ব্যালন ডি’অর পুরস্কার, অসংখ্য রেকর্ড, অগণিত গোল আর ট্রফির পাহাড় পেরিয়ে আজ তিনি শুধু একজন ফুটবলারই নন-তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক ফুটবল-যুগের নাম।

ফুটবল ক্যারিয়ারের সেরা মুহুর্ত

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নিওলেন মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচের অর্জনটা কোন সাধারন অর্জন নয় এই অর্জন অসামান্য। কিছু দ্বিমত থাকলেও মেসিই হলেন সর্বকালের সেরা ফুটবলার! কেন মেসি সেরা তা তার অর্জনের দিকে তাকালে তার নিন্দুকেরাও হয়তো বাধ্য হবেন বলতে যে, মেসি হলেন এই গ্রহের সেরা ফুটবলারদের অন্যতম একজন।

২টি বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার-গোল্ডেন বল জেতা একমাত্র ফুটবলার হলেন মেসি তা কি তার সেরা হওয়া প্রমান করেনা? আবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৬ বার ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জেতাটা কি শুধুই সাধারন ঘঠনা? সবচেয়ে বেশী ৬ বার বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার কয়জন রয়েছেন এই ধরাতে? আবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ৩৪টি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি ২৩ জয়ের রেকর্ড কার দখলে? ৩টি বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম একাদশে থাকা আর সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা ফুটবলারটির নাম কি লিওনেল মেসি নয়?

বিশ্বকাপ ও মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৫টি গোল দাতা যেমন মেসি তেমনি আবার বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১টি গোলদাতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২৫টি গোল এবং ২০৭টি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ খেলা ফুটবলারের নামটাও হল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে শুরু করা মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হবে যে ১৯ জুলাই ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চে তা হয়তো মেসি নিজেও ভাবতে পারেননি। কিন্তু যার শুরু আছে, তার শেষ ও তো আছে! এটাই তো এই ধরনীর নিয়ম। আর নিয়মের বেড়াজাল মেনেই তো তিনি সকল অর্জনে আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই এই বিদায় তাঁর পাঁড় ভক্তদের মেনে নেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু যারা বিদায় বেলায় বা ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে ভাল কিছু রেখে যান তারা তো হয়ে যান ইতিহাসের অংশ।  

বিশ্ব জয়ের পর একান্ত সেরা মুহুর্ত

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোলের যে কীর্তি, ১১টি হ্যাট্রিক আর সতীর্থদের দিয়ে ৬৮ গোলের যে মহোৎসব করিয়েছেন তা কি ইতিহাসের অংশ নয়!

জাতীয় দলের হয়ে মেসির জেতা ৪টি ট্রফির মধ্যে ২০২২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিঃসন্দেহে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। আবার নিজ মহাদেশে যখন কোপা আমেরিকার ট্রফিটাতে হাত ছোঁয়াতেই পারছিলেন না তখন ২০২১ সালের কোপার ট্রফি জয়ের কথা কি তিনি ভুলতে পারবেন? ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে ফুটবল যেন তাকে দু-হাত ভরে দিয়েছে। ২১ সালের পর ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ও একই সাথে প্রথমবার জিতেছেন ফিনালিসিমা ট্রফি, এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! বিশ্বকাপ জয়ের পরের বছর ও মেসিকে হতাশ করেনি, জীবনের ২য় অধরা ট্রফিটা নিজের করে নিলেন ২য় বার কোপা আমেরিকা জয় করে।

ম্যারাডোনা, ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা আর ওর্তেগার দেশের আকাশী নীল-সাদা জার্সিতে ফুটবল জাদুকর মেসি ১৭,১২০ মিনিট সবুজ ঘাসের গালিচায় তার ফুটবল পেখম মেলে আলবিসেলেস্তাদের যে ৩৬ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে ফুটবলের ইতিহাস তৈরী করেছেন তার ঋণ কি কখনো শোধ হয়? আর শোধ হয়না বলেই তো তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবল আকাশে হয়ে থাকবেন জনম জনমের ফুটবলের সুখ পাখি।

মেসি তার ক্যারিয়ারে প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও চিলির বিপক্ষে সবচাইতে বেশী ১৪ টি করে ম্যাচ খেলেছেন আবার সবচাইতে বেশী ১১টি গোল করেছেন বলিভিয়ার বিপক্ষে। তাইতো তার সময়ে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বি ‘রোনালদোকে’ পেছনে ফেলে ‘পেলে’ আর ‘ম্যারাডোনাদের’ কাতারে উঠে বিশ্ব ফুটবল বোদ্ধাদের কাছে হয়েছেন সেরাদের একজন।

ইয়েস বিশ্বকাপ …

ক্লাব ফুটবলেও মেসির অর্জন ইর্ষনী! তবে মেসির ক্লাব ফুটবলের অধিংকাশ সময় জড়িয়ে আছে তার শৈশবের ক্লাব বার্সেলোনায়, যেখানে তিনি স্বপ্নের পথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে গেছেন তার স্বপ্নের সিঁড়ি দিয়ে, যে ক্লাবের প্রতিটি ঘাস, ইট-পাথর আর ভবন কথা বলতো তার সাথে, তাঁকে চিনতো, তাঁকে জানতো এবং তাঁকে বুঝতে পারতো। বলা যায় মেসি ছিলেন বার্সেলোনার ঘরের ছেলে। তাইতো ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে যারা সবচেয়ে বেশী অর্জনে নিজেকে এবং ক্লাবকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে লিওনেল মেসি যে সবার শীর্ষে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

ক্লাব ফুটবলে মেসি স্পেনের বার্সেলোনার হয়ে ৩৫টি, পিএসজির হয়ে ৩টি এবং বর্তমান ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে ৪টি শিরোপার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে ৪টি, অ-২০ জাতীয় দলের হয়ে ১টি বিশ্বকাপ এবং অ-২৩ দলের হয়ে একবার অলিম্পিক শিরোপা জয় সহ মোট ৪৮টি শিরোপা জেতা বিশ্বের একমাত্র ফুটবলারের নাম হল লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।  

লিওনের মেসি; রেকর্ডের পাতায় তার নাম, ট্রফির মঞ্চে তার ছাপ, আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তার জায়গা। শৈশবের ছোট্ট রোসারিও থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা তাকে নিয়ে গেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে। ভেঙেছেন অসংখ্য রেকর্ড, জিতেছেন প্রায় সবকিছু, পেয়েছেন ব্যক্তিগত স্বীকৃতির সর্বোচ্চ সম্মান।

বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে পাওয়ার পর প্রথম মুহুর্ত

কিন্তু মেসির গল্প যে শুধু গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের গল্প তা নয়। মেসির গল্প হল হাল না ছাড়ার গল্প। ব্যর্থতার পর ফিরে দাঁড়ানোর গল্প। আর অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প!

যে বিশ্বকাপ একসময় ছিল অধরা, সেই বিশ্বকাপ একদিন উঠেছিল তার হাতে। আর্জেন্টিনার আকাশে উড়েছিল নীল-সাদা পতাকা, আর পূর্ণতা পেয়েছিল এক কিংবদন্তির গল্প।

হয়তো একদিন তার রেকর্ডগুলো ভেঙে যাবে। হয়তো নতুন কোনো তারকা ফুটবল বিশ্বকে মাতাবেন। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসির অধ্যায়টি মুছে ফেলা যাবে না কখনোই। কারণ কিছু খেলোয়াড় ফুটবল খেলেন… আর কিছু খেলোয়াড় ফুটবলের ইতিহাস হয়ে যান।

লিওনেল মেসি-শুধু একজন ফুটবলারই নন, তিনি একটি যুগের নাম। মেসি শুধু ফুটবলের ইতিহাসই লেখেননি-মেসিই হয়ে উঠেছেন ফুটবল ইতিহাসের অপর নাম! লিওনেল আন্দ্রেস মেসি!

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles