ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল ম্যাচ মানেই যেন আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ আর ইংল্যান্ডের ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের প্রতিশোধের ম্যাচ। দু-দেশের ফুটবল লড়াই মানেই ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা থেকে ৩০০ মাইল দুরের দ্বীপ ফকল্যান্ড যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রতিশোধ আর ইংল্যান্ড দলের জন্য ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে গোল করে ইংল্যান্ডকে হারানো প্রতিশোধের ম্যাচ, তাই ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ফুটবল থেকে দু-দেশের মধ্যে শুরু হয় “ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে বিশ্বকাপের ফুটবল যুদ্ধ”!

বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে ১৬ জুলাই রাত ১টায় আটলান্টায় মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও দীর্ঘদিনের শিরোপা প্রত্যাশী ইংল্যান্ড। ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৮৬ ও ১৯৯৮ এবং ২০০২-এর স্মৃতি পেরিয়ে এবারই উভয় দল সবচেয়ে বড় লড়াইয়ে নামছে ফাইনালের টিকিটের জন্য। আগের ৫ দেখায় ইংল্যান্ড ৩ বার এবং আর্জেন্টিনা ২ বার জয় পেয়েছে। তবে মাঠের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা যেমন মাঠে খেলবে টিম হিসেবে মেসির জন্য তেমনী ব্রিটিশরা পুরনো ইতিহাস নতুন করে লিখতে চায় আধুনিক ফুটবলের বাহক হতে, এক দিকে ম্যারাডোনার উত্তসুরি লিওনেল মেসি অন্যদিকে শিল্টনের উত্তরসুরি হয়ে আলো ছড়াতে চান হ্যারি কেইন।
খেলা ধুলায় ইতিহাস ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে আপনি সান্তনা পাবেন কিন্তু বর্তমান দিয়েই আপনাকে মাঠে টিকে থাকতে হবে। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দুই দল যোগ্য দল হিসেই সেমিতে উঠেছে দু-দলের পারফরম্যান্সের পার্থক্য খুব বেশী নয়। বড় ম্যাচে সুযোগের স্বদব্যবহার ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়, তাই স্নায়ুর চাপ এবং ট্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো খুব ইফেক্টিভ হবে এই ম্যাচে। চলুন দেখা যায় কোন দল কোন বিভাগে এগিয়ে রয়েছে খেলোয়াড়দের পারফর্ম্যান্স দিয়ে।

আক্রমন ভাগঃ
মেসি আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজে গড়া আক্রমন ভাগকে ৫ এ ৫ দেয়া যায় কারণ মেসি ৮ গোল করে শির্ষ গোলদার একজন, তাছাড়া আলভারেজের গতি ইংল্যান্ডের রাইট মিড ফিল্ডে অ্যান্ডারসন এবং রাইট ব্যাক কোন্সার বড় পরীক্ষা নিবে আবার লাউতারো মাটিনেজের পেনাল্টি এরিয়ার মধ্যে ফিনিশিং আর রাইট উইং এ মেসির যাদুকরী ফুটবল সামলাতে ইংল্যান্ডের লেফট মিড ফিল্ডার রাইস ও লেফট ব্যাক রাইলিকে হেমসিম খেতে হবে যেখানে এগেয়ে থাকবে আর সেখানেই আর্জেন্টিনার গোল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী বলে মনে হচ্ছে। আবার ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনকে সামলানোতে ব্যস্ত থাকতে হবে আর্জেন্টিনার লেফট সেন্টার ব্যাক লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও রাইট সেন্টার ব্যাক রোমেরোকে আবার রাই উইং দিয়ে ইংল্যান্ডের মাদুয়েকে যখন আক্রমনে যাবেন তখন অ্যালিস্টার এবং ট্যাগলিয়াফিকোর বাধার সামনে পড়বে আর বাম দিক দিয়ে গর্ডন দি পল এবং মলিনাকে বিট করে গোল করতে হবে গর্ডনকে তাই উভয় দলের আক্রমন ভাগ সমানে সমান।
মধ্য মাঠঃ
মধ্য মাঠেও উভয় দল থাকবে সমানে সমান ইংল্যান্ডের মধ্য মাঠে যেমন রাইস, অ্যান্ডারসন ও বেলিংহামের মত ইনফর্ম অ্যাটাকিং মিড ফিল্ডার রয়েছে যারা গোল স্কোরিং এ অনেকটাই এগিয়ে তেমনী আবার আর্জেন্টিনার রয়েছে ম্যাক অলিস্টার, এনজো ফের্নান্দেজ এবং দি পল ও লিয়েন্দ্র প্যারেডেসের মত মিড ফিল্ডার যারা ইংল্যন্ডের মিড ফিল্ডারদের চেয়ে প্লেয়ার রেটিং-এ একটু এগিয়ে তবে গোল স্কোরিং পাওয়ারে আবার একটু পিছিয়ে। মধ্য মাঠেও উভয় দলকে সমান এ রাখতে হবে।
রক্ষণভাগঃ
ইংল্যন্ডের রক্ষণভাগের মধ্যে রাইট ব্যাক কোন্সা বনাম আর্জেন্টিনার রাইট ব্যাট মলিনার মধ্যে প্লেয়ার রেটিং দেখলে মলিনা ৬.৬ রেটিং নিয়ে এগিয়ে আবার আর্জেন্টিনার লেফট ব্যাক ট্যাগলিয়াফিকো ৬.১ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ইংল্যান্ডের লেফট ব্যাক রাইলির ৫.৭ চেয়ে এগিয়ে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের রাইট সেন্টার ব্যাট জোন্স স্টোন ও লেফট সেন্টার ব্যাক গুয়েহির ৫.৮ রের্টিং পয়েন্টের চেয়ে আর্জেন্টিনার রাইট সেন্টার ব্যাক রোমেরা এবং লেফট সেন্টার ব্যাক লিসান্দ্রো মার্টিনেজ যথাক্রমে ৭.৫ এবং ৭.৪ রেটিং পয়েন্টে নিয়ে একটি এগিয়ে আছে অতএব রক্ষণভাগে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকবে।

অভিজ্ঞাতাঃ অভিজ্ঞতায় আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখেতেই হবে কারণ আর্জেন্টিনা মোট ৬ বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে ৩ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ৩ বার রানার্সআপ, অপরদিকে ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালে একবার ফাইনাল খেলে একবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আর এবার সহ মোট ৩বার সেমিফাইনালে খেলেছে। তাই অভিজ্ঞতায় আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখেতেই হচ্ছে।
প্রতি আক্রমনঃ
ইংল্যান্ড দলকে প্রতি আক্রমনে একটু এগিয়ে রাখতে হবে। কারন টমাস টুখেলের দল বল হারানোর পর দ্রুত প্রেস করে এবং প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করে। বিশেষ করে ট্রানজিশনে ইংল্যান্ডের গতি বড় অস্ত্র।
ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলাঃ
ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকটিক্যাল লড়াই মেসি বনাম বেলিংহামের মধ্যে হবে। মেসি খুঁজবেন সৃজনশীল পাসের সুযোগ অপরদিকে বেলিংহাম চেষ্টা করবেন মিডফিল্ডে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে আর্জেন্টিনাকে পিছিয়ে দিতে। আর্জেন্টিনার বল দখল বনাম ইংল্যান্ডের প্রেসিং ফুটবল আবার আর্জেন্টিনা ছোট ছোট পাসে খেলে গড়তে চাইবে আক্রমন আর ইংল্যান্ড উচ্চ প্রেসিং ও দ্রুত কাউন্টার-অ্যাটাকে ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইবে। দুই দলের উইং ব্যাটেল ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির উইঙ্গাররা আর্জেন্টিনার ফুল-ব্যাকদের চাপে ফেলতে পারে। অন্যদিকে মেসির ডান দিকের কম্বিনেশন ওভারলোড তৈরি করলে ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙার সুযোগ তৈরি হবে।
মেসির ‘ফ্রি রোল’ শক্তিঃ
১. লিওনেল মেসি মাঝমাঠ ও আক্রমণের মাঝের ফাঁকা জায়গায় নেমে খেলা তৈরি করেন। তাকে থামাতে ইংল্যান্ডকে সমন্বিত প্রেসিং করতে হবে; একক মার্কিং যথেষ্ট নাও হতে পারে।
২. আলভারেজ-লাউতারোর ডাবল থ্রেট জুলিয়ান আলভারেজের নিরন্তর দৌড় এবং লাউতারো মার্টিনেজের বক্সে ফিনিশিং ইংল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাকদের ব্যস্ত রাখবে। মেসির থ্রু পাস ও দ্রুত ওয়ান-টু এই জুটির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
৩. নকআউট অভিজ্ঞতা লিওনেল স্কালোনির দল কঠিন ম্যাচে ধৈর্য ধরে খেলার অভ্যাস গড়ে তুলেছে এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে দক্ষ।
ইংল্যান্ডের শক্তিঃ
১. বেলিংহামের বক্স-টু-বক্স আধিপত্য আক্রমণ ও রক্ষণ-দুই দিকেই সমান কার্যকর। দ্বিতীয় সারি থেকে তার দৌড় আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
২. হ্যারি কেইনের হোল্ড-আপ প্লে কেইন নিচে নেমে বল ধরে রেখে উইঙ্গার ও মিডফিল্ডারদের আক্রমণে যুক্ত করেন। এই কৌশল আর্জেন্টিনার সেন্টার-ব্যাকদের পজিশন ভেঙে দিতে পারে।
৩. টুখেলের সংগঠিত প্রেসিং বল হারানোর পর দ্রুত প্রেস করে এবং প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করে।
বিশেষ করে ট্রানজিশনে ইংল্যান্ডের গতি বড় অস্ত্র।
বিশ্বকাপের ২য় সেমি ফাইনাল হতে পারে বিশ্বকাপের সবচেয়ে কৌশলনির্ভর সেমিফাইনাল গুলোর একটি। আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ ও মেসির সৃজনশীলতার ওপর ভর করবে, আর ইংল্যান্ড নির্ভর করবে শারীরিক শক্তি, সংগঠিত প্রেসিং এবং দ্রুত ট্রানজিশনের ওপর। ম্যাচের ফল নির্ধারণে মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট ছোট ট্যাকটিক্যাল ভুলই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
হেড-টু-হেড পরিসংখ্যান
মোট ম্যাচ: ১৪। ইংল্যান্ডের জয়: ৬ ম্যাচ। আর্জেন্টিনার জয়: ৩ ম্যাচ। (অফিসিয়াল রেকর্ডে ১৯৯৮ সালের পেনাল্টি শুটআউটের জয়টিকে ড্র হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে সেটিসহ ধরলে ৪টি জয়) ড্র: ৫ ম্যাচ।

বিশ্বকাপ মঞ্চে মুখোমুখি লড়াইঃ
ফিফা বিশ্বকাপে এই দুই দল মোট ৫ বার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ইংল্যান্ড জয়ী ৩ বার আর্জেন্টিনা ২বা। তবে নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনার সাফল্য বেশি।
| বছর | বিশ্বকাপের মঞ্চ | ফলাফল |
| ১৯৬২ | গ্রুপ পর্ব | আর্জেন্টিনা ১ – ৩ ইংল্যান্ড |
| ১৯৬৬ | কোয়ার্টার-ফাইনাল | আর্জেন্টিনা ০ – ১ ইংল্যান্ড |
| ১৯৮৬ | কোয়ার্টার-ফাইনাল | আর্জেন্টিনা ২ – ১ ইংল্যান্ড (মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল) |
| ১৯৯৮ | শেষ ১৬ | আর্জেন্টিনা ২ – ২ ইংল্যান্ড (টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা ৪-৩ ব্যবধানে জয়ী) |
| ২০০২ | গ্রুপ পর্ব | আর্জেন্টিনা ০ – ১ ইংল্যান্ড |
নোট: ১৯৫৩ সালের ১৪ মে বুয়েনস আইরেসে অনুষ্ঠিত একটি প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-১ ব্যবধানে জয় পেলেও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি বাতিল করা হয়। তাই ফিফা বা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল রেকর্ডে সেটিকে আন্তর্জাতিক ম্যাচের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।


