ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যেও এক প্রান্ত আগলে রেখে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেললেন তাওহিদ হৃদয়। তাঁর অপরাজিত ২৪২ রানের ইনিংসে ভাঙল বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের একাধিক রেকর্ড।
একদিকে উইকেট হারানোর চাপ, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের বোলারদের একের পর এক আক্রমণ। কিন্তু কোনো কিছুই টলাতে পারেনি তাওহিদ হৃদয়কে। সতীর্থরা যখন আসা-যাওয়ার মধ্যে ব্যস্ত, তখন অন্য প্রান্তে অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে গেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। প্রথম টেস্টে ব্যর্থতার পর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাট হাতেই দিয়েছেন তার জবাব। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে নিয়ে গেছেন দ্বিশতকে। শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, গড়েছেন একের পর এক জাতীয় রেকর্ড।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন হৃদয়। ৩৫৯ বলের ইনিংসে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কা মেরেছেন তিনি। তাঁর ব্যাটে ভর করেই প্রথম ইনিংসে ৩৮৬ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে স্বাগতিকদের লিড দাঁড়ায় ৩০ রানে।
তবে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হওয়ার পেছনে ছিল দুর্ভাগ্যও। ফিল্ডিংয়ের সময় চোট পাওয়ায় ব্যাটিংয়ে নামতে পারেননি সাদমান ইসলাম। নবম উইকেটের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। ফলে অপরাজিত থেকেই মাঠ ছাড়তে হয় হৃদয়কে।
এই ইনিংসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন হৃদয়। এত দিন রেকর্ডটি ছিল মুশফিকুর রহিমের দখলে। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুরে অপরাজিত ২১৯ রান করেছিলেন মুশফিক। তাঁর সেই কীর্তিকে ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন হৃদয়।
বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটারও এখন হৃদয়। এর আগে মুশফিকুর রহিম তিনটি এবং তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান একটি করে দ্বিশতক করেছিলেন। তবে একটি জায়গায় আগের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন হৃদয়। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার তিনি।
এর আগে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল মুমিনুল হকের। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮১ রান করেছিলেন তিনি। হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংসে ভেঙেছে সেই রেকর্ডও। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরিকে দ্বিশতকে পরিণত করা ৪৫তম ব্যাটার হয়েছেন হৃদয়। এই তালিকায় তাঁর চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন মাত্র ১১ জন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি এটি।
ব্যাটিংয়ে ধৈর্য ও আগ্রাসনের দারুণ সমন্বয় দেখিয়েছেন হৃদয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণাত্মক খেলেছেন, আবার সুযোগ পেলেই বল পাঠিয়েছেন সীমানার বাইরে। তাঁর ১১টি ছক্কা বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার নতুন রেকর্ড। এর আগে সাতটি ছক্কা মেরে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন তামিম ইকবাল।
বিশ্ব রেকর্ডের কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিলেন হৃদয়। টেস্টের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ১২টি ছক্কার রেকর্ড রয়েছে ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সওয়ালের। শেষ ব্যাটার হিসেবে তাসকিন আহমেদ আরও কিছুক্ষণ উইকেটে থাকলে হয়তো সেই রেকর্ডেও ভাগ বসাতে পারতেন হৃদয়। ১১ ছক্কা নিয়ে এখন বিরল এক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর ইনিংসের ১৫৪ রান এসেছে বাউন্ডারি থেকে, যা বাংলাদেশের ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
দ্বিতীয় দিনের সকালে ২৯ রান নিয়ে ব্যাটিং শুরু করেছিলেন হৃদয়। দিনের খেলা শেষে তাঁর সংগ্রহে যোগ হয় আরও ২১৩ রান। এক দিনে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ রান করার কীর্তিও এখন তাঁর দখলে। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব আল হাসানের করা ২১২ রানের রেকর্ডটি পেছনে পড়ে গেছে।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামও পেল প্রথম টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরির স্বাদ। ২০১৮ সালে টেস্ট অভিষেকের পর এই মাঠে এত দিন কোনো ব্যাটার দ্বিশতক করতে পারেননি। মাহমুদুল হাসান জয়ের ১৭১ রানের ইনিংস ছিল আগের সর্বোচ্চ। হৃদয়ের ২৪২ রানে সেই রেকর্ডও এখন অতীত।
ব্যক্তিগত কীর্তির পাশাপাশি দলের লড়াইয়েও বড় ভূমিকা রেখেছেন হৃদয়। সপ্তম উইকেটের পতন হয়েছিল ১৮৪ রানে। এরপর তাইজুল ইসলামকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রানের জুটি গড়েন তিনি। সিলেটের মাঠে এই উইকেটে এটিই প্রথম শতরানের জুটি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে অষ্টম উইকেটে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি।
তাইজুলের বিদায়ের পর তাসকিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে নবম উইকেটে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। সিলেটে নবম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ জুটি। শেষ তিন উইকেটে বাংলাদেশের ২০২ রানও নতুন রেকর্ড। ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ তিন উইকেটে করা ১৯৮ রানকে ছাড়িয়ে গেছে এই সংগ্রহ।
সব মিলিয়ে হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংসটি কেবল একটি দ্বিশতক নয়, বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে একাধিক নতুন মাইলফলক। ব্যক্তিগত ব্যাটিংয়ের রেকর্ড থেকে শুরু করে দলীয় জুটি-সবখানেই নিজের নাম লিখিয়েছেন এই তরুণ ব্যাটার।


