বিখ্যাত মাইক টাইসন একবার বলেছিলেন, “মুখে ঘুষি খাওয়ার আগ পর্যন্ত সবারই একটা পরিকল্পনা থাকে।” এমন একক লড়াইয়ে নামার জন্য বিশেষ ধরনের মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, যেখানে শেষ পর্যন্ত কে আগে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, তার ওপরই প্রায় নির্ধারিত হয় ফলাফল। তবে লড়াকু মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে বক্সিং একমাত্র খেলা নয়। বক্সিং এর সাথে ফুটবল উত্তেজনার একটা বন্ধন অনুভব করা যায় বলা যায় ফুটবল ও বক্সিং এর উত্তেজনার মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
আবেগ ও লড়াকু মানসিকতাই সাবেক হেভিওয়েট বিশ্বচ্যাম্পিয়ন টাইসনকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ’ উপাধি এনে দিয়েছিল। ব্রুকলিনের কঠিন পরিবেশ থেকে লাস ভেগাসের ঝলমলে আলোয় পৌঁছানোর পেছনে ছিল অসংখ্য ঘণ্টার অনুশীলন, স্প্যারিং ও পাঞ্চিং ব্যাগে ঘুষি মারার কঠোর পরিশ্রম। অসম্ভব মনে হওয়া স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি একসঙ্গে কাজে লাগিয়েছিলেন মানসিক দৃঢ়তা ও দক্ষতা।
গ্লাভস পরে রিংয়ে নামা হোক কিংবা বুট পরে ফুটবল মাঠে-উত্তেজনা, লড়াই আর রোমাঞ্চে ভরপুর এই দুই খেলার মধ্যে সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
খেলাধুলার বিভিন্ন অঙ্গনেই এমন অনেক গল্প রয়েছে, যেখানে দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে সাফল্য ও সম্পদের দেখা পেয়েছেন ক্রীড়াবিদেরা। ফুটবলও এর ব্যতিক্রম নয়। সাধারণ ও সাদামাটা পরিবেশ থেকে উঠে এসে অনেকেই কাটিয়েছেন বিলাসবহুল জীবন। শীর্ষে পৌঁছানোর পথে তাঁদেরও সহ্য করতে হয়েছে অসংখ্য কঠিন আঘাত-যে আঘাতের কথা টাইসন এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিলেন।

ফুটবল দলগত খেলা, আর বক্সিং ব্যক্তিগত লড়াই। তারপরও এই দুই খেলার মধ্যে রয়েছে অনেক মিল। আর এ কারণেই ফুটবল মাঠ ও বক্সিং রিংয়ের তারকাদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় গভীর সম্পর্ক।
বক্সিং ও ফুটবলের মধ্যে এত গভীর সম্পর্ক কেন?
দক্ষতার দিক থেকে বক্সিং ও ফুটবল সম্পূর্ণ আলাদা। একটিতে পায়ের নিপুণ ব্যবহার প্রয়োজন, অন্যটিতে মুগ্ধ করার মতো হাতের গতি। পায়ের ওপর ভর করে দ্রুত চলার ক্ষমতা ছাড়া এই দুই খেলার দক্ষতার মধ্যে খুব বেশি মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তবে এই সম্পর্কের ভিত্তি শারীরিক গঠন কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়; বরং এর শিকড় রয়েছে সমাজব্যবস্থা ও শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাসে। অনেকের কাছেই বক্সিংয়ের গ্লাভস কিংবা ফুটবলের বুট জীবনের বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ, নতুন সুযোগ, আবেগ প্রকাশের মাধ্যম এবং এমন একটি পরিবার, যেখানে তাঁরা আপনজন হয়ে উঠতে পারেন।
বর্তমানে দুই খেলাতেই বিপুল অর্থের ছড়াছড়ি থাকলেও, উভয় খেলার জন্ম হয়েছিল তুলনামূলকভাবে অনাড়ম্বর পরিবেশে। শ্রমজীবী মানুষের মূল্যবোধই গড়ে দিয়েছে এই দুই খেলার পরিচয়। আর এই বন্ধন কখনোই ছিন্ন হওয়ার নয়।
সাবেক ডব্লিউবিও ক্রুজারওয়েট বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ক্রিস বিলাম-স্মিথও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বোর্নমাউথের একনিষ্ঠ সমর্থক এই বক্সারকে তাঁর প্রিয় দুই খেলার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি গোল ডটকমকে বলেন, “দারুণ একটি প্রশ্ন। আমার মনে হয়, এই দুই খেলার দর্শকদের মধ্যে বেশ ভালো মিল রয়েছে।
“বক্সিংপ্রেমীরা সাধারণত দিনের বেলায় ফুটবল দেখেন, এরপর বক্সিং দেখতে যান। ফলে ফুটবল ম্যাচের দর্শকদের তুলনায় তাঁদের মধ্যে কিছুটা বেশি উচ্ছ্বাস থাকে, অনেক সময় তাঁরা একটু বেশিই মদ্যপান করে ফেলেন! তবে দুই ক্ষেত্রেই আবেগ ও ভালোবাসা সব সময় থাকে।
“আর যখন সমর্থকেরা কোনো ব্রিটিশ বক্সার কিংবা ব্রিটিশ বক্সিং অঙ্গনের পাশে দাঁড়ান, তখন ফুটবল থেকে পাওয়া সেই আবেগ ও ভালোবাসাই তাঁরা বক্সারদের জন্যও দেখান।” বিলাম-স্মিথকে আরও প্রশ্ন করা হয়, অনেক বক্সার ফুটবলের একনিষ্ঠ সমর্থক হওয়ার পেছনে কি এই কারণ কাজ করে যে, ফুটবল ক্লাবগুলো প্রতিটি এলাকার মানুষের মিলনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে একত্রিত করে?
জবাবে তিনি বলেন, “আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্যই এমন। এএফসি বোর্নমাউথ আমাদের এলাকার প্রাণকেন্দ্র। গত ১০-১৫ বছরে তারা যেভাবে এগিয়েছে, তা পুরো শহরের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
“আমিও তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। এই শহরের অংশ হতে পারাটা দারুণ ব্যাপার। ক্লাবটিও সব সময় আমার পাশে থেকেছে, আমাকে সমর্থন দিয়েছে এবং সহযোগিতা করেছে।” ২০২৬-২৭ মৌসুমে বোর্নমাউথের ফুটবল দলের মতোই বিলাম-স্মিথও নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছেন বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী। বর্তমানে কয়েক হাজার মানুষ তাঁর পাশে রয়েছেন, যা তাঁর প্রাপ্য সমর্থনেরই প্রতিফলন।
চাপ ও প্রত্যাশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সেরাদের কাতারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফুটবলারদের মতো মানসিক দৃঢ়তার গুরুত্ব কতটা-এ প্রসঙ্গে বিলাম-স্মিথ বলেন,
“আমার মনে হয়, বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। তবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর গুরুত্বকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হয় না। আমার বিশ্বাস, যেকোনো ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে খেলাধুলায়। “মানুষ প্রতিভা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে অনেক কথা বলে। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রতিভাকে অনেক সময় অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
“কেউ যদি খুব অল্প বয়সেই অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেয়, অনেক সময় সেটিই তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সে নিজের প্রতিভা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে এবং মনে করে, তার আর অনুশীলন কিংবা নিজেকে উন্নত করার প্রয়োজন নেই।
“তাই সব সময় শক্তিশালী মানসিকতা ধরে রাখা খুব জরুরি। শেষ পর্যন্ত মানুষকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় এই মানসিক দৃঢ়তাই।”


