দেশের তিন টিভি চ্যানেলে বিশ্বকাপের সব খেলা

বাংলাদেশে এই মেগা ইভেন্টের সম্প্রচার নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে যে চরম নাটকীয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, অবশেষে তার সফল অবসান ঘটেছে

বিশ্বকাপ ট্রফি - গেটি ইমেজেস

আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরপরই বিশ্বজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে ফুটবল গ্রেটদের মহোৎসব ‘ফিফা বিশ্বকাপ’। তবে বাংলাদেশে এই মেগা ইভেন্টের সম্প্রচার নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে যে চরম নাটকীয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, অবশেষে তার সফল অবসান ঘটেছে। দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে স্বস্তি দিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ ঘরে বসেই সরাসরি উপভোগ করা যাবে।

দেশীয় তিনটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল – সময় টিভি, বিটিভি এবং টি স্পোর্টস সম্মিলিতভাবে এবারের বিশ্বকাপের খেলাগুলো সরাসরি সম্প্রচার করবে। এই তিন প্রতিষ্ঠানের একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়াম (যৌথ জোট) বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার (FIFA) কাছ থেকে বাংলাদেশে খেলা দেখানোর অফিশিয়াল সম্প্রচারস্বত্ব বা ব্রডকাস্ট রাইটস অবমুক্ত করেছে।

যেভাবে কাটল বড় সংকট

এবারের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের পেছনের গল্পটা ছিল বেশ নাটকীয়। শুরুতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড’ বাংলাদেশের বাজারের জন্য ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কিনে নিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল স্থানীয় কোনো বড় চ্যানেলের কাছে এটি পুনর্বিক্রি করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও দেশের বাজারে সেই স্বত্ব বিক্রি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। শেষমেশ টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে তারা ফিফার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বাজার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়।

এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধাক্কা লাগে। বিশ্বকাপ দুয়ারে কড়া নাড়লেও বাংলাদেশে কোনো অফিসিয়াল ব্রডকাস্টার ছিল না, যা দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকটের জন্ম দেয়। কোটি ভক্তের মনে প্রশ্ন জাগে – তবে কি এবার টিভিতে বিশ্বকাপ দেখা থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ?

সংকট কাটাতে কাজ করেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও বাফুফে সভাপতি

এই চরম সংকটময় মুহূর্তে ফুটবলপ্রেমীদের মুখে হাসি ফোটাতে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল। দেশজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা ধরে রাখতে তারা উভয়ে মিলে জরুরি ভিত্তিতে হাল ধরেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তারা যৌথভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া চ্যানেল, জাতীয় গণমাধ্যম, প্রধান প্রধান টেলিযোগাযোগ অপারেটর এবং ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে ম্যারাথন বৈঠক শুরু করেন। এই সংকট সমাধানের জন্য তারা বিজ্ঞাপনের প্রথাগত মডেলের বাইরে গিয়ে ডিজিটাল ও টেলিকম খাত থেকে রেভিনিউ বা আয়ের কিছু অভিনব ও আধুনিক উপায় বের করেন। এর আগে বাংলাদেশে কোনো বিশ্বকাপের সময় এই ধরনের ডিজিটাল আয়ের উৎস ব্যবহার করা হয়নি। তাদের এই যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই শেষ মুহূর্তের এই জটিল জট খোলা সম্ভব হয়।

টিভি ও ডিজিটাল স্ক্রিনে যেভাবে দেখা যাবে খেলা

নতুন এই ঐতিহাসিক চুক্তি অনুযায়ী, টেলিভিশন পর্দার দর্শকদের জন্য খেলাগুলো একচেটিয়াভাবে বরাদ্দ থাকবে সময় টিভি, বিটিভি ও স্পোর্টস ঘরানার চ্যানেল টি স্পোর্টসের জন্য।

তবে প্রযুক্তিপ্রেমী ও তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে ডিজিটাল মাধ্যমেও রাখা হয়েছে দারুণ ব্যবস্থা। যারা ঘরের বাইরে থাকবেন বা মোবাইল, ট্যাবলেট ও ল্যাপটপে খেলা দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তারা একদম ঝকঝকে এইচডি (HD) কোয়ালিটিতে ম্যাচগুলো স্ট্রিমিং করতে পারবেন। এ জন্য দেশের দুটি শীর্ষ মোবাইল অপারেটরের ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলালিংকের জনপ্রিয় ওটিটি অ্যাপ ‘টফি’ (Toffee) এবং গ্রামীণফোনের স্ট্রিমিং সেবা ‘বায়োস্কোপ’ (Bioscope)-এ বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

সরকারি কোষাগারের পুরো অর্থ সাশ্রয়

এবারের সম্প্রচার চুক্তির সবচেয়ে ইতিবাচক এবং আকর্ষণীয় দিক হলো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সম্পৃক্ততা। সাধারণত বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট দেখাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বা রয়্যালটি ফি গুনতে হয়। তবে এবার বিটিভিকে এই মেগা ইভেন্ট সম্প্রচারের জন্য কোনো ধরনের আর্থিক তহবিল বা ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে না।

চুক্তির শর্তানুযায়ী, বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং সহযোগী টেলিযোগাযোগ অপারেটররা যৌথভাবে এই পুরো সম্প্রচার খরচ ও লাইসেন্স ফি স্পন্সরশিপের মাধ্যমে পরিশোধ করবে। এর ফলে সরকারের কোনো অর্থ খরচ ছাড়াই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিটিভির অ্যানালগ ও ডিজিটাল পর্দায় বিশ্বকাপের বিশ্বমানের রোমাঞ্চকর ম্যাচগুলো উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই উদ্যোগকে দেশের ক্রীড়ামোদী মহল ও সাধারণ দর্শক সাধুবাদ জানিয়েছেন।

Exit mobile version