মালেতে ফুটবল মাঠে রণক্ষেত্র: টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের বিদায়

রেফারির একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুমুল মারামারি, গ্যালারির উত্তেজনা আর শেষ মুহূর্তে লাল কার্ডের জোড়া ধাক্কা

পুরো ম্যাচে দু’দলের খেলোয়াড়রাই ছিলেন আক্রমণাত্নক।

মাঠের ফুটবল রূপ নিল রণক্ষেত্রে। রেফারির একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুমুল মারামারি, গ্যালারির উত্তেজনা আর শেষ মুহূর্তে লাল কার্ডের জোড়া ধাক্কা; সব মিলিয়ে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে রোববার রাতে মঞ্চস্থ হলো নজিরবিহীন এক বিশৃঙ্খলা। মালদ্বীপ ফুটবলের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডায়মন্ড জুবিলি ফুটবল টুর্নামেন্টে’ স্বাগতিক মালদ্বীপের বিপক্ষে বাঁচামরার ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২৩ অলিম্পিক দল। তবে ম্যাচের ফুটবলীয় লড়াইকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে শেষ মুহূর্তের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা।

বাংলাদশের আল আমীন ও মালদ্বীপের হাসানের মধ্যে বল দখলের লড়াই।

শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা জোড়া লাল কার্ড

মালের জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার তখন আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত বাকি। ইঞ্জুরির কারণে যোগ করা সময়ে বল দখলের লড়াইয়ে বাংলাদেশের পিয়াস আহমেদের সঙ্গে সংঘর্ষে মাটিতে পড়ে যান মালদ্বীপের হাসান ইনাজ। রেফারি সেকারান সেন্থিলনাথন সঙ্গে সঙ্গে মালদ্বীপের পক্ষে ফ্রি-কিকের সিদ্ধান্ত দিলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা।

সাইড বেঞ্চ থেকে উঠে এসে তীব্র প্রতিবাদ করায় প্রথমে লাল কার্ড দেখেন ফরোয়ার্ড মিরাজুল ইসলাম। এরপর মাঠের ভেতরে রেফারির সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে লাল কার্ড পান আরেক ফরোয়ার্ড আল-আমিন। কার্ড দেখার পর নিজের মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে রেফারিকে ধাক্কাও দিয়ে বসেন আল-আমিন। ফলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় বাংলাদেশ।

মাঠ থেকে গ্যালারি: ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা

কিছুক্ষণ হট্টগোলের পর খেলা আবার শুরু হলেও মাঠের পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তপ্ত। এর কিছুক্ষণ পরই বাংলাদেশ অর্ধে বল দখলের লড়াইয়ে মালদ্বীপের ইব্রাহিম নাসির ও বাংলাদেশের মনজুরুর রহমান বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে দুই দলের খেলোয়াড়েরা সেখানে জড়ো হয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হন। শুরু হয় তুমুল হাতাহাতি ও মারামারি।

মাঠের এই চরম বিশৃঙ্খলা দেখে গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশি সমর্থকদের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, দুই দলের কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর ম্যাচের বাকি সময় শেষ হলে ১-১ গোলের ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়ে দুই দল।

ওদের পুলিশ কোচ আমাদের সাথে মারামারি করেছে

পুরো ঘটনার জন্য রেফারি ও আয়োজকদের চরম অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ দলের গোলরক্ষক আসিফ ভূঁইয়া। তিনি বলেন:

“রেফারির কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের খেলোয়াড়রা মেজাজ ঠিক রাখতে পারেনি। আমরা ফাইনালে যেতে পারতাম… আসলে ফুটবল ম্যাচে এসব কোনোটাই কাম্য নয়।”

আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা মালদ্বীপের পুলিশ ও স্বাগতিক কোচের আচরণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আসিফ আরও বলেন:

একটা ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচে তাদের পুলিশ আমাদের সাথে ফাইট করেছে, মাঠে দর্শক ঢুকে গেছে। ওদের কোচ আমাদের সাথে মারামারি করছে। এইসব বিষয় আর কি। এটা তো আসলে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচে মানায় না।

পেনাল্টির নাটকীয়তা মিরাজুলের সমতা

এর আগে ফাইনালে ওঠার সমীকরণ মাথায় নিয়ে মাঠে নেমেছিল মারুফুল হকের শিষ্যরা। ম্যাচের ১৩ মিনিটে রক্ষণভাগের ভুলে পেনাল্টি হজম করে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

প্রথমার্ধের ২৫ মিনিটে বাংলাদেশও একটি পেনাল্টির জোরালো দাবি তুলেছিল, তবে রেফারি তাতে সাড়া দেননি। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় দল।

দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়ায় বাংলাদেশ। অবশেষে মালদ্বীপের এক ডিফেন্ডারের হ্যান্ডবলের কারণে পেনাল্টি পায় লাল-সবুজ দল। স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে দলকে সমতায় ফেরান মিরাজুল ইসলাম। এরপর জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালালেও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি বাংলাদেশ।

দিনের অন্য ম্যাচে পাকিস্তান ২-০ গোলে আফগানিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছায়। বাংলাদেশ যদি এই ম্যাচটি জিততে পারত, তবে ৫ পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালে যেতে পারত। কিন্তু ড্র করায় ৩ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নিতে হয় বাংলাদেশকে। আর ৪ পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালের টিকিট পায় আফগানিস্তান। আগামী ১০ জুন ফাইনালে পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে তারা।

উল্লেখ্য, টুর্নামেন্টের বাকি তিন দল সিনিয়র জাতীয় দল নিয়ে খেললেও বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে অলিম্পিক (অনূর্ধ্ব-২৩) দল নিয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে তিন ম্যাচ খেলে তিনটিতেই ড্র করে অপরাজিত থাকলেও, মাঠের বাইরের এই বিতর্ক আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েই দেশে ফিরতে হচ্ছে মারুফুল হকের দলকে।

Exit mobile version