সাফ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের মেগা ফাইনালে আজ মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ এবং টুর্নামেন্টের সফলতম দল ভারত। গোয়ার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবলের এই ‘ক্ল্যাসিক’ লড়াই।
একদিকে টানা তৃতীয় বা হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর লাল-সবুজের মেয়েরা; অন্যদিকে নিজেদের হারানো ট্রফি পুনরুদ্ধার করে ষষ্ঠবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হতে মরিয়া স্বাগতিক ভারত। ফাইনালকে ঘিরে দুই দেশের ফুটবলপ্রেমী ও সমর্থকদের মধ্যে এখন তুমুল উত্তেজনা বিরাজ করছে।
শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচে আসার আগে দুই দলকেই কঠিন ও নাটকীয় পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। গ্রুপ পর্বে ভারতের কাছে ৩–০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে টুর্নামেন্টে বড় ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে সেই পরাজয়ের গ্লানি ভুলে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় পিটার বাটলারের শিষ্যরা। সেমিফাইনালে শক্তিশালী নেপালকে বিদায় করে ফাইনালে পা রাখে টাইগ্রেসরা। অন্যদিকে, ভারত সেমিফাইনালের মঞ্চে লড়াকু ভুটানকে ১–০ গোলে পরাস্ত করে ফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।
গ্রুপ পর্বে ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও ফাইনাল নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রণকৌশল সাজাচ্ছেন বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার। গ্রুপ পর্বের হারের পর দলের কিছু খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, এখন তিনি অতীত ভুলে সামনে তাকাতে চান।
বাটলার বলেন:
“গ্রুপ পর্বে কী হয়েছে তা আমি মনে রাখতে চাই না। এটি একেবারে নতুন একটি ম্যাচ। গ্রুপ পর্বের হারের সঙ্গে ফাইনালের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।”
তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, ভারতের আক্রমণাত্মক খেলার ধরন বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। প্রতিপক্ষ আক্রমণে এগিয়ে এলে কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা আক্রমণে গোল করার সুযোগ তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ দলের অন্যতম অভিজ্ঞ ফুটবলার ও অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে দারুণ আশাবাদী। হ্যাটট্রিক শিরোপার হাতছানি থাকলেও দল কোনো বাড়তি চাপ নিচ্ছে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। মারিয়া বলেন:
“ফাইনালে উঠেছি, এখন মাঠের সুযোগগুলো আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাই। চাপ বলতে আমাদের কিছু নেই। আমরা ভারতের সঙ্গে আগে অনেক ম্যাচ খেলেছি এবং তাদের শক্তির জায়গা সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারণা আছে। মাঠে তাদের সঙ্গে সমানে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
নিজেদের মাঠে খেলা হলেও স্বাগতিক ভারতকে ফেভারিট মানতে নারাজ দলটির প্রধান কোচ ক্রিসপিন ছেত্রী। ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বেশ সতর্কতার সুর শুনিয়েছেন। বাংলাদেশ দলকে ‘পূর্ণ শক্তির দল’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমার চোখে ফাইনাল ম্যাচটি ৫০-৫০ হবে এবং দুই দলেরই জেতার সমান সুযোগ রয়েছে।”
গোয়ায় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও স্টেডিয়ামে আশানুরূপ দর্শক সমর্থনের অভাবের কথা উল্লেখ করে ছেত্রী জানান, তারা কোনো ‘হোম অ্যাডভান্টেজ’ বা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন না। গ্রুপ পর্বের মতো ফাইনালেও তিনি মেয়েদের ওপর কোনো চাপ না দিয়ে স্বাধীনভাবে খেলার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্পটলাইটে যারা: দুই দলের শক্তিমত্তা
আজকের মহারণে দুই দলের তারকা খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সই গড়ে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
- বাংলাদেশ: আক্রমণভাগে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, ঋতুপর্ণা চাকমা এবং মাঝমাঠে মনিকা চাকমারা যেকোনো মুহূর্তে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দিতে প্রস্তুত।
- ভারত: স্বাগতিকদের মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন সানফিদা নংরুম, মালাভিকা এবং গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ পন্থোই চানু।
ঐতিহ্য বনাম শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার মহারণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও ভারতের নারী ফুটবল দলের লড়াই দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় রাইভালরিতে পরিণত হয়েছে। একদিকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার ও ইতিহাসে নিজেদের নাম হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খোদাই করার মিশন, অন্যদিকে ভারতের ট্রফি পুনরুদ্ধারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সব মিলিয়ে আজ গোয়ার মাঠে ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করতে যাচ্ছেন আবেগ, উত্তেজনা আর মর্যাদার এক অবিস্মরণীয় মহাযুদ্ধ।
