শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের ইতিহাস প্রায় দেড় শ বছরের। দেশটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেরও বয়স এক শ বছরের বেশি। ১৯৮১ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে শ্রীলঙ্কা। তবে এত দিন দেশটির সক্রিয় পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য বোর্ড স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত কোনো সংগঠন ছিল না। সেই ঘাটতি পূরণে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে শ্রীলঙ্কান প্রফেশনাল ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (এসএলপিসিএ)।
সংগঠনটির প্রথম সভাপতি হয়েছেন শ্রীলঙ্কার বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক কুসাল মেন্ডিস। দেশের পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য স্বাধীন ও সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করাই নতুন এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এসএলপিসিএ গঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ। পুরুষ দলের তারকা ক্রিকেটার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গার পাশাপাশি নারী দলের অধিনায়ক চামারি আতাপাত্তুও সংগঠনটি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
বিশ্বজুড়ে পেশাদার ক্রিকেটারদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউসিএ) সরাসরি অধিভুক্ত হয়েছে এসএলপিসিএ। এত দিন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা ডব্লিউসিএর আন্তর্জাতিক কর্মসূচি, খেলোয়াড়দের কল্যাণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে কাঠামোগতভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
চলতি বছরের শুরুতে চামারি আতাপাত্তুকে ডব্লিউসিএর খেলোয়াড় পরামর্শক বোর্ডে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপরই শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় সংগঠনের সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
ভারত ও পাকিস্তানের মতো শ্রীলঙ্কাও এত দিন ডব্লিউসিএকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া বা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা উল্লেখযোগ্য ক্রিকেট বোর্ডগুলোর একটি ছিল। এসএলপিসিএ গঠনের মধ্য দিয়ে সেই অবস্থার পরিবর্তন হলো।
এর ফলে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের সংগঠনটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন, ইংল্যান্ডের প্রফেশনাল ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতো প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় সংগঠনগুলোর পথ অনুসরণ করবে।
শ্রীলঙ্কায় অবশ্য ২০০১ সাল থেকে ‘শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল। তবে সেটি মূলত অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটারদের প্রাধান্যেই পরিচালিত হয়েছে। সংগঠনটির স্বাধীনতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের কেউ কেউ এটিকে কখনো বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে, আবার কখনো বোর্ডের চাপের মধ্যে থাকা সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নতুন এসএলপিসিএর ক্ষেত্রে সেই চিত্র বদলানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নারী ও পুরুষ-দুই জাতীয় দলের সক্রিয় ক্রিকেটার, বর্তমান অধিনায়ক এবং শীর্ষ খেলোয়াড়েরা সরাসরি সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকবেন। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসে এটাই প্রথমবার, যখন নারী ও পুরুষ ক্রিকেটারদের একটি সংগঠনে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে এসএলপিসিএ বলেছে, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে ইতিবাচক পরিবর্তন ও সংস্কারের যে প্রক্রিয়া চলছে, তার গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছে। ক্রিকেটের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের একটি সংগঠিত ও কার্যকর মতামত থাকা প্রয়োজন।
সংগঠনটির ভাষ্য, ক্রিকেটারদের প্রতিনিধিত্বের এই কাঠামো আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিক ও সহযোগিতামূলক ক্রিকেটব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (এসএলসি) ও ক্রিকেটারদের মধ্যে অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে। চলতি বছরের শুরুতেও আইপিএলের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পাওয়া এবং বাধ্যতামূলক ফিটনেস পরীক্ষা নিয়ে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।
নতুন সংগঠনটি এসব বিষয়ে ক্রিকেটারদের সম্মিলিত প্রতিনিধিত্ব করবে। বোর্ডের সঙ্গে আলোচনায় ক্রিকেটারদের স্বার্থ তুলে ধরা, বিরোধ মীমাংসা এবং খেলোয়াড়দের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করাই হবে এসএলপিসিএর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কুসাল মেন্ডিসের নেতৃত্বে এই সংগঠনের যাত্রা তাই শুধু নতুন একটি ক্রিকেটার সংগঠনের আত্মপ্রকাশ নয়; শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট প্রশাসনে সক্রিয় ক্রিকেটারদের আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত ভূমিকারও সূচনা।


