ডারউইনে ইতিহাস গড়ার পর ম্যাকাইয়ে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাংলাদেশ। ব্যাট হাতে দুই ইনিংসেই চরম ব্যর্থতার খেসারত দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ৫১ রানের বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। মাত্র দুই দিনেই শেষ হয়েছে ম্যাচ। এই জয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করল অস্ট্রেলিয়া।
ম্যাকাইয়ের ম্যাচে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরু থেকেই বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীদের ইনিংস। জবাবে শরিফুল ইসলামের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়াও বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি। ২১০ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। ফলে ১৪৬ রানের লিড পায় অস্ট্রেলিয়া।
এই জায়গা থেকে বাংলাদেশের সামনে ছিল ম্যাচ বাঁচানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যাটিংয়ের চিত্র বদলায়নি। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে মাত্র ৯৫ রানেই থেমে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।
দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন মিচেল স্টার্ক। তৃতীয় ওভারে টানা দুই বলে সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হককে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে বড় ধাক্কা দেন তিনি। সাদমানের ক্যাচ নেন মার্নাস লাবুশেন। পরের বলেই মুমিনুলের অফস্টাম্প উপড়ে দেন স্টার্ক। মাত্র ৫ রানেই দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। স্টার্ককে টানা দুটি চার মেরে আত্মবিশ্বাস দেখান তিনি। কিন্তু তানজিদ হাসান তামিম বেশিক্ষণ সঙ্গ দিতে পারেননি। প্যাট কামিন্সের বলে ৩৪ বলে ৯ রান করে ফিরে যান তিনি।
ডারউইন টেস্টে সেঞ্চুরি করে আলোচনায় আসা তানজিদ এরপর টানা দুই ইনিংসে শূন্য করার পর ম্যাকাইয়ের দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ রান করেন। ফলে দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পর ব্যাট হাতে টানা তিন ইনিংসেই বড় অবদান রাখতে ব্যর্থ হন এই ওপেনার।
মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে শান্ত কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। দুজনের ২৭ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে সাময়িকভাবে স্থিরতা দেয়। কিন্তু নাথান লায়নের স্পিনে সেই জুটি ভেঙে যায়। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশ।
মিচেল স্টার্কের বোলিংয়ে বোল্ড হন লিটন দাস। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়ার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন বাংলাদেশের এই উইকেটকিপার-ব্যাটার।
এরপর প্যাট কামিন্সের একের পর এক আঘাতে বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারও ভেঙে পড়ে। মেহেদী হাসান মিরাজ করেন মাত্র ১ রান। হাসান মাহমুদের ব্যাট থেকে আসে ২ রান। শেষদিকে তাইজুল ইসলাম ৭ রান করে স্টার্কের বলে বোল্ড হলে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন মুশফিকুর রহিম। তিনি ২৯ রানে অপরাজিত থাকেন। তাসকিন আহমেদ অপরাজিত ছিলেন ৮ রানে। কিন্তু দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে তাদের প্রতিরোধও পরাজয় ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট হয়নি।
ম্যাচে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শরিফুল ইসলামের অসাধারণ বোলিং। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে মাত্র ৪৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট শিকার করেন বাঁহাতি এই পেসার। এটি টেস্টে কোনো বাংলাদেশি পেসারের সেরা বোলিং পারফরম্যান্সগুলোর একটি। তার দুর্দান্ত স্পেলে অস্ট্রেলিয়াকে ২১০ রানের মধ্যেই আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ক্যামেরন গ্রিন। তার ৬৭ রানের ইনিংস স্বাগতিকদের লিড বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত ২১০ রানে অলআউট হয়। গ্রিনকে প্রথমে এলবিডব্লিউ দেননি আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা। পরে বাংলাদেশের রিভিউয়ে সিদ্ধান্ত বদলায়।
অস্ট্রেলিয়ার শেষ দিকের ব্যাটারদের মধ্যে নাথান লায়ন অপরাজিত ৩২ রান করেন। জশ হ্যাজেলউড যোগ করেন ৬ রান। তাদের অবদানে অস্ট্রেলিয়ার লিড আরও বাড়ে এবং বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটি কঠিন হয়ে পড়ে।
ম্যাকাইয়ের আগে ডারউইনে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। সেই জয়ের সুবাদে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামে শান্তর দল।
কিন্তু ম্যাকাইয়ে দুই ইনিংসেই ব্যাটিংয়ের চরম ব্যর্থতা বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ইনিংস ও ৫১ রানের বড় জয় নিয়ে সিরিজে সমতা ফেরায় অস্ট্রেলিয়া। ইতিহাসের সিরিজ জয় না এলেও ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে ফিরছে বাংলাদেশ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
- অস্ট্রেলিয়া: ২১০ রান
- ক্যামেরন গ্রিন: ৬৭
- স্টিভ স্মিথ: ৪২
- শরিফুল ইসলাম: ৭/৪৮
- বাংলাদেশ, প্রথম ইনিংস: ৬৪ রান
- মিচেল স্টার্ক: ৬/১২
- প্যাট কামিন্স: ৩/২৫
- বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ইনিংস: ৯৫ রান
- নাজমুল হোসেন শান্ত: ৩১
- মিচেল স্টার্ক: ৪/৩৯
- প্যাট কামিন্স: ৩/১০
- নাথান লায়ন: ৩/২৫
ফলাফল: অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ৫১ রানে জয়ী।


