ক্রিকেটে কিছু রেকর্ড আছে, সময়ের সঙ্গে যেগুলোর মাহাত্ম্য একটুও কমে না। বরং বছরের পর বছর পেরিয়ে সেগুলোই হয়ে ওঠে কিংবদন্তির পরিচয়। ক্রিকেটে এমনই এক অবিস্মরণীয় সংখ্যা-৯৯.৯৪। এই অবিশ্বাস্য ব্যাটিং গড়ের মালিক স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। আজ ক্রিকেটের ‘দ্য ডন’-এর ১১৮তম জন্মবার্ষিকী।
১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্ডিতে জন্ম নেন ব্র্যাডম্যান। ছোটবেলা থেকেই ব্যাট হাতে নিজের প্রতিভার জানান দেন তিনি। বাড়ির উঠোনে গলফ বল, একটি স্টাম্প আর পানির ট্যাংককে সঙ্গী করে চলত তার অনুশীলন। দেয়ালে বল ছুড়ে স্টাম্প দিয়ে তা ফের আঘাত করার সেই অনুশীলনই ধীরে ধীরে তৈরি করে তার অসাধারণ চোখ ও হাতের সমন্বয়।
ক্রিকেটের পাশাপাশি টেনিসের প্রতিও ছিল ব্র্যাডম্যানের আগ্রহ। একসময় টেনিস খেলতে গিয়ে প্রায় দুই বছর ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটেই ফিরে আসেন। স্থানীয় ক্লাব বোরালের হয়ে ৩২০ রানের দুর্দান্ত ইনিংসসহ একের পর এক নজরকাড়া পারফরম্যান্সে নির্বাচকদের দৃষ্টি কাড়েন। ১৯২৬ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের ট্রায়ালে ডাক পাওয়ার পর ক্রিকেটকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন।
১৯২৮ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট অভিষেক হয় ব্র্যাডম্যানের। শুরুটা অবশ্য সুখকর ছিল না। কিন্তু ব্যর্থতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৩০ সালের ইংল্যান্ড সফরেই বিশ্ব ক্রিকেটকে নিজের আগমনের বার্তা দেন তিনি। ওই সফরে ৩৩৪ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।
১৯৩২-৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে ব্র্যাডম্যানকে থামাতে ইংল্যান্ড বেছে নেয় ‘বডিলাইন’ কৌশল। শরীর লক্ষ্য করে একের পর এক বল ছুড়তে থাকেন ইংলিশ বোলাররা। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি থামানো যায়নি অস্ট্রেলিয়ান এই ব্যাটিং মহাতারকাকে। তার অসাধারণ ব্যাটিং কৌশলের সামনে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা খুব একটা সফল হয়নি। সেখান থেকেই আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে তার ‘দ্য ডন’ খ্যাতি।
ব্র্যাডম্যানের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কেন তাকে সর্বকালের সেরাদের একজন বলা হয়। ৫২ টেস্টে ৬৯৯৬ রান করেছেন তিনি, ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪। ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে তার প্রয়োজন ছিল মাত্র ৪ রান। সেটি করতে পারলেই টেস্ট ব্যাটিং গড় পৌঁছে যেত ১০০-তে। কিন্তু ইংল্যান্ডের এরিক হলিসের বলে শূন্য রানে বোল্ড হয়ে যান ব্র্যাডম্যান। ফলে ১০০ ব্যাটিং গড়ের সেই অধরা মাইলফলক আর ছোঁয়া হয়নি। তবু ৯৯.৯৪-এর রেকর্ডই তাকে ক্রিকেট ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
১৯৪৮ সালে ক্রিকেটকে বিদায় জানান ব্র্যাডম্যান। এরপর প্রশাসক ও ক্রিকেট পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছ থেকে লাভ করেন নাইটহুড। এরপর থেকেই তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিত হন ‘স্যার ডন ব্র্যাডম্যান’ নামে।
২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে ৯২ বছর বয়সে মারা যান ক্রিকেটের এই কিংবদন্তি। তবে মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পরও তার ৯৯.৯৪-এর গল্প ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে সমান বিস্ময়ের। তাই সময় বদলালেও বদলায়নি ‘দ্য ডন’-এর মাহাত্ম্য। ক্রিকেট ইতিহাসে তিনি আজও এক অনন্য উচ্চতার নাম-স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।


