আর্থিক পুরস্কার ও স্থায়ী স্পন্সরশিপ
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলন কক্ষে আজ এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘আয়রনম্যান’ খ্যাত অ্যাথলেট ফেরদৌসি আক্তার মারিয়াকে তার অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে আর্থিক পুরস্কার ও স্থায়ী স্পন্সরশিপ-এর বিষয়টি তুলে ধরেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো: আমিনুল হক।
অনুষ্ঠানে মারিয়ার হাতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নগদ ৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ ক্রীড়া জীবনের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী স্পন্সরশিপ নিশ্চিত করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানান যে, বর্তমান সরকার খেলাধুলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশেই মেধারী অ্যাথলেটদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আশ্বস্ত করেন যে, মারিয়ার মতো দেশের অন্যান্য প্রতিভাবান খেলোয়াড়দেরও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে খেলাধুলার সার্বিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান অগ্রাধিকার দিয়ে একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রীড়া পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। মারিয়ার এই সাফল্য দেশের পিছিয়ে পড়া নারীদের সামনে এগিয়ে আসতে এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পুরস্কার প্রাপ্তির পর ফেরদৌসি আক্তার মারিয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য আরও বড় সাফল্য বয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
কে এই মারিয়া?
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন তরুণ ট্রায়াথলেট মারিয়া আক্তার। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি এমন এক কীর্তি গড়েছেন, যা দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতা আয়রনম্যান I৭০.৩ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফলভাবে শেষ করেছেন তিনি, যা বাংলাদেশের কোনো নারীর জন্য প্রথম।

বছরজুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ওয়ার্ল্ড ট্রায়াথলন কর্পোরেশন (ডব্লিউটিসি)। গত ১২ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পর্যটন দ্বীপ লাংকাউই-তে অনুষ্ঠিত হয় আয়রনম্যানের দুইটি ফরম্যাটের প্রতিযোগিতা। সেখানে অর্ধদূরত্বের প্রতিযোগিতা অর্থাৎ আয়রনম্যান ৭০.৩-এ অংশ নেন মারিয়া। কঠিন এই প্রতিযোগিতায় ১.৯ কিলোমিটার সাঁতার, ৯০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ২১.১ কিলোমিটার দৌড় সম্পন্ন করতে হয় প্রতিযোগীদের। মারিয়া এই তিনটি ধাপ শেষ করেন ৮ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ড সময়ে।
১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী বিভাগে অংশ নিয়ে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। শুধু প্রতিযোগিতা শেষ করাই নয়, এই সাফল্যের মাধ্যমে আগামী বছর স্পেনে অনুষ্ঠিতব্য আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করেছেন তিনি।
বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল
রংপুরের পীরগঞ্জে জন্ম নেওয়া মারিয়ার শৈশব কেটেছে সেখানেই। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও শুরুতে পরিবারের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মারিয়া নিজের দৃঢ়তার গল্প বলতে গিয়ে জানান, সেই সময় তিনি বাবা-মাকে বলেছিলেন, ভর্তি হতে না দিলে পুলিশ ডাকবেন।
বিকেএসপিতে তার মূল খেলার বিষয় ছিল ফুটবল। এমনকি নারী লিগেও খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার। তবে ট্রায়াথলনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় বাংলাদেশের ট্রায়াথলেট মোহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাত ও আরিফুর রহমান-এর ভিডিও দেখে।
মজার বিষয় হলো, আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার আগে মারিয়া কখনো সমুদ্র দেখেননি, পাহাড়ি রাস্তায় সাইক্লিংও করেননি। এমনকি তিনি আগে সাঁতারও জানতেন না। আয়রনম্যান ৭০.৩-এ নিবন্ধন করার পরই শুরু করেন সাঁতার শেখা।
২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করা মারিয়া এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি। কারণ হিসেবে তিনি জানান, আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। আর্থিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও তিনি থেমে থাকেননি। জিমের সরঞ্জাম না থাকায় পানির গ্যালন ব্যবহার করে ওয়েট ট্রেনিং করেছেন, ইউটিউব দেখে শিখেছেন বিভিন্ন কৌশল।
ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখেন এই তরুণী। তার লক্ষ্য বাংলা চ্যানেল ও ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া, আয়রনম্যানের বড় আসরে নিয়মিত অংশ নেওয়া এবং একদিন অলিম্পিক মঞ্চেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। তবে সেই পথ সহজ করতে তিনি চান পর্যাপ্ত স্পন্সরশিপ ও সহযোগিতা।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩
















