চার গোলের লিড নিয়েও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে ছিটকে গেল সেল্টিক, দায় নিলেন ও’নিল

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্লে-অফে অবিশ্বাস্য বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে সেল্টিক। অস্ট্রিয়ার রাইফাইসেন অ্যারেনায় লাস্কের বিপক্ষে চার গোলের অ্যাগ্রিগেট লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত ৫-৪ ব্যবধানে হেরে গেছে স্কটিশ চ্যাম্পিয়নরা। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে এমন নাটকীয় পতনের পর দলের ব্যর্থতার পুরো দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন সেল্টিক কোচ মার্টিন ও’নিল।

এক বছর আগে কাজাখস্তানের ক্লাব কাইরাত আলমাটির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই পর্যায় থেকেই বিদায় নিয়েছিল সেল্টিক। সেই হতাশার এক বছর পর এবারও একই জায়গায় এসে আরও বড় ধাক্কা খেল তারা। তবে এবারের ব্যর্থতার ধরন ছিল আরও অবিশ্বাস্য।

লাস্কের বিপক্ষে প্রথম লেগের পর চার গোলের অ্যাগ্রিগেট সুবিধায় ছিল সেল্টিক। অর্থাৎ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মূল পর্বে ওঠার পথে তাদের অবস্থান ছিল বেশ শক্ত। কিন্তু দ্বিতীয় লেগে দ্বিতীয়ার্ধে হঠাৎ করেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে দলটি। একের পর এক আক্রমণে সেল্টিকের রক্ষণ ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পরও ম্যাচের উত্তেজনা কাটেনি, গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

সেখানেও নিজেদের সামলাতে পারেনি সেল্টিক। পাঁচ গোল হজম করে শেষ পর্যন্ত ৫-৪ অ্যাগ্রিগেট ব্যবধানে বিদায় নেয় তারা। চার গোলের লিড থেকে এমন পরাজয় ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় সেল্টিকের অন্যতম ভয়াবহ রাত হয়ে থাকল।

ম্যাচ শেষে ব্যর্থতার দায় এড়াননি কোচ মার্টিন ও’নিল। সরাসরি নিজের দায়িত্ব স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এই ম্যাচের জন্য আমিই দায়ী।’ ২০০৩ সালের উয়েফা কাপ ফাইনালে হারের হতাশা কাটিয়ে উঠতে তার অনেক সময় লেগেছিল বলেও জানান তিনি। তবে তার মতে, সেই ফাইনালের সঙ্গে এই ব্যর্থতার তুলনা চলে না, কারণ এবার এমন একটি বাছাইপর্বের ম্যাচ ছিল, যেটি সেল্টিকের সহজেই পার হওয়ার কথা ছিল।

ও’নিল আরও স্বীকার করেছেন, বর্তমান সেল্টিক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত দল হয়ে উঠতে পারেনি। তার ভাষায়, দলটি যে এখনও অনেক দূরে রয়েছে, সেটি তারা আগেই জানতেন। তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা করে নিতে না পারায় এখন শুধু মাঠের ব্যর্থতাই নয়, আর্থিকভাবেও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে ক্লাবটিকে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মূল পর্বে খেললে যে বিশাল অর্থ আসত, সেটি এবার আর আসছে না। একই সঙ্গে এই প্রতিযোগিতার মর্যাদা ব্যবহার করে নতুন খেলোয়াড় দলে টানার যে সুযোগ ছিল, সেটিও কমে গেল। ও’নিল নিজেই স্বীকার করেছেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ থাকলে অনেক খেলোয়াড় সেল্টিকে যোগ দিতে আগ্রহী হতেন। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।

শুধু কোচ নন, দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রাও নিজেদের দায় স্বীকার করেছেন। সেল্টিক অধিনায়ক ক্যালাম ম্যাকগ্রেগর ম্যাচ শেষে বলেন, এই ফল তারা প্রাপ্য ছিল। পুরো ম্যাচে দল ছিল নিষ্ক্রিয় এবং জয়ের জন্য যথেষ্ট আগ্রাসী ছিল না।

ম্যাকগ্রেগরের মতে, প্রথম লেগেও সেল্টিক খুব ভালো খেলেনি। শুধু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করে তারা পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে রেখেছিল। এবার সেই সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি দল। সমর্থক ও ক্লাবের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি বলেন, এত বড় ব্যবধান থেকে কোনোভাবেই ম্যাচ হারার কথা ছিল না।

ম্যাকগ্রেগর আরও জানান, সেল্টিকের হয়ে খেললে এমন ধাক্কার পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। কারণ বড় ক্লাবের হয়ে খেলার অর্থই হলো কঠিন মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া দেখানো।

সাবেক সেল্টিক অধিনায়ক স্কট ব্রাউনও দলের পারফরম্যান্সে হতাশ। তার মতে, শুরুতে ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল সেল্টিক নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু এরপর ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। লাস্কের দুই ফরোয়ার্ড শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন এবং সেল্টিকের ওপর নিয়মিত চাপ তৈরি করেছেন।

সাবেক সেল্টিক কোচ নিল লেননের চোখেও দলটিকে ক্লান্ত ও দ্বৈরথে ভঙ্গুর মনে হয়েছে। তার মতে, ম্যাচের একটা পর্যায়ের পর মনে হচ্ছিল একমাত্র লাস্কই জিততে যাচ্ছে। শারীরিক ও ফুটবল, দুই দিক থেকেই অস্ট্রিয়ান দলটি সেল্টিককে চাপে ফেলেছিল।

আর সাবেক মিডফিল্ডার স্টিলিয়ান পেট্রভের বক্তব্য আরও সরাসরি, তার মতে এই ব্যর্থতার দায় সবার। তিনি আরও বলেন, সেল্টিকের মতো বড় একটি ক্লাবের চার গোলের অ্যাগ্রিগেট লিড ধরে রেখে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়া উচিত ছিল।

সব মিলিয়ে চার গোলের লিড থেকে পাঁচ গোল হজম করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার বিষয়টি সেল্টিকের জন্য এটি শুধু একটি পরাজয়ই নয় বরং তার চেয়েও বড় কিছু। সব মিলিয়ে এখান থেকে ক্লাবটির জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা যে কোচ মার্টিন ও’নিলের কাঁধেই, সেটি ম্যাচ শেষে নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles