অনেকটা আকস্মিকভাবেই এলো ঘোষণা। সোমবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান লিওনেল মেসি। মুহূর্তেই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ও বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল এক অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে মেসির এই সিদ্ধান্তকে দেখছে বিশ্ব ক্রীড়া গণমাধ্যম।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অসংখ্য রেকর্ড, সাফল্য আর স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন মেসি। তাঁর বিদায়ে জাতীয় দলে যে বড় শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিও উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে। পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে মেসির অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান এবং তাঁর উত্তরসূরি নিয়ে সম্ভাব্য প্রশ্নগুলো।
আর্জেন্টিনার প্রভাবশালী ক্রীড়া দৈনিক ‘ওলে’ ২০২৬ সালের ৩১ আগস্টকে একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, দিনটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মেসির নিজের কথাই বিশেষভাবে সামনে এনেছে পত্রিকাটি । তাদের শিরোনাম, ‘আমি আমার সর্বস্ব উজার করে দিয়েছি।’
‘ওলে’র প্রতিবেদনে মেসির হাতে লেখা বার্তার ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় দলকে ভালোবাসতেন এবং ভবিষ্যতেও ভালোবাসবেন, মেসির এমন বক্তব্য তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিলেও আর্জেন্টিনার পাশে থাকবেন তিনি। ভালো সময় হোক কিংবা খারাপ, মাঠের বাইরে থেকে জাতীয় দলকে সমর্থন করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মেসি।
তবে তাঁর বিদায়ে আর্জেন্টিনা ফুটবলে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করছে ‘ওলে’। মেসিকে ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘ এক যুগের পর জাতীয় দলকে এখন নতুন করে পথচলা শুরু করতে হবে, এমনই ইঙ্গিত তাদের বিশ্লেষণে।
স্পেনের জনপ্রিয় ক্রীড়া দৈনিক ‘মার্কা’ মেসির অবসরকে বলেছে ‘বৈশ্বিক বোমা বিস্ফোরণ’। মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। নতুন অধিনায়ক কে হবেন, নেতৃত্ব কার হাতে যাবে এবং মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনা কেমন হবে, এসব প্রশ্ন সামনে আসবে বলে মনে করছে ‘মার্কা’।
মেসির আন্তর্জাতিক রেকর্ডও আলাদা করে তুলে ধরেছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমটি। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড তাঁর দখলে। এই পরিসংখ্যানের পুনরাবৃত্তি করা যে কঠিন, সেটিও উল্লেখ করেছে ‘মার্কা’।
কাতালান সংবাদমাধ্যম ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’ও মেসির অবসরকে বিশ্ব ফুটবলের বড় ঘটনা হিসেবে দেখেছে। তাদের ভাষায়, ‘বিশ্ব ফুটবলে বোমা ফাটল।’ ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে উল্লেখ করে তারা জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামবেন না এই কিংবদন্তি।
ইতালির ‘লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত’ অবশ্য মেসির সিদ্ধান্তের মানবিক দিকটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির চোখে, এটি ছিল ‘যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু অপরিহার্য’ একটি সিদ্ধান্ত। মেসির বক্তব্য, ‘আমার আর দেওয়ার কিছুই নেই, এই দলে দারুণ সব খেলোয়াড় আছে যারা সুযোগ পাওয়ার যোগ্য’ তুলে ধরে তারা বলেছে, এর মধ্য দিয়েই জাতীয় দলে ‘ফ্লিস’ যুগের অবসান ঘটল।
আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং দুইবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিদায় জানাচ্ছেন মেসি, এটিও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমটি।
ফ্রান্সের প্রভাবশালী ক্রীড়া দৈনিক ‘লেকিপ’ মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়েছে। মেসির নিজের কথাই সামনে এনে তারা বলেছে, সিদ্ধান্তটি এখনো তাঁর অন্তরে গভীরভাবে আঘাত করছে। তবে একই সঙ্গে মেসি বিশ্বাস করেন, সরে দাঁড়ানোর উপযুক্ত সময় এসে গেছে।
ফরাসি ফুটবলভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ফুট মের্কাটো’ মেসির অবসরকে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছে। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে মেসির দীর্ঘ অপেক্ষার গল্পও।
বেশ কয়েকটি বড় ফাইনালে তিক্ত হারের পর ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শিরোপার খরা কাটান মেসি। এরপর শুরু হয় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অধ্যায়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতে সেই স্বর্ণযাত্রাকে পূর্ণতা দেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনাকে আরও সাফল্য এনে দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে।
মেসির অবসর তাই কেবল একজন ফুটবলারের জাতীয় দল ছাড়ার খবর নয়। এটি আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি যুগের সমাপ্তি। যে খেলোয়াড়কে ঘিরে প্রায় দুই দশক ধরে জাতীয় দলের স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা ও সাফল্যের গল্প লেখা হয়েছে, সেই মেসি এবার থাকবেন মাঠের বাইরে।
তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার মুছে যাওয়ার নয়। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, অসংখ্য রেকর্ড আর কোটি মানুষের ভালোবাসা, সবকিছু মিলিয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
মেসি বিদায় নিলেন। কিন্তু তাঁর গল্পের শেষ নেই আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে তাঁর উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে আরও বহু প্রজন্ম।


