বোর্ডে ২১৫ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য। কোয়ালিফায়ারের মতো মহাচাপের ম্যাচে এই রান তাড়া করা যেকোনো দলের জন্যই দুঃস্বপ্ন। কিন্তু শুভমান গিলের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের সামনে সেই পাহাড়ও যেন ধুলোয় মিশে গেল! শুক্রবার (২৯ মে) নিউ চণ্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত আইপিএল ২০২৬-এর হাই-ভোল্টেজ দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে রাজস্থান রয়্যালসকে ৭ উইকেট ও ৮ বল হাতে রেখে উড়িয়ে দিয়েছে গুজরাট টাইটান্স। অধিনায়ক গিলের রাজকীয় সেঞ্চুরি এবং সাই সুদর্শনের অনবদ্য ফিফটিতে ভর করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল টাইটান্সরা। শিরোপার মহারণে তাদের প্রতিপক্ষ রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
৯ রানে ২ উইকেট হারানোর পর ১৫ বছরের বৈভবের তাণ্ডব
টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই চরম বিপদে পড়েছিল রাজস্থান রয়্যালস। ইনিংসের প্রথম ওভারেই যশস্বী জয়সওয়ালকে (১) ফেরান মোহাম্মদ সিরাজ। পরের ওভারে ধ্রুব জুরেলকে (৭) সাজঘরের পথ দেখান কাগিসো রাবাদা। মাত্র ৯ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বসা রাজস্থানকে টেনে তোলার দায়িত্ব নেন টুর্নামেন্টের নতুন বিস্ময় বালক, ১৫ বছর বয়সী কিশোর বৈভব সূর্যবংশী।
চতুর্থ উইকেটে রবীন্দ্র জাদেজাকে সঙ্গে নিয়ে ৭৩ রানের জুটি গড়েন বৈভব। জাদেজা ব্যক্তিগত ৪৫ রানে ‘রিটায়ার্ড হার্ট’ হয়ে মাঠ ছাড়লেও এক প্রান্ত আগলে রেখে গুজরাটের বোলারদের ওপর রীতিমতো তাণ্ডব চালান বৈভব। মাঝে রিয়ান পরাগ (১১), দাসুন শানাকা (৩) এবং জোফরা আর্চাররা (৭) দ্রুত বিদায় নিলে রাজস্থানের স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১১৮ রান।
সেঞ্চুরির ট্র্যাজেডি ও ডনোভানের ক্যামিও
সেখান থেকে আটে নামা ডনোভান ফেরেইরাকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ২৮ বলে ৫৪ রানের ঝড়ো জুটি গড়েন বৈভব। মাঠের চারদিকে ছক্কার বৃষ্টি নামিয়ে মাত্র ৪৭ বলে খেলেন ৯৬ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস, যেখানে ছিল ৮টি চার ও ৭টি বিশাল ছক্কা। কিন্তু ১৮তম ওভারে রাবাদাকে তুলে মারতে গিয়ে ডিপ থার্ডম্যান অঞ্চলে ক্যাচ দিয়ে বসেন তিনি। মাত্র ৪ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিসের হতাশায় পুড়তে হয় এই কিশোরকে।
এর আগের ম্যাচেও হায়দরাবাদের বিপক্ষে ৯৭ রানে আউট হয়েছিলেন তিনি। টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরিবঞ্চিত হলেও ১৬ ম্যাচে ৪৮.৫০ গড় এবং ২৩৭.৩০ স্ট্রাইকরেটে ৭৭৬ রান নিয়ে টুর্নামেন্টের ‘অরেঞ্জ ক্যাপ’ এখন বৈভবের মাথাতেই।
শেষ দিকে জাদেজা পুনরায় ব্যাটিংয়ে নেমে ৩৫ বলে ৪৫ রান এবং ডনোভান ফেরেইরা মাত্র ১১ বলে ২টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৩৮ রানের টর্নেডো ক্যামিও খেললে ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ২১৪ রানের বিশাল পুঁজি পায় রাজস্থান। গুজরাটের পক্ষে জেসন হোল্ডার ২৭ রানে ২টি এবং রাবাদা ৩৫ রানে ২টি উইকেট নেন।
গিল-সুদর্শনের ১৬৭ রানের টর্নেডো জুটি
২১৫ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে গুজরাটকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেন দুই ওপেনার শুভমান গিল ও সাই সুদর্শন। রাজস্থানের বিশ্বসেরা বোলিং লাইনআপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে মাত্র ১২.৫ ওভারেই এই জুটি স্কোরবোর্ডে যোগ করেন ১৬৭ রান! মূলত এই জুটির ওপর ভর করেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় রাজস্থান।
৩২ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় ৫৮ রান করে সুদর্শন যখন হিট উইকেট হয়ে মাঠ ছাড়েন, ততক্ষণে গুজরাটের জয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরপর জফরা আর্চারের বলে এলবিডব্লিউ হওয়ার আগে মাত্র ৫৩ বলে ১৫টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে ১০৪ রানের ম্যাচজয়ী এক রাজকীয় ইনিংস খেলেন অধিনায়ক শুভমান গিল।
গিল যখন বিদায় নেন, জয় তখন হাতের মুঠোয়। বাকি কাজটুকু সহজেই সারেন ওয়াশিংটন সুন্দর (৯ বলে ১৬), রাহুল তেওয়াতিয়া (৯ বলে ১৭) এবং অভিজ্ঞ জশ বাটলার। ১৮.৪ ওভারেই ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় গুজরাট।
ফাইনালে অরেঞ্জ ক্যাপের রোমাঞ্চকর লড়াই
এই ম্যাচের পর ফাইনালের পাশাপাশি অরেঞ্জ ক্যাপের লড়াইটাও জমে উঠেছে ক্ষুরধার। আপাতত ৭৭৬ রান নিয়ে শীর্ষে আছেন রাজস্থানের বৈভব সূর্যবংশী। তবে ফাইনাল ম্যাচে গুজরাট অধিনায়ক শুভমান গিল আর মাত্র ৫৫ রান করতে পারলেই বৈভবকে ছাড়িয়ে যাবেন (বর্তমানে তার রান ৭২২)। সুযোগ থাকছে গিলের ওপেনিং পার্টনার সাই সুদর্শনের সামনেও, সেজন্য ফাইনালে তাকে করতে হবে ৬৭ রান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
- রাজস্থান রয়্যালস: ২১৪/৬ (২০ ওভার); বৈভব ৯৬, জাদেজা ৪৫*, ফেরেইরা ৩৮। হোল্ডার ২/২৭, রাবাদা ২/৩৫।
- গুজরাট টাইটান্স: ২১৫/৩ (১৮.৪ ওভার); গিল ১০৪, সুদর্শন ৫৮, তেওয়াতিয়া ১৭*। আর্চার ১/৩৬।
- ফল: গুজরাট টাইটান্স ৭ উইকেটে জয়ী।
