আশঙ্কাটা আগেই ছিল। সে জন্য নেওয়া হয়েছিল বিশেষ প্রস্তুতি। তারপরও কাজ হলো না। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক দ্বৈরথ শেষ পর্যন্ত শুধু মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকল না। নব্বই মিনিটের উত্তেজনাপূর্ণ ফুটবল শেষে সেই আবেগ ছড়িয়ে পড়ল গ্যালারি, স্টেডিয়ামের বাইরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শহরের রাজপথেও। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হয়েছেন বহু মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে লাঠিচার্জের বদলে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করতে হয়েছে।
আটলান্টার স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালেই গ্যালারির পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও কটূক্তি। ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনা জোড়া গোল করে জয় নিশ্চিত করলে তাদের সমর্থকদের উল্লাস আরও বাড়ে। সেই উদযাপনকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের সমর্থকরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।
স্টেডিয়ামের নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে নেমে কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করে নিয়ে যায়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন সমর্থক আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ম্যাচ শেষেও থামেনি
স্টেডিয়ামের ভেতরের সেই উত্তেজনা বাইরে বেরিয়েও থামেনি। ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের আশপাশে আবারও দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে সহিংসতা শুধু ম্যাচ ভেন্যুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সিসহ কয়েকটি শহরেও আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এমনকি আটলান্টা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইংল্যান্ডের বার্মিংহ্যামেও দুই দেশের সমর্থকদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, এই ম্যাচের আবেগ ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ম্যাচ শুরুর আগেই উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলেছিল। ইংল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় আর্জেন্টিনার একাংশের সমর্থকরা উচ্চস্বরে চিৎকার করে পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলেন। গ্যালারিতে উপস্থিত ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যামকেও বিদ্রুপের মুখে পড়তে হয়। মাঠে খেলোয়াড়দের মধ্যেও কয়েকবার বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। সেই উত্তেজনাই ধীরে ধীরে গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে।
দুই দলের সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের আবেগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। গত ছয় দশক ধরে দুই দেশের ফুটবল লড়াই কেবল ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, জাতীয় আবেগেরও প্রতীক। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের পর এই বৈরিতা আরও গভীর হয়েছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ এই দ্বৈরথকে আরও কিংবদন্তির মর্যাদা দেয়। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এখনও দুই দেশের সমর্থকদের আবেগে প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে।
এবারের সেমিফাইনালেও সেই ইতিহাস নতুন করে সামনে এসেছে। আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও সমর্থকদের একাংশ মালভিনাস ইস্যুর প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সমর্থকেরাও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। ফলে ফুটবল ম্যাচটি কেবল বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনাল নয়, বরং ইতিহাস, জাতীয় গর্ব এবং দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি বিস্ফোরক অধ্যায়ে পরিণত হয়।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর সাধারণত ফুটবলপ্রেমীদের মিলনের উৎসব হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই বহুল আলোচিত দ্বৈরথ আবারও মনে করিয়ে দিল, কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো শুধুই খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাস, রাজনীতি ও আবেগের ভার বহন করে তা অনেক সময় মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে বাস্তবের সংঘর্ষেও রূপ নেয়।


