Home Blog Page 158

পর্তুগালকে বিদায় করে স্পেন শেষ আটে

বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেনের কাছে প্রি কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে হারের ফলে শেষ হয়ে গেল পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিযান। একই সঙ্গে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে অবসান হলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন উঠে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় ইনজুরি সময়ের প্রথম মিনিটে একমাত্র গোলটি করেন মিকেল মেরিনো।

কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন খেলবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়ে বেলজিয়াম পৌঁছেছে শেষ আটে। এর ফলে কোয়ার্টার ফাইনালের তিনটি লাইন আপ চূড়ান্ত হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালের একটিতে ফ্রান্স মোকাবেলা করবে মরক্কোকে। অন্য এক কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই প্রতিনিধি নরওয়ে ও ইংল্যান্ড। শেষ কোয়ার্টার ফাইনালের লাইন আপ চূড়ান্ত হবে আজ। সে ম্যাচের জন্য আজ রাতে আর্জেন্টিনা খেলবে মিসরের বিপক্ষে। অন্য এক ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া।

শেষ সময়ে গোল

স্পেন-পর্তুগাল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে পারে এমনটাই মনে হচ্ছিল। তবে শেষ মুহুর্তে স্টেডিয়ামে উপস্থিত পর্তুগালের সমর্থকদের স্তদ্ধ করে দেন মিকেল মেরিনো। তার গোলেই শেষ হয়ে যায় পর্তুগাল এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ মিশন। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতে না বাজতেই জলভরা চোখ নিয়ে মাঠ ছেড়ে যান পর্তুগীজ অধিনায়ক।

বল দখলের লড়াইয়ে রোনালদো

উভয় দল বেশ সতর্কতার সঙ্গে ম্যাচটি শুরু করে। একে অপরকে আটকে রাখার মিশন নিয়েছিল স্পেন ও পর্তুগাল। ফলে বল নিয়ে লামিন ইয়ামাল বারবার পেনাল্টি বক্সে ঢোকার চেষ্টা করেও সফল হননি। অন্যদিকে ব্রুনো ফার্নান্দেস ও রোনালদো ম্যাচে নিজেদের মেলে ধরার মতো জায়গা খুঁজে পাননি।

বদলি খেলোয়াড়ে সর্বনাশ পর্তুগালের

শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন দুই বদলি খেলোয়াড়। দ্রুত একটা ফ্রি কিক নেওয়ার সময় পর্তুগাল প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ঠিকমতো পাহারা দিতে পারেনি। সেই সুযোগে ফেরান তোরেস বক্সের কিনারায় বল পেয়ে যায়। প্রথম স্পর্শেই বলকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দারুণ এক পাস দেন মিকেল মেরিনোর উদ্দেশে। আর তাতেই পর্তুগালের সব শেষের শুরু। দৌড়ে বল নিয়ন্ত্রণে দারুণ ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন মেরিনো।

স্পেনের জাল অক্ষত

১-০ গোলে পাওয়া এ জয়ের মাঝ দিয়ে স্পেন তাদের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ফুটিয়ে তুলেছে। বিশ্বকাপে এখনো পর্যন্ত কোনো দল তাদের জালে বল ফেলতে পারেনি। গ্রুপ পর্বেও না, শেষ বত্রিশেও না। স্বাভাবিকভাবে স্পেনের রক্ষণভাগ এখন প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্য দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মেক্সিকোকে বিদায় করে ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে

মেক্সিকোকে বিদায় করে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় সোমবার সকালে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রি কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক মেক্সিকোকে তারা ৩-২ গোলে হারায়।। ইংল্যান্ডের হয়ে জুডে বেলিংহাম জোড়া গোল করেন। অন্য গোলটি করেন হ্যারি কেন। মেক্সিকোর হয়ে ব্যবধান কমান কুইনোনেস ও জিমিনেজ।

ইংল্যান্ডের এই জয়কে ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়ের একটি বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ওয়েম্বলির বাইরে অর্থাৎ দেশের বাইরে এমন উত্তেজনাপূর্ণ জয় খুব একটা দেখা যায়নি। অন্যদিকে কপাল পুড়ছে মেক্সিকোর। আজতেকা স্টেডিয়ামে এই নিয়ে ৯০ ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে মেক্সিকো। আজতেকা মানেই সাফল্য আর সাফল্য। সেখানে মাত্র তৃতীয় ম্যাচে হারলো তারা। আর তাতেই বিশ্বকাপে আবার স্বপ্নভঙ্গ তাদের।

এই হারের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পর বিশ্বকাপ ফুটবলের তৃতীয় আয়োজক মেক্সিকোও বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। অন্যদিকে জয়ের ফলে শিরোপা জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগুলো ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন দল। আগামী ১১ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে তারা নরওয়ের মুখোমুখি হবে। ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচের আগে নরওয়ে ২-১ গোলে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা নিশ্চিত করে।

গোলের পর যেন উড়ে আকাশ ছুঁতে চাইছেন

প্রি কোয়ার্টারে অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে রূপ নিয়েছিল ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচ। কোনো কিছুর অভাব ছিল না। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, লাল কার্ড, হলুদ কার্ড, পেনাল্টি-সব কিছু এই এক ম্যাচে। উভয় দল পেনাল্টি পেয়েছে। উভয় দলই পেনাল্টি সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে। তবে ইংল্যান্ডের পাওয়া লাল কার্ড নিয়ে বিতর্ক আসতেই পারে।

আক্রমণে প্রতি আক্রমণে ম্যাচটি বেশ জমে উঠেছিল। যার প্রমাণ মাত্র ছয় মিনিটে তিন গোল। প্রথমার্ধের শেষ সময়ের দিকে ছয় মিনিটের ব্যবধানে জুডে বেলিংহামের জোড়া গোলের সুবাদে ইংল্যান্ড ২-১ গোলে এগিয়ে বিরতিতে যায়। বেলিংহাম ৩৬ ও ৩৮ মিনিটে গোল করেন। ৪২ মিনিটে কুইনোনেস ব্যবধান কমান।

দ্বিতীয়ার্ধের বড় এক সময় ইংল্যান্ডকে একজন কম নিয়ে খেলতে হয়। ৫৪ মিনিটে জারেল কোয়ানসা বিধি বহির্ভূতভাবে খেলার অপরাধে লাল কার্ড দেখেন। তবে ছয় মিনিট পর এক পেনাল্টি ইংল্যান্ডকে স্বস্তি এনে দেয়। তা থেকে হ্যারি কেন গোল করে ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে এগিয়ে নেন। ৬৯ মিনিটে এক পেনাল্টি থেকে মেক্সিকো ব্যবধান কমায়। পরের সময়ে মেক্সিকো একাধিক চাপ তৈরি করলেও গোল আদায়ে ব্যর্থ হয়। সেই ব্যর্থতা বিশ্বকাপ থেকে তাদের বিদায় নিশ্চিত করে।

শুধু মাঠ নয় খাবার টেবিলেও হাল্যান্ড রীতিমতো একজন দানব!

রোজ ৬ হাজার ক্যালরি আর গরুর কলিজা-হৃৎপিণ্ড: মাঠ কাঁপানো হাল্যান্ডের ‘দানবীয়’ খাদ্যাভ্যাস

ফুটবল মাঠে বল পায়ে তাঁর গতি আর অতিমানবীয় শক্তি দেখলে মনে হতে পারে তিনি কোনো মানুষ নন, যেন এক নিখুঁত ‘রোবট’। আর এই কারণেই বিশ্ব ফুটবলে তাঁর ডাকনাম ‘সাইবর্গ’ বা ‘নরওয়েজিয়ান মেশিন’। তিনি আর কেউ নন, ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ের ২৫ বছর বয়সী গোলমেশিন আর্লিং ব্রাউট হাল্যান্ড। সম্প্রতি ফুটবলের এই মহাতারকা আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন, তবে এবার মাঠের কোনো গোলের জন্য নয়, বরং তাঁর অদ্ভুত এবং চেনা ছকের বাইরের খাদ্যাভ্যাসের (ডায়েট) কারণে।

আধুনিক স্পোর্টস নিউট্রিশন বা ক্রীড়া পুষ্টির চেনা ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই নরওয়েজিয়ান তারকা প্রতিদিন প্রায় ৬,০০০ ক্যালরি খাবার গ্রহণ করেন, যা একজন সাধারণ মানুষের দৈনিক প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ!

হাল্যান্ডের ‘বিস্ট ডায়েট’: পাস্তা-চিকেন নয়, প্লেটে থাকে গোরুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

বর্তমান যুগের অধিকাংশ ফুটবলার যখন মেপে মেপে সেদ্ধ চিকেন, পাস্তা কিংবা প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের ওপর ভরসা রাখেন, হাল্যান্ড সেখানে বেছে নিয়েছেন এক সম্পূর্ণ আদিম ও ভিন্ন পথ। তাঁর এই দানবীয় ডায়েটের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ হলো গোরুর হৃৎপিণ্ড (হার্ট) এবং যকৃৎ বা কলিজা (লিভার)।

হাল্যান্ডের দৈনিক খাদ্যতালিকায় যা যা থাকে:

  • অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাংস: গোরুর টাটকা হৃৎপিণ্ড ও যকৃৎ।
  • ভারী মাংস ও মাছ: বড় আকারের স্টেক, বিলাসবহুল টমাহক স্টেক এবং সি-বাস মাছ।
  • অন্যান্য খাবার: অ্যাসপারাগাস (এক ধরণের সবজি), এগ ফ্রাইড রাইস এবং কাঁচা মধু।
  • জাদুকরী পানীয়: প্রচুর পরিমাণে কাঁচা দুধ। এটিকে তিনি নিজের শক্তির অন্যতম উৎস মনে করেন এবং সকালে নাস্তার পাশাপাশি কফির সাথেও কাঁচা দুধ মিশিয়ে পান করেন।

প্রক্রিয়াজাত খাবারকে লাল কার্ড, খাঁটি মাংসে ভরসা

নিজের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নির্মিত ‘হাল্যান্ড: দ্য বিগ ডিসিশন’ নামক একটি তথ্যচিত্রে এই ফুটবলার তাঁর এই ব্যতিক্রমী দর্শনের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ফাস্টফুডের তীব্র সমালোচনা করে হাল্যান্ড বলেন:

“অনেকে হয়তো এসব (হৃৎপিণ্ড বা যকৃৎ) খান না, কিন্তু আমি আমার শরীরের সর্বোচ্চ যত্ন নিতে চাই। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া একদম খাঁটি ও উচ্চমানের খাবার খাওয়া। মানুষ ঢালাওভাবে বলে মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনি কোন মাংসটা খাচ্ছেন? ফাস্টফুডের দোকান থেকে কেনা প্রক্রিয়াজাত মাংস? নাকি আপনার চোখের সামনে সবুজ মাঠে ঘাস খেয়ে বড় হওয়া স্থানীয় গোরুর তাজা মাংস? আমি নিশ্চিতভাবেই পরেরটি বেছে নিই।”

ম্যাচ পরবর্তী কঠোর ‘রিকভারি’ রুটিন

শুধু খাওয়াদাওয়াই নয়, আধুনিক ফুটবলের তীব্র ধকল সামলে শরীরকে শতভাগ ফিট রাখতে হাল্যান্ডের রয়েছে অত্যন্ত কঠোর এবং বৈজ্ঞানিক এক রুটিন। মাঠের লড়াই শেষে দ্রুত চাঙ্গা হতে তিনি নিয়মিত যেসব থেরাপি নেন:

  • ক্রায়োথেরাপি ও আইস বাথ: পেশীর ক্লান্তি দূর করতে বরফশীতল পানিতে গোসল।
  • রেড-লাইট থেরাপি ও সনা: শরীরের কোষ সতেজ রাখতে বিশেষ লাইট থেরাপির ব্যবহার।
  • প্রাকৃতিক নিয়ম: একদম ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিয়ম করে শরীরে সূর্যের আলো লাগানো এবং দৈনিক ফিজিওথেরাপি।

খাদ্যতালিকায় এই আদিম ছোঁয়া আর আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ফিটনেস রুটিনের অদ্ভুত মিশ্রণই ২৫ বছরের এই তরুণকে করে তুলেছে সমসাময়িক ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও অপ্রতিরোধ্য স্ট্রাইকার।

সংশয় উড়িয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বজয়ের মুকুট পরালেন মলিনাক্স

0

অ্যালিসা হিলির মতো কিংবদন্তি অধিনায়কের জুতোয় পা গলানো সহজ কথা ছিল না। যখন তাঁর কাঁধে অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দলের নেতৃত্বের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল, ২৮ বছর বয়সী সোফি মলিনাক্স নিজেই নিশ্চিত ছিলেন না তিনি এই বড় দায়িত্বের চাপ সামলাতে পারবেন কিনা। কিন্তু লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের সামনে আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ট্রফি উঁচিয়ে ধরে মলিনাক্স প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল পাসই করেননি, বরং লেটার মার্কস নিয়ে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

টুর্নামেন্ট জুড়ে বল হাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১১টি) উইকেট শিকারী হয়েছেন তিনি। অথচ ইনজুরি আর চারপাশের নানামুখী সংশয় পেরিয়ে তাঁর এই বিশ্বজয়ের গল্পটা ছিল রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর।

ইনজুরির ধাক্কা ও চারপাশের সংশয়

২০২৬ সালের শুরুতে অ্যালিসা হিলি সব ফরম্যাট থেকে অবসরের ঘোষণা দিলে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মলিনাক্সকে। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই পিঠের ইনজুরিতে পড়েন এই অলরাউন্ডার। ফলে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ এবং এক মাস পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের বেশ কিছু ম্যাচ মিস করেন তিনি।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, প্রধান নির্বাচক শন ফ্লেগলার মলিনাক্সের অধিনায়কত্বের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছিল প্রবল সংশয়। কিন্তু সব সন্দেহ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মলিনাক্স মাঠে ফেরেন এবং দলকে বিশ্বসেরার মুকুটে অনুপ্রাণিত করেন।

সংশয় কাটিয়ে ওঠার তৃপ্তি নিয়ে ম্যাচ শেষে মলিনাক্স বলেন:

“সব সংশয় দূর করতে পারার অনুভূতি দারুণ। লর্ডসে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সামনে বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে মাঠ ছাড়ার দিনটি অবিশ্বাস্য রকমের বিশেষ। সত্য বলতে, শুরুতে অধিনায়কত্ব পেয়েই ইনজুরিতে পড়ায় সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। নিজের মনেও সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল যে, আদৌ এটি কাজ করবে কিনা। কিন্তু এই পথচলায় একটা জিনিস শিখেছি “সবসময় বিশ্বাস রাখতে হয়। আমি ভাগ্যবান যে দলের মানুষ আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, আর আমি এই দলটার ওপর সবকিছুর চেয়ে বেশি বিশ্বাস করি।”

ফাইনালে মলিনাক্সের অবদান এবং মুনির প্রশংসা

লর্ডসের ফাইনালে টস জিতে ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিলেন মলিনাক্স। ৪ ওভারে ৩২ রান দিয়ে ১ উইকেট নিলেও তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বে স্বাগতিকদের ১৫০ রানে আটকে রাখে অস্ট্রেলিয়া। পরে বেথ মুনির ৬4 এবং ফোবি লিচফিল্ডের ৪৮ রানের ওপর ভর করে ৭ উইকেটের সহজ জয় পায় অজিরা।

ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট সেরা হওয়া সতীর্থ বেথ মুনির ভূয়সী প্রশংসা করে অধিনায়ক বলেন: “মুনি (বেথ মুনি) অসাধারণ এক ক্রিকেটার। ও যেন ফাইনাল ম্যাচগুলোর জন্যই তৈরি হয়েছে। ও কতটা ধারাবাহিক, তা গত কয়েক মাসে ওর ব্যাটিং দেখলেই বোঝা যায়। ও একই সাথে স্বাধীনভাবে খেলে, আবার আমার দেখা সবচেয়ে বুদ্ধিমান ক্রিকেটারও বটে। দলের মেয়েরা ওর কথা মন দিয়ে শোনে। ও আমাদের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড, আর আজ উইকেটের পেছনে ওর কিপিং ছিল অন্য মাত্রার।”

ইনজুরি, সমালোচনা আর নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্বকে জয় করে সোফি মলিনাক্স যেভাবে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে ফিরিয়ে আনলেন, তা নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।

লর্ডসে ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে সপ্তমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া

0

ইংল্যান্ডকে তাদের ঘরের মাঠেই স্তব্ধ করে দিল অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দল। লর্ডসের ঐতিহাসিক ক্রিকেট গ্রাউন্ডে স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে ৭ উইকেটে হারিয়ে সপ্তমবারের মতো আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা নিজেদের করে নিল অজিরা। টানা দু’টি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে হারের বৃত্ত ভেঙে দুর্দান্তভাবে সিংহাসন ফিরে পেল অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করার রেকর্ড গড়ে ২০২৩ সালের পর আবারও বিশ্বজয়ের উল্লাসে মাতল তারা।

লর্ডসের গ্যালারিতে রেকর্ড ২৮,৮৮৭ জন দর্শকের উপস্থিতিতে টস জিতে ইংল্যান্ডকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানায় অস্ট্রেলিয়া। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৫০ রান তোলে স্বাগতিকরা। জবাবে ১৭.১ ওভারেই মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় অজি নারী দল।

সিভার-ব্রান্টের লড়াই সত্ত্বেও ইংল্যান্ডের মাঝারি সংগ্রহ

পপস্টার রিতা ওরার পারফরম্যান্সের পর লর্ডসের কানায় কানায় পূর্ণ গ্যালারিতে খেলতে নামে দুই দল। শুরুতে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। দলীয় স্কোরে মাত্র ৮ রান যোগ হতেই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ড্যানি ওয়াট-হজকে (৮) হারায় তারা। লুসি হ্যামিল্টন ও অ্যানাবেল সাদারল্যান্ডের তোপে ৭০ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকে ইংলিশরা।

সেখান থেকে দলের হাল ধরেন অধিনায়ক ন্যাট সিভার-ব্রান্ট। ফ্রেয়া কেম্পকে সাথে নিয়ে গড়েন অবিচ্ছিন্ন ৮০ রানের জুটি, যা বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সিভার-ব্রান্ট ৪৫ বলে খেলেন অপরাজিত ৫৮ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস। এই হাফ-সেঞ্চুরির মাধ্যমে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯টি ফিফটির রেকর্ড গড়েন তিনি। অন্যদিকে কেম্প ২৮ বলে ৪৪ রানে অপরাজিত থাকলে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৫০ রান।

মুনি-লিচফিল্ডের রেকর্ড জুটিতে চূর্ণ ইংল্যান্ডের স্বপ্ন

১৫১ রানের রেকর্ড লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ওপেনার জর্জিয়া ভলকে (৯) হারায় অস্ট্রেলিয়া। তবে সেই ধাক্কা টের পেতে দেননি বেথ মুনি এবং ফোবি লিচফিল্ড। পাওয়ার প্লে-তেই এই জুটি স্কোরবোর্ডে ৬২ রান তুলে ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

  • বেথ মুনির রেকর্ড ইনিংস: ৩৮ বলে নিজের অর্ধশতক পূরণ করেন মুনি। টুর্নামেন্টে এটি তাঁর তৃতীয় হাফ-সেঞ্চুরি, যার মাধ্যমে তিনি সিভার-ব্রান্টের সর্বোচ্চ ফিফটির রেকর্ডে ভাগ বসান। শেষ পর্যন্ত ৬৪ রান করে এলবিডব্লিউ (LBW) হয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।
  • লিচফিল্ডের ঝড়: মুনিকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে লিচফিল্ড খেলেন ৪৮ রানের এক আগ্রাসী ইনিংস। দ্বিতীয় উইকেটে এই দুজনের ১০০ রানের জুটিই অস্ট্রেলিয়ার জয় নিশ্চিত করে দেয়।

শেষের দিকে এলিস পেরি ও অ্যাশলেই গার্ডনার বাকি কাজটুকু অনায়াসেই সারেন। ম্যাচের ১৭.১ ওভারে ওয়াইডের মাধ্যমে জয়সূচক রানটি আসে এবং প্রায় ৩ ওভার বাকি থাকতেই শিরোপা নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়া।

ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার শতভাগ রেকর্ড

এই জয়ের ফলে বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রাখল অস্ট্রেলিয়া (দুই ফরম্যাট মিলিয়ে ৭টি ফাইনালের সবকটিতেই জয়)। অন্যদিকে, ২০০৯ সালের পর প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের খোঁজে থাকা ইংল্যান্ডকে আরও একবার রানার্স-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের স্বাদও এবারই প্রথম পেল ইংলিশরা। হোয়াইট বলের দুই সংস্করণের কোনো ট্রফি ছাড়া টুর্নামেন্ট শুরু করা অস্ট্রেলিয়া আবারও প্রমাণ করল—ক্রিকেট বিশ্বে তাদের আধিপত্য এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

  • ইংল্যান্ড: ২০ ওভারে ১৫০/৪ (ন্যাট সিভার-ব্রান্ট ৫৮*, ফ্রেয়া কেম্প ৪৪*; লুসি হ্যামিল্টন ১/১৯, কিম গার্থ ১/২০)
  • অস্ট্রেলিয়া: ১৭.১ ওভারে ১৫৩/৩ (বেথ মুনি ৬৪, ফোবি লিচফিল্ড ৪৮; সোফি একলস্টোন ১/২৪, চার্লি ডিন ১/২৮)
  • ফলাফল: অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে জয়ী ও চ্যাম্পিয়ন।

ব্রাজিলের ফুটবল কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

0

এই প্রশ্নটি এখন বিশ্বের কোটি কোটি সেলেসাও ভক্তের মনে। নেইমারের বিদায় এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হেরে নকআউটে আরও একবার ইউরোপীয় গেরোয় আটকে যাওয়ার পর ব্রাজিল ফুটবল এখন ইতিহাসের অন্যতম বড় ক্রান্তিকাল পার করছে।

তবে ফুটবলের ইতিহাস বলে, ব্রাজিলকে কখনোই চিরতরে ফুরিয়ে যাওয়া দল ভাবা ঠিক হবে না। কিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন এবং সঠিক পদক্ষেপ নিলে সাম্বার দেশ নিশ্চয়ই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। ব্রাজিল ফুটবলের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ও পথগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. নতুন প্রজন্মের ওপর ভরসা (ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগো যুগ)

নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক অবসর একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিল ফুটবলে প্রতিভার অভাব কখনো ছিল না। এখন সময় এসেছে তরুণদের কাঁধে দলের ব্যাটন তুলে দেওয়ার।

  • ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রদ্রিগো: রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপের শীর্ষ স্তরে খেলার অভিজ্ঞতা এই দুই তারকার রয়েছে। নেইমারের ছায়া থেকে বের হয়ে এখন তাদেরই দলের মূল নেতা হতে হবে।
  • এন্ড্রিক ও তরুণ প্রতিভা: এন্ড্রিকের মতো উদীয়মান ফুটবলারদের এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ করতে হবে, যারা ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের পরিপক্ক করে তুলতে পারবে।

২. ঘরোয়া ফুটবলের আধুনিকায়ন ও পরিকাঠামো বদল

ব্রাজিলের ফুটবলারদের ব্যক্তিগত প্রতিভা বিশ্বমানের, কিন্তু ইউরোপের দলগুলোর তুলনায় তাদের ঘরোয়া ফুটবল অবকাঠামো ও একাডেমি ব্যবস্থা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।

  • আধুনিক ফুটবল এখন অনেক বেশি ডেটা, স্পোর্টস সায়েন্স এবং ট্যাকটিকাল শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল। ব্রাজিলের তৃণমূল পর্যায় থেকে এই আধুনিক ফুটবল সংস্কৃতির সূচনা করতে হবে।

৩. কার্লো আনচেলত্তির কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা

নরওয়ের কাছে হারলেও কার্লো আনচেলত্তির মতো একজন বিশ্বসেরা ইউরোপীয় কোচ ড্রেসিংরুমে থাকা ব্রাজিলের জন্য বড় শক্তি।

  • ইউরোপের দলগুলোকে হারাতে হলে তাদের মতোই আধুনিক, সুশৃঙ্খল এবং শারীরিক শক্তির ফুটবল বুঝতে হবে। আনচেলত্তি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোগো বোনিতো’ (নান্দনিক ফুটবল) অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে ইউরোপীয় দলগুলোর ব্লকিং ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল ভাঙা যায়, সেই দীর্ঘমেয়াদী কৌশল তৈরি করতে পারবেন।

৪. মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা

২০০২ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে কোনো ইউরোপীয় দল সামনে আসলেই ব্রাজিল মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। এই ‘ইউরোপীয় জুজু’ কাটাতে ফুটবলারদের কৌশলগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসিক শক্তি ও স্নায়ু ধরে রাখার জন্য শীর্ষস্তরের মেন্টাল ট্রেইনার বা স্পোর্টস সাইকোলজিস্টদের সাহায্য নেওয়া জরুরি।

অতীতের শিক্ষা: ব্রাজিল সবসময় ফিরে আসে

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ব্রাজিল এর আগেও এমন কঠিন সময় পার করেছে। ১৯৭০ সালের পর ২৪ বছর তারা বিশ্বকাপ জেতেনি। এরপর ১৯৯৪ সালে তারা আবার বিশ্বজয় করে। ২০০২ সালের শিরোপার আগেও ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বড় ধাক্কা খেয়েছিল তারা।

ব্রাজিল ফুটবলের পুনরুত্থান রাতারাতি সম্ভব নয়। নেইমার-পরবর্তী যুগে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে সিবিএফ (CBF) যদি আনচেলত্তির ওপর আস্থা রেখে তরুণদের নিয়ে একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল দল গড়ে তুলতে পারে, তবে হেক্সার অধরা স্বপ্ন পূরণ করে ব্রাজিল ফুটবল অবশ্যই আবার বিশ্বের চূড়ায় ঘুরে দাঁড়াবে। সাম্বার ছন্দ সাময়িকভাবে থমকে গেছে, কিন্তু তা চিরতরে হারিয়ে যায়নি।

টিভিতে আজকের খেলা ৬ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে প্রথম ওয়ানডে আজ। বিশ্বকাপে রাতে মুখোমুখি পর্তুগাল ও স্পেন। আগামীকাল সকালে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বেলজিয়াম।

বিশ্বকাপ ফুটবল: শেষ ১৬
মেক্সিকো-ইংল্যান্ড
সকাল ৬টা, বিটিভি, টি স্পোর্টস ও সময়

পর্তুগাল-স্পেন
রাত ১টা, বিটিভি, টি স্পোর্টস ও সময়

যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম
আগামীকাল সকাল ৬টা, বিটিভি, টি স্পোর্টস ও সময়

ক্রিকেট
১ম ওয়ানডে
বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে
বেলা ১-৩০ মি., নাগরিক ও টি স্পোর্টস

টেনিস
উইম্বলডন
৪র্থ রাউন্ড
বিকেল ৪টা, স্টার স্পোর্টস সিলেক্ট ১ ও ২

নক আউট পর্বে ইউরোপীয় দলের সামনে অসহায় ব্রাজিল!

ফুটবলের রাজপুত্র, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, জোগো বোনিতো বা সাম্বা ফুটবলের দেশ, ব্রাজিলকে চেনার জন্য এই বিশেষণগুলোই যথেষ্ট। কিন্তু বিগত ২৪ বছর ধরে এই ফুটবল পরাশক্তির নামের পাশে যুক্ত হয়েছে এক নির্মম ও অমীমাংসিত সমীকরণ, যার নাম ‘ইউরোপীয় জুজু’। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো ইউরোপীয় দলকে পেলেই যেন খেই হারিয়ে ফেলছে সেলেসাওরা। ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের আকস্মিক বিদায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি লাতিন আমেরিকার এই দলটির দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক অন্তহীন পরাজয়ের বৃত্তের ধারাবাহিকতা মাত্র।

২০০২ সালের পর থমকে যাওয়া ইতিহাস

২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারিয়ে সর্বশেষ পঞ্চমবারের মতো শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল ব্রাজিল। এরপর থেকে গত ছয়টি বিশ্বকাপে ইউরোপের বাধা পেরোতে পারলেই যেন ব্রাজিলের বিশ্বজয় নিশ্চিত হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবারই নকআউট পর্বে কোনো না কোনো ইউরোপীয় শক্তির সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে তাদের হেক্সা স্বপ্ন।

নকআউট পর্বে ইউরোপের কাছে ব্রাজিলের ব্যর্থতার খতিয়ান:

২০০৬ (কোয়ার্টার ফাইনাল): জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হার।

২০১০ (কোয়ার্টার ফাইনাল): স্নাইডার-রোবেনদের নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে বিদায়।

২০১৪ (সেমিফাইনাল): ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক বিপর্যয়।

২০১৮ (কোয়ার্টার ফাইনাল): বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের কাছে ২-১ গোলে পরাজয়।

২০২২ (কোয়ার্টার ফাইনাল): পেনাল্টি শুটআউটে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায়।

২০২৬ (শেষ ১৬): আর্লিং হাল্যান্ডের নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে স্তব্ধ ব্রাজিল।

আনচেলত্তি এনেও কাটেনি অভিশাপ

ইউরোপের দলগুলোর বিপক্ষে এই মানসিক ও কৌশলগত বাধা কাটাতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন (CBF) প্রথা ভেঙে দলে এনেছিল ইউরোপেরই অন্যতম সেরা ট্যাকটিশিয়ান ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ইউরোপীয় দলগুলোর আধুনিক ও শারীরিক ফুটবল কৌশলের জবাব দেওয়া। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে নরওয়ের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স এবং আর্লিং হাল্যান্ডের ক্ষিপ্রতার সামনে আনচেলত্তির ‘মাস্টারক্লাস’ও মুখ থুবড়ে পড়ল।

কেন এই ব্যর্থতার বৃত্ত?

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি প্রধান কারণ:

১. কৌশলগত অতি-নির্ভরশীলতা ও অনমনীয়তা: লাতিন আমেরিকার দলগুলো সাধারণত একক দক্ষতা ও নান্দনিক ফুটবলের ওপর জোর দেয়। বিপরীতে, ইউরোপীয় দলগুলো অনেক বেশি কৌশলগত, সুশৃঙ্খল এবং দলগত ব্লক তৈরিতে পারদর্শী। নরওয়ের বিপক্ষে প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিসের পর ব্রাজিল যেভাবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তা তাদের মানসিক ভঙ্গুরতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
২. শারীরিক ও গতিশীল ফুটবল: বর্তমান ইউরোপীয় ফুটবল অত্যন্ত গতিময় ও শারীরিক শক্তি-নির্ভর। নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্তোফার আয়ের কিংবা স্ট্রাইকার আর্লিং হাল্যান্ডের মতো দীর্ঘদেহী ও শক্তিশালী খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ম্যাচে শারীরিক লড়াইয়ে বারবার পরাস্ত হয়েছে ব্রাজিলের রক্ষণ ও আক্রমণভাগ।
৩. মনস্তাত্ত্বিক চাপ: বছরের পর বছর ধরে ইউরোপীয় দলের কাছে নকআউটে হেরে যাওয়ার ফলে ব্রাজিলের ফুটবলারদের মনে এক ধরণের অবচেতন ভীতি বা ‘সাইকোলজিক্যাল ব্লক’ তৈরি হয়েছে। যার ফলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে (যেমন নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ১০ মিনিটে) স্নায়ু ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা।

নেইমার যুগের বিষাদময় সমাপ্তি

ইউরোপের কাছে ব্রাজিলের এই পরাজয়ের বৃত্তের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক হিরো হয়ে রইলেন নেইমার জুনিয়র। ২০১০ সালে অভিষেকের পর থেকে ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং সবশেষ ২০২৬ টানা চারটি বিশ্বকাপে তিনি বুক চিতিয়ে লড়েছেন। পেলেকে টপকে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই ইউরোপীয় প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে তাঁর চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছে। অবশেষে নরওয়ের কাছে হেরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর অবসরের ঘোষণা এই দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল।

ইউরোপের দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের এই ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙা না পর্যন্ত ‘হেক্সা’ ট্রফি ব্রাজিলের জন্য কেবলই এক অধরা স্বপ্ন হয়ে থাকবে। আনচেলত্তির বিদায় কিংবা নেইমারের প্রস্থান; ব্রাজিল ফুটবলের এই ক্রান্তিলগ্নে এখন প্রয়োজন এক আমূল পরিবর্তনের, যা তাদের আবার বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

এক যুগের বর্ণিল অধ্যায়ের অবসান: আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন নেইমার

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের পরাজয়টি কেবল ব্রাজিলের হেক্সা মিশনই গুঁড়িয়ে দেয়নি, একই সাথে অবসান ঘটাল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক সোনালী অধ্যায়ের। ম্যাচ শেষের কয়েক ঘণ্টার মাথায় চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের অবসরের ঘোষণা দিলেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সেলেসাওদের আক্রমণভাগের ব্যাটন নিজের কাঁধে বয়ে বেড়ানোর পর অবশেষে আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ‘আলবিদা’ বললেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

চোখের জলে বিদায়ের ঘোষণা

ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে নেইমার জানান, জাতীয় দলের জার্সিতে এটিই ছিল তাঁর শেষ ম্যাচ। অবসরের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন,

“ব্রাজিলের জার্সি গায়ে জড়ানো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয় ছিল। আমি সবসময় দেশের জন্য আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি। কিন্তু শরীর এবং মন বলছে, এটাই থেমে যাওয়ার সঠিক সময়। আমি চেয়েছিলাম ব্রাজিলের মাথায় ষষ্ঠ নক্ষত্রটি (হেক্সা ট্রফি) যুক্ত করে বিদায় নিতে, কিন্তু নিয়তি আজ আমাদের পক্ষে ছিল না।”

বিদায়বেলায় আক্ষেপ আর অপূর্ণতার হেক্সা স্বপ্ন

২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। এরপর থেকে বহু জয় ও ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছেন তিনি। পেলেকে টপকে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেও, একটি বিশ্বকাপ ট্রফি না পাওয়ার আক্ষেপ সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়াবে এই তারকাকে।

বিদায়ী বার্তায় নেইমার আরও যোগ করেন, “বিশ্বকাপ জয় আমার শৈশবের স্বপ্ন ছিল। আমরা খুব কাছে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হয়েছি। আজ নরওয়ের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল করেও দলকে জেতাতে পারিনি, এই আক্ষেপ হয়তো কোনোদিন মুছবে না। তবে আমি নিশ্চিত, এই তরুণ দল একদিন ব্রাজিলের সেই অধরা স্বপ্ন পূরণ করবে।”

এক নজরে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

  • অভিষেক: ২০১০ (যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে)
  • প্রধান শিরোপা: ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ, ২০১৬ রিও অলিম্পিক (স্বর্ণপদক)
  • রেকর্ড: কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে ব্রাজিলের পুরুষ ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

ফুটবল বিশ্বে শোকের ছায়া

নেইমারের অবসরের ঘোষণার পরপরই ফুটবল বিশ্বে নেমে এসেছে স্তব্ধতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতীর্থ থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্বের নামী-দামী তারকারা তাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কোচ কার্লো আনচেলত্তি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “নেইমার কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি একজন জাদুকর। তার মতো প্রতিভাকে ড্রেসিংরুমে পাওয়া যেকোনো কোচের জন্যই সৌভাগ্যের। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তাকে আজীবন মিস করবে।”

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ইউরোপের দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের যে নকআউট জুজু, তার শিকার হয়েই শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়তে হলো এই ফুটবল জাদুকরকে। সাম্বার ছন্দ আর চেনা ১০ নম্বর জার্সির সেই চপলতা আর দেখা যাবে না আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবুজ গালিচায়।

নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের হার নিয়ে যা বললেন আনচেলত্তি!

জাপানের বিপক্ষে যে রণকৌশল কাজ করেছিল, নরওয়ের রক্ষণভাগের ইস্পাতকঠিন দেয়ালের সামনে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ম্যাচ শেষে বিষণ্ণ ও হতাশ ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি অকপটে স্বীকার করে নিলেন, নিজেরা সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মনোযোগ হারানোর কারণেই আজ তাদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ব্রাজিল বস নিজের অনুভূতি ও হারের কারণগুলো ব্যাখ্যা করেন।

প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে

ম্যাচের প্রথমার্ধে ব্রুনো গুইমারেসের পেনাল্টি মিস করাটাকেই পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আনচেলত্তি। তিনি বলেন,

“ফুটবলে যখন আপনি সুযোগ পাবেন, তখন আপনাকে তা লুফে নিতে হবে। প্রথমার্ধে আমরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলাম, পেনাল্টিও পেয়েছিলাম। সেই মুহূর্তে গোলটি পেয়ে গেলে ম্যাচের চিত্রনাট্য অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু আমরা সেই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছি এবং এর খেসারত আমাদের দিতে হয়েছে।”

হাল্যান্ডের বিশ্বমানের পারফরম্যান্স ও রক্ষণভাগের ভুল

নরওয়ের জয়ের নায়ক আর্লিং হাল্যান্ডের জোড়া গোল এবং ব্রাজিলের ডিফেন্সের দুর্বলতা নিয়ে আনচেলত্তি বলেন,
“আমরা জানতাম হাল্যান্ড কতটা বিপজ্জনক। তাকে আটকানোর জন্য আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। প্রথমার্ধে আমরা তাকে বোতলবন্দী রাখতে পেরেছিলাম। কিন্তু ৭৯ মিনিটে ডিফেন্সের ছোট্ট একটু অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ও (হাল্যান্ড) অসাধারণ এক হেডে গোল করে গেল। ও একজন বিশ্বমানের স্ট্রাইকার, তাকে এক মুহূর্তের জন্য ছাড় দিলেও ও শাস্তি দেবে। দ্বিতীয় গোলটির সময় আমরা সমতায় ফেরার জন্য অল-আউট আক্রমণে গিয়েছিলাম, যার ফলে কাউন্টার অ্যাটাকে ডিফেন্স ফাঁকা হয়ে যায়।”

নরওয়ে জুজু ও কৌশলগত ব্যর্থতা

ব্রাজিল কেন নরওয়েকে হারাতে পারে না, এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ কাজ করেছিল কিনা, এমন প্রশ্নে আনচেলত্তি বলেন,
“ইতিহাস বা অতীত রেকর্ড নিয়ে আমরা ভাবিনি। তবে নরওয়ে কৌশলগতভাবে খুব গোছানো ফুটবল খেলেছে। ওরা প্রথমার্ধে রক্ষণভাগ সামলে রেখে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছে। আমরা বল পজেশনে এগিয়ে থাকলেও ওদের ফাইনাল থার্ডে ভাঙতে পারিনি। এটি আমাদের কৌশলগত ব্যর্থতা এবং এর দায় আমার।”

নেইমারের গোল এবং দেরিতে জেগে ওঠা

ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নেইমারের পেনাল্টি থেকে পাওয়া গোল নিয়ে কোচ বলেন, “নেইমার গোল করেছে, কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচ আমাদের হাত থেকে ফসকে গেছে। অতিরিক্ত সময়ে গোল করে এই স্তরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। আমরা আজ বড্ড দেরিতে জেগে উঠেছি।”

ব্রাজিলের কোটি ভক্তের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

হেক্সা মিশনের এই করুণ সমাপ্তিতে ব্রাজিলের কোটি ভক্তের আবেগের কথা স্মরণ করে আনচেলত্তি বলেন,
“আমি জানি এই হার পুরো ব্রাজিলের জন্য কতটা বেদনার। সমর্থকেরা দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে ষষ্ঠ ট্রফির অপেক্ষা করছেন। আমরা তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি, এজন্য আমি দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। এই দলে অনেক তরুণ প্রতিভা আছে, এই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্রাজিল নিশ্চয়ই আবার ঘুরে দাঁড়াবে।”

কার্লো আনচেলত্তির এই প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দেয় যে, মাঠের পারফরম্যান্সের অভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে স্নায়ু ধরে রাখতে না পারার কারণেই আরও একবার ট্র্যাজিক হিরো হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।