বিশ্বকাপ ২০২৬ থেকে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিদায়ের পর দেশটির ফুটবলের ভেতরের এক অন্ধকার দিক আবার সামনে চলে এসেছে। নকআউট পর্বে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো ডাই মানশাফটরা। তবে এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার পর দলের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের চেয়ে, জার্মানির ফুটবল সংস্কৃতির এক চেনা রূপ আবার দেখা যাচ্ছে, আর তা হলো ‘বলির পাঁঠা’ খোঁজা।
আট বছর আগে যার শিকার হয়েছিলেন মেসুত ওজিল, এবার সেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কুর্দিশ ও ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত স্ট্রাইকার ডেনিজ উন্দাভকে।
ওজিল থেকে উন্দাভ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
জার্মান ফুটবলে হারের পর কোনো নির্দিষ্ট অভিবাসী বা সংখ্যালঘু ব্যাকগ্রাউন্ডের খেলোয়াড়কে এককভাবে দায়ী করার প্রবণতা নতুন নয়।
২০১৮ সালের মেসুত ওজিল বিতর্ক:
আট বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে জার্মানি গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলে ডানপন্থী গণমাধ্যম এবং রাজনীতিবিদরা তুর্কি বংশোদ্ভূত মেসুত ওজিল এবং ইলকায় গুন্দোয়ানকে লক্ষ্যবস্তু বানান। টুর্নামেন্টের আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার কারণে ওজিলকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত জার্মান ফুটবল ফেডারেশন, ডিএফব’র তৎকালীন সভাপতি রেইনহার্ড গ্রিন্ডেলের অযোগ্যতা ঢাকার জন্য তাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে, এই অভিযোগ এনে মাত্র ২৯ বছর বয়সে ওজিল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন।

২০২৬ সালের ডেনিজ উন্দাভ বিতর্ক:
এবার প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার পর জার্মানির সদ্য পদত্যাগী কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকারে সরাসরি ডেনিজ উন্দাভকে কাঠগড়ায় তোলেন। ম্যাচের শুরুতে গোল করার একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করায় তিনি উন্দাভকে দায়ী করে বলেন, একটি সহজ পাসের মাধ্যমে গোল করা যেত, কিন্তু উন্দাভ বলটি দূরের পোস্টে পাঠিয়ে দেন।

কোচের পক্ষপাতিত্ব বনাম উন্দাভের অবদান
মজার বিষয় হলো, জার্মান সমর্থকরা এবার কোচের এই ফাঁদে পা দেননি। তারা উল্টো নাগেলসম্যানের ভুল কৌশল এবং দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উন্দাভের সঙ্গে নাগেলসম্যানের সম্পর্ক আগে থেকেই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল:
গত মার্চ মাসে ঘানার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জয়সূচক গোল করার পরও উন্দাভের ফিটনেস ও লিংক-আপ প্লে নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন নাগেলসম্যান, যার জন্য পরে তাকে ক্ষমাও চাইতে হয়।
অথচ এই বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্বে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ৭ মিনিটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান এবং পরে জয়সূচক গোলও করেন উন্দাভ। প্রথম দুই ম্যাচে উন্দাভের অবদান না থাকলে জার্মানি হয়তো গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে যেত।
মূল সমস্যা যেখানে: জার্মানির ফুটবল কাঠামো ও গোঁড়ামি
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির বর্তমান সংকটের আসল কারণ কোনো খেলোয়াড় নয়, বরং তাদের কাঠামোগত গোঁড়ামি।
‘ল্যাপটপ ট্রেইনার’ বনাম মাঠের ফুটবল: নাগেলসম্যান কখনো পেশাদার ফুটবল খেলেননি। ডেটা এবং পরিসংখ্যানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে তাকে ‘ল্যাপটপ ট্রেইনার’ বলা হয়। তার অতিরিক্ত কাটাছেঁড়া এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে দূরত্বের কারণেই জার্মানি তাদের চেনা ছন্দ হারিয়েছে।
ঐতিহাসিক পেনাল্টি রেকর্ড ভাঙন: বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানি এর আগে কখনো পেনাল্টি শুটআউটে হারেনি (১৮টি শটের মধ্যে মাত্র ১টি মিস ছিল)। কিন্তু এবার প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে তারা ৩-৩ বার পেনাল্টি মিস করে মানসিক চাপের কাছে ভেঙে পড়ে।
| সাল | বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স | দলের প্রধান সমস্যা / ঘটনা |
| ২০১৪ | চ্যাম্পিয়ন | দীর্ঘমেয়াদি একাডেমি প্ল্যান এবং মাঠের সঠিক নেতৃত্ব। |
| ২০১৮ | গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় | মেসুত ওজিলকে বলির পাঁঠা বানানো এবং বর্ণবাদের অভিযোগ। |
| ২০২৬ | শেষ ৩২ থেকে বিদায় | প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হার; কোচ নাগেলসম্যান কর্তৃক ডেনিজ উন্দাভকে দোষারোপ। |
উন্দাভের লড়াই এবং ডিএফবি-র শিক্ষা
ডেনিজ উন্দাভ কোনো নামী একাডেমি থেকে উঠে আসেননি। একসময় ফ্যাক্টরিতে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করা উন্দাভ জার্মানির তৃতীয় ও চতুর্থ সারির লিগে ১০৪টি গোল করার পরও বুন্দেসলিগার কোনো ক্লাবের নজর পাননি। পরে বেলজিয়াম এবং ব্রাইটন হয়ে নিজের যোগ্যতায় তাকে জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে হয়েছে।
চলতি বছর উন্দাভের বয়স ৩০ বছর পূর্ণ হবে। পরবর্তী বিশ্বকাপে হয়তো তাকে আর দেখা যাবে না। তবে জার্মানি যদি সত্যিই ভবিষ্যতে আবারও বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করতে চায়, তবে খেলোয়াড়দের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে রাজনীতি বা বলির পাঁঠা খোঁজার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কেন উন্দাভের মতো প্রতিভারা ১৭ বছর বয়সের পরিবর্তে ২৭ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক পান, সেই কাঠামোগত ত্রুটি খুঁজে বের করাই এখন জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কাজ হওয়া উচিত বলে আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩
















