বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব: বাংলাদেশ ও এশিয়ার বাজারে নতুন নাটকীয়তা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'স্প্রিংবক প্রাইভেট

ছবি : এআই দিয়ে তৈরি করা।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড’ বাংলাদেশের জন্য কেনা ফিফা মিডিয়া স্বত্বটি ফিরিয়ে দেওয়ায়, এখন নতুন করে সরাসরি ফিফার সাথে দরকষাকষির সুযোগ তৈরি হয়েছে দেশীয় ব্রডকাস্টারদের। এর ফলে আগের চেয়ে অনেক কম খরচে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের অধিকার পাওয়ার পথ সুগম হলো।

গত মার্চ মাসে প্রায় ৭.২১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৮ কোটি টাকা) ফিফার সাথে এই চুক্তিটি চূড়ান্ত করেছিল স্প্রিংবক। কিন্তু সোমবার এক বিবৃতিতে স্প্রিংবকের প্রধান নির্বাহী (সিইও) গোপাল পাদিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন,

“হ্যাঁ, খবরটি সত্যি। বাংলাদেশে এই স্বত্ব বিক্রি করতে না পারায় আমি তা ফিফার কাছে সমর্পণ করেছি।”

কেন বাতিল হলো স্প্রিংবকের চুক্তি?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু ক্রেতা সংকটের কারণেই নয়, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় এই চুক্তি বাতিল হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের ২০ দিনের মধ্যে মোট অর্থের ৩০ শতাংশ, ১০ এপ্রিলের মধ্যে ৩০ শতাংশ, ১০ মে’র মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ৩১ মে’র মধ্যে বাকি ২০ শতাংশ পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু অন্তত তিনটি কিস্তির টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় গত সপ্তাহে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি বাতিল করে।

এর আগে স্প্রিংবক গ্রুপটি বাংলাদেশের সরকারী টেলিভিশন চ্যানেল ‘বিটিভি’র কাছে টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল এবং ইন্টারনেট স্বত্বসহ পুরো প্যাকেজের জন্য কর ও ভ্যাট ছাড়া ১২.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১৫০.৯৮ কোটি টাকা) দাবি করেছিল, যা বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

নতুন লড়াইয়ে কারা?

স্প্রিংবকের বিদায়ের পর এখন সরাসরি ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কেনার দৌড়ে এগিয়ে এসেছে দুটি পক্ষ:

কমছে বিশ্বকাপের দাম, বিটিভি কি খেলা দেখাতে পারবে?

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফিফা তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং দাম কমাতে রাজি হয়েছে।

ফিফা শুরুতে ৭ মিলিয়ন ডলার দাবি করলেও বর্তমানে অন্তত ৫ মিলিয়ন ডলার বা তার কিছু বেশি আশা করছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান,

“ভারত ও চীনের বাজারে দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখলে বাংলাদেশের জন্য এই স্বত্ব ২ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলার হওয়া উচিত। এমনকি এই দামেও লাভ করা নিশ্চিত নয়। তাই বিটিভি-কে বিনামূল্যে ফিড (সম্প্রচার লিংক) দেওয়া সম্ভব হবে না। আমরা স্বত্ব পেলে বিটিভি যদি অর্থ দিতে রাজি হয়, তবেই তারা ফিড পাবে।”

জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কথা বলে বিনামূল্যে ফিড দেওয়ার জন্য ফিফার সাথে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু ফিফা সেই অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফিফার যুক্তি, এই স্বত্ব বিক্রি থেকে অর্জিত কোটি কোটি ডলার তারা প্রতিবছর স্থানীয় ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) উন্নয়নে অনুদান হিসেবে দেয়, তাই এটি বিনামূল্যে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিটিভি-র মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমার কাছে এখনও চূড়ান্ত কোনো তথ্য নেই। আশা করছি আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”

এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চিত্র

শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারত ও চীনের মতো বিশাল বাজারেও ২০২৬ বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে অতি সম্প্রতি চীন এই সংকটের সমাধান করেছে। ফিফা ইতিমধ্যেই ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ’ (CMG)-এর সাথে ২০২৬ ও ২০৩০ পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ ও ২০৩১ নারী বিশ্বকাপের সম্প্রচার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে, ভারতেও ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

আগামী ১২ জুন থেকে মাঠে গড়াতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। ১০৪ ম্যাচের এই ফুটবল মহাযজ্ঞের পর্দা নামবে ২০ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, শেষ পর্যন্ত দেশের পর্দায় এই খেলা দেখার জট কবে এবং কীভাবে খোলে।

Exit mobile version