বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ’। আর এই আসরে যে ফুটবলার সবচেয়ে বেশি গোল করেন, তার হাতে ওঠে সম্মানজনক ‘গোল্ডেন বুট’ পুরস্কার। অতীতে জার্মানির ঘরোয়া ফুটবল লিগ বুন্দেসলিগার কিংবদন্তি তারকা গার্ড ম্যুলার, মিরোস্লাভ ক্লোসা এবং টমাস ম্যুলার এই গৌরব অর্জন করেছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখেও উঠে এসেছে কিছু নাম। যাদের হাতে উঠতে পারে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। হ্যারি কেইন, দেনিজ উন্দাভ কিংবা বুন্দেসলিগার অন্য কোনো ফরোয়ার্ড সেই কিংবদন্তিদের পথ অনুসরণ করতে পারবেন?
চলুন দেখে নেওয়া যাক ২০২৬ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা বুন্দেসলিগার প্রধান তারকাদের তালিকা ও তাদের সম্ভাবনা:
১. হ্যারি কেইন (ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ। দেশ: ইংল্যান্ড)

বুন্দেসলিগার আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে গোল্ডেন বুট জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার হ্যারি কেইন। এর সবচেয়ে বড় কারণ, তিনি এর আগেও এই পুরস্কার জিতেছেন। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ৬টি গোল করে শীর্ষ গোলদাতা হয়েছিলেন এই ইংলিশ অধিনায়ক। উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে যদি তিনি তার ঘরোয়া ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার গোল্ডেন বুট জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়বেন।
কেইন সদ্য সমাপ্ত ঘরোয়া মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৩১ বুন্দেসলিগা ম্যাচে ৩৬টি গোল করে ‘ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু’ জিতেছেন। তার দল জিতেছে ৩৪তম লিগ শিরোপা। এছাড়াও কাপ ফাইনালে ভিএফবি স্টুটগার্টের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে দলকে ডাবল ট্রফি জিতিয়েছেন। বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এল’ এ ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া, ঘানা এবং পানামার রক্ষণভাগকে কেইনকে থামাতে বেশ বেগ পেতে হবে।
২. দেনিজ উন্দাভ (ক্লাব: ভিএফবি স্টুটগার্ট। দেশ: জার্মানি)

২৯ বছর বয়সী উন্দাভের এটিই প্রথম বিশ্বকাপ। তবে ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থেকেই তিনি এই টুর্নামেন্টে যাচ্ছেন। সদ্য সমাপ্ত বুন্দেসলিগা মৌসুমে কেইনের পেছনে থেকে ১৯ গোল করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি, যা তার ক্যারিয়ারের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ। এই দুর্দান্ত ফর্মের কারণে হুলিয়ান নাগেলসম্যানের ২৬ সদস্যের জার্মানি দলে ডাক পেয়েছেন তিনি।
জার্মানির ফর্মেশনে একমাত্র স্ট্রাইকার পজিশনে খেলার জন্য কাই হাভার্টজ বা নিক ভোল্টমেডের মতো তারকাদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হবে উন্দাভকে। তবে উন্দাভ এমন একজন ফিনিশার যিনি যেকোনো পরিস্থিতি থেকে গোল বের করতে পারেন, যার প্রমাণ তিনি গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করে দিয়েছিলেন।
৩. পাত্রিক শিক (ক্লাব: বায়ার লেভারকুজেন। দেশ: চেকিয়া)

২০২৫/২৬ বুন্দেসলিগা মৌসুমের শুরুতে ছন্দে না থাকলেও, মৌসুমের শেষভাগে দুর্দান্তভাবে ফর্মে ফেরেন পাত্রিক শিক। শেষ পর্যন্ত ১৬টি গোল করে তিনি লেভারকুজেনকে উয়েফা ইউরোপা লিগে জায়গা করে নিতে সাহায্য করেন।
আন্তর্জাতিক বড় মঞ্চে গোল করার দারুণ অভিজ্ঞতা আছে শিকের। ইউরো ২০২০-এ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি (স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার দূরপাল্লার লবটি টুর্নামেন্টের সেরা গোল হয়েছিল)। চেকিয়াকে ২০২৬ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করাতে তিনি মূল ভূমিকা রাখেন, যেখানে প্লে-অফে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি (একটি নির্ধারিত সময়ে, অন্যটি টাইব্রেকারে) গোল করেন তিনি।
৪. লুইস দিয়াজ (ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ। দেশ: কলম্বিয়া)
২০২৫/২৬ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগায় নিজের অভিষেক মৌসুমেই বাজিমাত করেছেন দিয়াজ। বায়ার্নের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে তিনি ১৫টি গোল এবং ১৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন। পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে ওঠাতেও বড় অবদান রাখেন।
কলম্বিয়ার হয়ে ২১টি আন্তর্জাতিক গোল করা এই উইঙ্গার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৪টি গোল করেছেন। কাতার বিশ্বকাপে কলম্বিয়া সুযোগ না পাওয়ায় এটিই দিয়াজের প্রথম বিশ্বকাপ। তবে মেক্সিকো সিটি এবং গুয়াদালাহারায় পর্তুগাল, উজবেকিস্তান এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ থাকায় এই গতিময় ফরোয়ার্ড গোল্ডেন বুটের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’ বা চমক হতে পারেন।
৫. মাইকেল অলিস (ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ। দেশ: ফ্রান্স)
বায়ার্নের ডাবল জয়ী দলের অন্যতম সেরা কারিগর অলিস গত মৌসুমে ১৫টি বুন্দেসলিগা গোল করার পাশাপাশি লিগে সর্বোচ্চ ১৯টি অ্যাসিস্ট করেছেন। এই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের কারণে তিনি বুন্দেসলিগার ‘প্লেয়ার অব অব দ্য সিজন’ নির্বাচিত হন।
ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ১৫টি ম্যাচ খেললেও দ্রুতই দিদিয়ের দেশামের বিশ্বস্ত খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন তিনি। সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের প্রথম ম্যাচে তার খেলার সম্ভাবনা প্রবল। প্রথাগত স্ট্রাইকার না হলেও তার গতি, ড্রিবলিং এবং যেকোনো কোণ থেকে নিখুঁত শট নেওয়ার ক্ষমতা তাকে গোল্ডেন বুটের অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
৬. আন্দ্রে ক্রামারিচ (ক্লাব: হফেনহেইম। দেশ: ক্রোয়েশিয়া)
হফেনহেইমের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রামারিচ এবারও বুন্দেসলিগায় ১৪টি গোল করেছেন। এ নিয়ে টানা নয়বার তিনি লিগে দুই অঙ্কের ঘরে গোল করলেন, যা তার ক্লাবকে ইউরোপীয় ফুটবলে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে।
৩৪ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ক্রোয়াট তারকা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ১১৪ ম্যাচে ৩৬ গোল করেছেন। ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। গ্রুপ ‘এল’-এ ইংল্যান্ড ও ঘানার বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার বড় ভরসা তিনি। ১৯৯৮ সালে তার শৈশবের নায়ক ডেভর সুকার এর পর প্রথম ক্রোয়াট হিসেবে তিনি গোল্ডেন বুট জিততে পারেন কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।
৭. এরমেদিন দেমিরোভিচ (ক্লাব: ভিএফবি স্টুটগার্ট। দেশ: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা)
স্টুটগার্টের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ স্কোয়াডের কারণে মাত্র ১৭টি ম্যাচে মূল একাদশে সুযোগ পেয়েও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন দেমিরোভিচ। তার দল স্টুটগার্ট এবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোয়ালিফাই করেছে।
২০২১ সালে অভিষেকের পর থেকে তিনি বসনিয়া দলের নিয়মিত মুখ। এটি তার প্রথম বিশ্বকাপ। প্লে-অফে ইতালির বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে ১১৫ মিনিট মাঠে ছিলেন তিনি। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর বিশ্বমঞ্চে তার শারীরিক শক্তি ও লড়াকু ফুটবল বসনিয়াকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
৮. এডিন জেকো (ক্লাব: শালকে। দেশ: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা)
৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার এডিন জেকো গত জানুয়ারিতে সবাইকে চমকে দিয়ে জার্মান ফুটবলে ফিরে আসেন। এর আগে ২০০৮/০৯ মৌসুমে ভলফসবুর্গের হয়ে বুন্দেসলিগা জিতেছিলেন। শালকের হয়ে যোগ দিয়েই তিনি ৬টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করে দলটিকে বুন্দেসলিগা ২-এর শিরোপা জেতাতে এবং শীর্ষ ফ্লাইটে ফিরিয়ে আনতে অবদান রাখেন।
২০১৪ সালের পর বসনিয়ার এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক দলটির মাত্র দুজন খেলোয়াড় এখনো দলে আছেন, যার একজন জেকো (অন্যজন সেয়াদ কোলাসিনাক)। বসনিয়ার হয়ে ১৪৮ ম্যাচে ৭৩ গোল করা এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে গোল্ডেন বুটটিকে নিজের ঝুলিতে পুরতে চাইবেন।
বুন্দেসলিগার অতীত গোল্ডেন বুট জয়ী কিংবদন্তিরা
গার্ড মুলার (জার্মানি/বায়ার্ন মিউনিখ) – ১৯৭০ বিশ্বকাপ:
মেক্সিকো বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির হয়ে ১০টি গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন মুলার। গ্রুপ পর্বে বুলগেরিয়া ও পেরুর বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় জয়সূচক গোল করেছিলেন তিনি। বায়ার্নের হয়ে ৪২৭ ম্যাচে ৩৬৫ গোল করা মুলার এখনো বুন্দেসলিগার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১৯৭৪ সালে তিনি জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপও জেতেন।
মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানি/ভেয়ার্ডার ব্রেমেন) – ২০০৬ বিশ্বকাপ:
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্লোসা ২০০৬ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ৫টি গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। কোস্টারিকা ও ইকুয়েডরের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার করা সমতাসূচক গোলটি জার্মানিকে টাইব্রেকারে জিততে সাহায্য করেছিল। ২০১৪ সালে তিনি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পান এবং জার্মানির হয়ে সর্বোচ্চ ৬৯ গোল করে গার্ড ম্যুলারের রেকর্ড ভাঙেন।
টমাস মুলার (জার্মানি/বায়ার্ন মিউনিখ) – ২০১০ বিশ্বকাপ:
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে মাত্র ২০ বছর বয়সে ৫টি গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন টমাস মুলার। ডেভিড ভিয়া, ওয়েসলি স্নাইডার এবং ডিয়েগো ফোরলান ৫টি করে গোল করলেও, মুলার ৩টি অ্যাসিস্ট করার কারণে গোল্ডেন বুটটি এককভাবে নিজের করে নেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপেও তিনি ৫টি গোল করেছিলেন, তবে সেবার রদ্রিগেজের (৬ গোল) পেছনে থেকে সিলভার বুট পান।
বুন্দেসলিগার এই গৌরবময় ইতিহাসের পর, এবার আমেরিকার মাটিতে বর্তমান প্রজন্মের হ্যারি কেইন কিংবা তরুণ তুর্কিদের কেউ জার্মানির এই লিগের সুনাম ধরে রাখতে পারেন কিনা, তা দেখার জন্য ফুটবল বিশ্ব মুখিয়ে আছে।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩















