থমকে আছে নারী ক্রিকেট! ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথ কোথায়?

নারী এয়িশা কাপ

২০১৮ সালের এশিয়া কাপে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ মেয়েদের এশিয়া কাপ প্রথম জিতেছিল। কিন্তু তারপর আর সেই চমক জাগানিয়া জয়ের পারফরম্যান্স আর দেখাতে পারেনি, বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে, সেবার ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বেও জয় লাভ করেছিল। অপরদিকে বাংলাদেশ পুরুষ দল এশিয়া কাপের ফাইনাল খেললেও শিরোপা অধরা রয়েছে গেছে সেখানে নারী এশিয়া কাপে প্রথম বার ফাইনালে উঠেই শক্তিশালি ভারতকে হারিয়ে ২০১৮ সালেই বাংলাদেশ ক্রিকেটে বড় চমকই দিয়েছিল সালমার দল। কিন্তু তার পর আর বাংলাদেশ নারী দল সেমির বাধা অতিক্রম করতে পারছেনা। গত আসবে শ্রীলংকা আর এবার ভারতের কাছে সেমিতে হেরে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভঙ্গ। এবারের এশিয়া কাপে বাংলাদেশ সেমি ফাইনাল সহ যে ৪টি ম্যাচ খেলেছে তা দেখে মনে হচ্ছে ‘থমকে আছে নারী ক্রিকেট, তাই ব্যার্থতার বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথ কোথায় আছে? তা বের করার সময় এখনই।

মেয়েদের অনেক অনেক আগে ক্রিকেট খেলা শুরু করা বাংলাদেশ পুরুষ দল মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব পায়নি এখনও, কিন্তু এশিয়া কাপ জয়ের পর বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের নতুন যুগের সূচনা হওয়ার কথা ছিল আসলে আমরা মনে হয় এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর অনেক সময় হেলায় হারিয়েছি আত্মতুষ্টিতে ভুগতে ভুগতে যার কারণে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের আজ এই অবস্থা! এশিয়া কাপের শ্রেষ্ঠত্বই আমাদের কাছে বড় মনে হয়েছে আর কারণেই হয়তো একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশ।

২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ৩টি আসরে ফাইনালে যেতে পারেনি বাংলাদেশ। যার সর্বশেষ গত পরশু সেমিফাইনালে বিনা লড়াইয়ে হেরেছে ভারতের কাছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায় বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট খুব একটা এগোয়নি। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় মেয়েদের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো, ফিটনেস, প্রতিভা উঠে আসার পথ না থাকা ইত্যাদি।

২০২৬ নারী এশিয়া কপে বাংলাদেশ বি গ্রুপে শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও আরব আমিরাতের সাথে খেলেছে, এই গ্রুপে বাংলাদেশ চ্যাম্পয়ন হলে যে সেমিতে ভারতকে এড়িয়ে যেতে পারতো তা আমরা আগে থেকেই জানতাম, কিন্তু এরপরও বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের ২য় ম্যাচে পরাজিত হয়েছে শ্রীলংকার কাছে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে। শুধু শ্রীলংকার বিপক্ষেই নয় প্রথম ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে টেনে টুনে ১২৯ রান করলাম যদিও সেই ম্যাচ জিতেছি কিন্তু আপ টু দ্য মার্ক ব্যাটিং করতে পারিনি। অপরদিকে শ্রীলংকার বিপক্ষে মাত্র ১১৪ রান নিয়ে হারলাম আর শেষ ম্যাচে তো আরব আমিরাতের বিপক্ষে আরো কম রান করলাম মাত্র ১০৩! আবার সেমিফাইনালে ভারতের সাথে ১৫০ রান তাড়া করতে গিয়ে ১০৯ রানে শেষ। অর্থ্যাৎ এশিয়া কাপে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল ধারাবাহিকভাবে ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণেই হেরেছে।

বাংলাদেশ দলের কোচ: নারী দলের প্রধান কোচ সরোয়ার ইমরান বলছেন, ‘আমাদের ওরকম ফিটনেস নেই। আমরা দুই রান নিতে ভয় পাচ্ছি রান আউট হওয়ার ভয়ে। খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। শুধু ক্যাম্পের আগে এক সপ্তাহ ফিটনেস ক্যাম্প হলে হবে না, আমাদের সারা বছর ফিটনেস নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’

নারী ক্রিকেটের পাইপ লাইন বন্ধ: তবে মেয়েদের এই সংকট শুধু জাতীয় দলের নয়, আরও গভীর। জাতীয় দলে ক্রিকেটার উঠে আসার পথটা একরকম বন্ধ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ঘরোয়া ক্রিকেটে মেয়েদের সর্বশেষ টুর্নামেন্ট হয়েছে প্রায় এক বছর আগে, গত ডিসেম্বরে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগও হয়নি জাতীয় দলের ব্যস্ততায়। নির্বাচকদের ক্রিকেটার খুঁজে বের করার কাজটা তাই কঠিন হয়ে গেছে আরও। জাতীয় দলের বাইরে ওই অর্থে খেলাই নেই। যাঁরা একবার জাতীয় দলে ঢুকে যান, তাঁদেরই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলানো ছাড়া উপায় থাকে না তাই। আবার এ কথাও সত্যি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন, এমন ক্রিকেটারের সংকট থাকায় জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজনও কঠিন।

যেভাবে ব্যাটিং ব্যর্থতা থেকে বের হতে হবে:

ব্যার্থতার বৃত্তে আটকে গেলে শুধু বেশি অনুশীলন করলেই হয় না-ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত করে, ছোট ছোট ধাপে আত্মবিশ্বাস ও টেকনিক পুনর্গঠন করতে হয়।

১. সমস্যাটা নির্দিষ্ট করতে হবে: “আমি রান করতে পারছি না”-এটা সমস্যা নয়, ফলাফল। কারণটা বের করতে হবে: অফ স্টাম্পের বাইরের বলে বারবার আউট? ইনসুইং/আউটসুইং বুঝতে সমস্যা? শর্ট বলে দুর্বল? প্রথম ১০–২০ বলেই অস্থির হয়ে যাচ্ছেন? ভালো শুরু করেও ভুল শট খেলছেন? চাপের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে? আগের ব্যর্থতার কথা মাথায় রেখে নতুন ইনিংসে ঢুকছেন? শেষ ১০টি ইনিংস লিখে দেখুন—কোন ধরনের বলে, কোন শটে, কোন পর্যায়ে আউট হয়েছেন। এতে প্যাটার্ন বের হবে।

২. রান নয় বরং প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য বানাতে হবে:

পরের ম্যাচে লক্ষ্য যদি হয় “আজ ৫০ রান করব”, তাহলে প্রথম কয়েকটি ডট বলই মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তার বদলে লক্ষ্য করুন: প্রথম ১০ বল: বল দেখব, মাথা স্থির রাখব। অফ স্টাম্পের বাইরে: অপ্রয়োজনে খেলব না। নিজের শক্তির জায়গার বল: আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলব। প্রতি বলের আগে: লাইন → লেংথ → শট সিদ্ধান্ত। একটি ভুল বলকে পরের বলে নিয়ে যাব না। অর্থাৎ, স্কোরবোর্ড নয়—এক বল করে ইনিংস তৈরি করুন।

৩. নেটে “ব্যাটিং” নয়, সমস্যার অনুশীলন:

সাধারণ নেটে ৩০ মিনিট ব্যাট করে শুধু বল মারা সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে। উদাহরণ: সমস্যা: অফ স্টাম্পের বাইরে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ তাহলে অনুশীলন করুন: ২০টি বল শুধু ছেড়ে দেওয়া ২০টি বল শুধু ডিফেন্স এরপর ২০টি বল—শুধু নিজের স্কোরিং এলাকার বল কোচ/বোলার যেন ইচ্ছাকৃতভাবে অফ স্টাম্পের বাইরে বল করেন এভাবে দুর্বল জায়গাকে আলাদা করে ট্রেনিং করুন।

সারকথা: ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙতে শুধু শুধু বেশী বেশী অনুশীলন নয় বরং নির্দিষ্ট অনুশীলন দরকার।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles