শেষ বাঁশিতে মেসির অশ্রু, স্পেনের উল্লাস-চিরস্মরণীয় বিশ্বকাপ ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

বিশ্বকাপ আসে বিশ্বকাপ চলে যায় এর মাঝে রেখে যায় দুঃখ ও সুখস্মৃতির কিছুর মুহুর্ত। যেখানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ একটু আলাদাভাবেই যেন দাগ কেটেছে ফুটবল অনুরাগীদের হৃদয়ে। ৪৮ দেশ আর ৪টি নতুন দেশ নিয়ে জমবে কিনা আবার ৩ দেশ মিলিয়ে আয়োজন, বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের ট্রাভেলিং ধকল এ ধরনের নানা সঙ্কা নিয়ে অবশ্য বিশ্বকাপের সফল সমাপ্ত ঘটেছে তবে ‘শেষ বাঁশিতে মেসির অশ্রু আর স্পেনের উল্লাসে অবশ্যই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বিশ্বকাপ-২০২৬।

ফাইনাল শেষে হতাশা মিসি

নতুন স্পেন:

কেপ ভার্দের সাথে গোল শুন্য ড্র করেই যাত্রা শুরু হয়েছির স্পেনের এর পর জয়ের ধারা অব্যাহত রেখে একে একে পর্তুগাল এবং ফ্রান্সের মত বিশ্ব সেরা দলকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ২০১০ চ্যাম্পিয়নরা, সেমিফাইনালে স্পেন ফ্রান্সকে যেভাবে বোতল বন্দি করে জিতেছে তা অবশ্যই এই বিশ্বকাপের স্পেন যে নতুন পথ চলা শুরু করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনো। আর তাতেই বোঝা যাচ্ছে স্পেনের এই জয় ফুটবল বিশ্বের জন্য নতুন বার্তা এবং তাদের কাউন্টার প্রেসিং ও পাসিং ফুটবল বিশ্ব ফুটবলের প্রতিনিধত্ব করবে।

আর্জেন্টিনা আবেগঃ

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বাধার আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে বড় বিপদে পড়তে হয়নি কিন্তু ইংল্যান্ডের সাথে সঙ্কা থেকে যেভাবে উতরিয়ে গেছে তা তাদের লড়াকু মনোভাবের অংশ হিসেবে মনে করা হচ্ছিল কিন্তু স্পেন বাধা পেরুতে তাদের সেই মানসিকতা যথেষ্ট ছিলনা। তাই মেসির শেষ বিশ্বকাপের আবেগ- ৩৯ বছর বয়সে লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ, ফাইনালে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতছাড়া হওয়া এসবই ছিল আর্জেন্টিনার আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

সাইড বেঞ্চের পারফর্ম্যান্স;

স্পেনের বিশ্বকাপ জয়-ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের গোলটি হয়ে থাকবে আসরের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত আর স্পেনের বেঞ্চের খেলোয়াড়রা যে কতটা সামর্থবান তা তারা প্রমান করে দিয়ে বিশ্বকাপকে অমরত্ব দিয়েছে।

মেসি বনাম ইয়ামাল;

 দুজনের মধ্যে প্রতীকী দ্বৈরথ ছিল-একদিকে ফুটবলের কিংবদন্তি মেসি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের তারকা লামিনে ইয়ামাল তাই ফাইনালকে ঘিরে ‘পুরোনো যুগ বনাম নতুন যুগ’-এর যে গল্প তৈরি হয়েছিল, তা বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহুর্তের একটি ছিল যদিও নতুন ইয়ামাল জিতেছে।

আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়: ফাইনালে ওঠার লড়াই- ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে পিছিয়ে থেকেও শেষ দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ জয় এবং ফাইনালে যাওয়া ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম নাটকীয় প্রত্যাবর্তন আর এ কারণেই এই ম্যাচটা যে কোন পিছিয়ে পড়া দলের জন্য অনুকরনীয়, স্মরনীয় ম্যাচ।  

ফ্রান্স-ইংল্যান্ডের গোলবন্যা: তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ১০ গোলের রোমাঞ্চকর লড়াই ফ্রান্স ৬-৪ ইংল্যান্ড, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি গোলের ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে মনে থাকবে। তাছাড়া সাকার হ্যাট্রিক, বাপ্পের হ্যাট্রিকের সম্ভবানা আবার গোল্ডেন বুটের প্রতিকি লড়াইয়ের রোমাঞ্চ হয়ে থাকবে বিশ্বকাপের ১০৩ নম্বর ম্যাচটি। 

হ্যাট্রিকের পর সাকা

৪৮ দল: বিশ্বকাপের নতুন অভিজ্ঞতা- ৪৮ দল ও ১০৪ ম্যাচের এই বৃহত্তর বিশ্বকাপ নতুন এক যুগের সূচনা করেছে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ-কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র-মিলে আয়োজন করাও ছিল ঐতিহাসিক। নতুন দেশ গুলো কেমন করবে এমন যে সঙ্কা ছিল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর তা উড়ে গেছে বিশ্বকাপ শেষে তাইতো ফিফার ভাবনায় এখন ৬৪ দেশের বিশ্বকাপ।

মেসির বিদায়ী মুহূর্ত: ফাইনাল শেষে মেসির হতাশ মুখ, শূন্য দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং স্পেনের খেলোয়াড়দের উৎসব এই দৃশ্যগুলো বিশ্বকাপের আবেগঘন স্মৃতির তালিকায় থাকবে চিরদিন।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপকে হয়তো মনে রাখা হবে মেসির শেষ অধ্যায়, স্পেনের উত্থান, ইয়ামালের নতুন যুগের প্রতীক হয়ে ওঠা এবং একটি রোমাঞ্চকর ফুটবল মহাকাব্য হিসেবে।

শেষ বাঁশিতে মেসির অশ্রু, স্পেনের উল্লাস- চিরস্মরণীয় বিশ্বকাপ ২০২৬
এমবাপ্পে গোলের পর

৪টি নতুন দেশ: ২০২৬ বিশ্বকাপে চারটি দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলেছে-কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান। চার দলের মধ্যে সবচেয়ে চমক দেখিয়েছে কেপ ভার্দে।

বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া দলগুলোর পারফরম্যান্স:

দেশপারফরম্যান্সউল্লেখযোগ্য দিক
কাবো ভার্দেগ্রুপ পর্বে ভালো চমকস্পেনের বিপক্ষে ০-০ ড্র; উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ এবং সৌদির সাথে ০-০ ড্র-অভিষেকেই নজরকাড়া পারফরম্যান্স
কুরাসাওগ্রুপ পর্বে বিদায়জার্মানির বিপক্ষে গোল করে ইতিহাস; ইকুয়েডরের বিপক্ষে ০-০ ড্র করে প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট
জর্ডানগ্রুপ পর্বে বিদায়প্রথম বিশ্বকাপ গোল করে ইতিহাস; অভিষেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল।
উজবেকিস্তানগ্রুপ পর্বে বিদায়কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথম বিশ্বকাপ গোল; অভিষেকেই লড়াকু মানসিকতা।

কেপ ভার্দে ছিল সবচেয়ে বড় চমক। মাত্র প্রায় ৫ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটি অভিষেকেই স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও ছিল ম্যাচটির অন্যতম আকর্ষণ।

কুরাসাও-এর গল্পটিও ছিল আবেগময়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশগুলোর একটি হিসেবে তাদের অভিষেক হয়। জার্মানির বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করার পর ইকুয়েডরের বিপক্ষে ০-০ ড্র করে পায় ঐতিহাসিক প্রথম পয়েন্ট।

অপরদিকে জর্ডান ও উজবেকিস্তান অভিষেকেই নিজেদের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করে। জর্ডানের হয়ে আলি ওলওয়ান এবং উজবেকিস্তানের হয়ে আব্বোসবেক ফায়জুল্লায়েভ সেই ঐতিহাসিক গোলের নায়ক হয়েছেন।

সারসংক্ষেপে বলা যায় অভিষেক কারীদের মধ্যে কেপ ভার্দে সবচেয়ে বড় চমক, কুরাসাও দারুন চমক, আর জর্ডান ও উজবেকিস্তান ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে প্রথম বিশ্বকাপ গোলের মাধ্যমে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ যে নতুন ফুটবল-শক্তির উত্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, এই চার দলের অভিষেক তারই অন্যতম প্রমাণ। বিশ্বকাপের যাত্রায় সামিল হোক নতুন নতুন দেশ ফুটবলের বিশ্বায়ন হোক ছড়িয়ে পড়ুক ফুটবল আনন্দ বিশ্বময় অপেক্ষায় রইলাম ২০৩০ বিশ্বকাপের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles