চীনের বিশ্বকাপ দরকার নেই – তাদের আছে ‘ভিলেজ সুপার লিগ’

লাল জার্সি পরা ফুটবলাররা আনন্দে লাফাচ্ছেন। সতীর্থদের গায়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন শ্যাম্পেন। চারপাশে উড়ছে কনফেটি ও রঙিন ফিতা, আর উল্লাসের সেই মুহূর্ত মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন দর্শকেরা।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে রোববার স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের দৃশ্য নয়। বরং প্রায় ৬ হাজার মাইল দূরে চীনের উত্তরাঞ্চলের হেবেই প্রদেশের পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকা ফুপিং কাউন্টিতে এক দিন আগে উদযাপিত একটি জয়। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন স্লোগানে সাজানো একটি স্টেডিয়ামে এই উৎসবের আয়োজন।

চীনের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অসংখ্য ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দলগুলো লড়ছে জাতীয় পর্যায়ের ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ বা গ্রাম্য সুপার লিগের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিতে। অপেশাদার এই টুর্নামেন্ট ইতোমধ্যে চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। লাখো দর্শক এই প্রতিযোগিতা উপভোগ করছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনের পুরুষ জাতীয় দল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে না পারলেও, ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ হয়ে উঠেছে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশ্বকাপের এক বর্ণিল বিকল্প।

বাওডিং শহর থেকে ফুপিং কাউন্টির ম্যাচ খেলতে আসা দন্তচিকিৎসক ও ফুটবলার টং জেহাও বলেন, ‘এভাবে সবার নজরের কেন্দ্রে থাকা—এটা এমন কিছু, যা সাধারণত আমার ভাগ্যে জোটে না। ভিলেজ সুপার লিগের আগে স্থানীয় পর্যায়ে এতটা মনোযোগ পাওয়া কোনো টুর্নামেন্ট ছিল না।’

একটি দরিদ্র গ্রামীণ কাউন্টির স্থানীয় লিগ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন চীনের বিভিন্ন গ্রামীণ শহর ও ছোট নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৬০টি লিগ এবং শত শত দল এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।

এর ধারণাটি বেশ সহজ। বিভিন্ন পেশায় থাকা সাধারণ মানুষ নিজেদের দল গঠন করেন। এরপর স্থানীয় লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সুযোগ পাওয়ার জন্য লড়াই করেন। পুরো মৌসুমজুড়েই এসব ম্যাচকে ঘিরে বসে উৎসবের আমেজ। মাঠে ভিড় করেন হাজারো ফুটবলপ্রেমী।

এই প্রতিযোগিতার বিস্তারে স্থানীয় সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দুর্বল ভোগব্যয়ের কারণে চাপের মুখে থাকা দেশের অর্থনীতিতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা করতেই কর্মকর্তারা এই আয়োজনকে উৎসাহিত করছেন।

তবে অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ চীনের পেশাদার ফুটবলের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় হতাশ সমর্থকদের কাছেও নতুন আশার জায়গা হয়ে উঠেছে। অনেকের মতে, এসব সমস্যাই ১৪০ কোটির বেশি মানুষের দেশ চীনকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম একটি শক্তিশালী পুরুষ ফুটবল দল গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২১ বছর বয়সী কলেজছাত্রী লিউ জিয়াপিং বলেন, ‘আমাদের দেশ যেহেতু বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি, তাই ফুপিং কাউন্টিতে স্থানীয় ফুটবল দেখাই বেশি উপভোগ্য।’

বিশ্বকাপ তারকা ও ফরাসি ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পের ভক্ত এই তরুণী আরও বলেন, ‘এখানে এসে আমরা নিজেদের দেশের ফুটবলের অভিজ্ঞতা নিতে পারছি। ঘরে বসে মোবাইল ফোন দেখার চেয়ে এটা অনেক ভালো।’

এভাবেই চীনের ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ শুধু একটি অপেশাদার ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং সাধারণ মানুষের ফুটবলপ্রেম, স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক সুতোয় গাঁথা এক নতুন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles