২০০৯ সালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে দলে যোগ দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফরাসি এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরে শুরু থেকেই প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। রোনালদোর মতোই গোলের পর গোল করে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এমবাপ্পে। তবে রিয়ালে দুই পূর্ণ মৌসুম শেষে পর্তুগিজ কিংবদন্তির সঙ্গে তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন ফরাসি তারকা?
পরিসংখ্যান বলছে, দুই তারকার শুরুটা অনেকটাই কাছাকাছি। রিয়াল মাদ্রিদে প্রথম দুই পূর্ণ মৌসুম শেষে এমবাপ্পে ঠিক যতটি গোল করেছেন, একই সময়ে রোনালদোর গোলসংখ্যাও ছিল ততটাই। তবে এমবাপ্পে এই সংখ্যায় পৌঁছাতে রোনালদোর চেয়ে বেশি ম্যাচ ও মিনিট খেলেছেন। একই সঙ্গে ফরাসি তারকা বেশি পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন এবং রোনালদোর তুলনায় তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।
ব্যক্তিগত সাফল্যে অবশ্য এমবাপ্পের শুরুটা দুর্দান্ত। রিয়ালের হয়ে গোল করার অসাধারণ ধারাবাহিকতা দেখিয়ে তিনি জিতেছেন নিজের প্রথম ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড হিসেবে নিজের অবস্থানও আরও শক্ত করেছেন তিনি।
তবে দলীয় সাফল্যের বিচারে এমবাপ্পের প্রথম দুই মৌসুম খুব একটা উজ্জ্বল নয়। উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ছাড়া বড় কোনো শিরোপা এখনো জেতা হয়নি তার। এই দু’টি ট্রফি অবশ্য রিয়ালের আগের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের ধারাবাহিকতায় অর্জিত হয়েছিল, অর্থাৎ এমবাপ্পে ক্লাবে যোগ দেওয়ার আগেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা নিশ্চিত হয়েছিল।
রোনালদোর ক্ষেত্রেও রিয়ালে শুরুর সময়টা ছিল অনেকটা একই রকম। ২০০৯ সালে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম মৌসুমে কোনো শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। দ্বিতীয় মৌসুমেও বার্সেলোনার আধিপত্যের কারণে লা লিগা হাতছাড়া হয়। একই সময়ে পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন্স লিগও জেতে এবং সেমিফাইনালের পথে রিয়াল মাদ্রিদকে হারায়।
তবে সেই মৌসুমে রোনালদো একটি বড় সাফল্য পেয়েছিলেন। কোপা দেল রে ফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে রিয়ালকে শিরোপা এনে দেন তিনি।
রোনালদোর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে তৃতীয় মৌসুমে। ২০১১-১২ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৬০ গোল করেন পর্তুগিজ তারকা। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে চার বছর পর লা লিগার শিরোপা জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। সেই মৌসুমে রোনালদোর কোচ ছিলেন হোসে মরিনিও।
এখন এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও তৃতীয় মৌসুমকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। রোনালদোর মতো তিনিও যদি নিজের গোলসংখ্যার সঙ্গে দলীয় সাফল্য যোগ করতে পারেন, তাহলে রিয়াল মাদ্রিদে তার ক্যারিয়ার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
তবে রোনালদোর সেরা সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে এমবাপ্পেকে এখনো আরও এক ধাপ এগোতে হবে। গোল করার ক্ষেত্রে দুই তারকার শুরুটা কাছাকাছি হলেও ম্যাচ, মিনিট ও অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানে রোনালদো এগিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে রোনালদো যখন তার সেরা সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তার গোলের পাশাপাশি ম্যাচে প্রভাব বিস্তার এবং সতীর্থদের গোল করানোর ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ।
এমবাপ্পেকে নিয়ে রোনালদো নিজেও একাধিকবার প্রশংসা করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে পর্তুগিজ কিংবদন্তি বলেছিলেন, এমবাপ্পে তার ভক্ত ছিলেন এবং রোনালদো নিজেও ফরাসি তারকার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেন। তবে এমবাপ্পের খেলার ধরন নিয়ে রোনালদোর একটি বিশেষ পরামর্শও রয়েছে।
রোনালদোর মতে, এমবাপ্পের উচিত নিজের স্বাভাবিক খেলার ধরন বজায় রাখা এবং তাকে একজন ‘টিপিক্যাল’ নম্বর নাইন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ রোনালদো নিজেও ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন মূলত উইঙ্গার। পরে ধীরে ধীরে নিজের খেলার ধরন পরিবর্তন করে গোলমুখী ফরোয়ার্ডে পরিণত হন।
এখন প্রশ্ন হলো, এমবাপ্পে কি রোনালদোর মতো রিয়াল মাদ্রিদে ইতিহাস তৈরি করতে পারবেন? দুই পূর্ণ মৌসুম শেষে গোলের হিসেবে দুই তারকার অবস্থান কাছাকাছি হলেও রোনালদোর পরবর্তী মৌসুমগুলোই তাকে রিয়ালের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছিল। এমবাপ্পের সামনে এখন সেই একই চ্যালেঞ্জ—ব্যক্তিগত গোলের ধারাবাহিকতাকে দলীয় শিরোপায় রূপ দেওয়া।
রিয়াল মাদ্রিদে এমবাপ্পের তৃতীয় মৌসুম তাই হতে পারে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদি তিনি রোনালদোর মতোই এই সময়ে নিজের পারফরম্যান্সকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে যেতে পারেন এবং দলকে লা লিগা কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় শিরোপা জেতাতে পারেন, তাহলে রিয়ালের ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করার পথে আরও বড় পদক্ষেপ নিতে পারবেন ফরাসি তারকা।


