ইউরোপের দলগুলো না খেললে বিশ্বকাপ কেমন হবে?

ইউরোপের জাতীয় দলগুলো অংশ না নিলে ২০৩০ বিশ্বকাপের চিত্র কেমন হতে পারে, এমনই এক চমকপ্রদ সম্ভাব্য হিসাব সামনে এনেছে একটি সুপারকম্পিউটারভিত্তিক পূর্বাভাস। সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপের কোনো দল বিশ্বকাপে না খেললেও শিরোপা ধরে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে লিওনেল মেসিদের দেশটির।

বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না, এমন দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব ও টুর্নামেন্টকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিযোগিতার অংশবিশেষ বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে ফিফার সঙ্গে উয়েফার মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন সংস্থা তাদের পরিকল্পনা থেকে সরে না এলে উয়েফা ফিফা আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বয়কটের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এমন সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

যদিও এটি এখনো একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং উয়েফার পক্ষ থেকে এমন কোনো বয়কটের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নেওয়া হয়নি, তবু ইউরোপের দলগুলো বিশ্বকাপে অংশ না নিলে টুর্নামেন্টের চেহারা যে আমূল বদলে যাবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ইউরোপের দল ছাড়া বিশ্বকাপ কেমন হতে পারে?

এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২৩টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৩ বারই শিরোপা জিতেছে ইউরোপের কোনো না কোনো দেশ। সর্বশেষ ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও ইউরোপের দল ফ্রান্স ফাইনালে উঠেছিল। তার আগের আসরে ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স। ইউরোপের দলগুলোর দীর্ঘদিনের আধিপত্যের কারণে তাদের ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজন করা হলে প্রতিযোগিতার শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামনে রেখে বর্তমান দলগুলোর শক্তি, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ও বিভিন্ন পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে একটি সম্ভাব্য মডেল তৈরি করেছে CasinoHawks-এর সুপারকম্পিউটার। মডেলটি ২০৩০ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ফলাফল অনুমান করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপারকম্পিউটারটি একই টুর্নামেন্টের সম্ভাব্য ফলাফল ১ লাখ বার সিমুলেশন করেছে। এরপর এসব সিমুলেশনের গড় ফলাফল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন ও অন্যান্য ফলাফল নির্ধারণ করা হয়েছে। অস্বাভাবিক বা আকস্মিক ফলাফলের প্রভাব কমিয়ে বাস্তবসম্মত একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরাই ছিল এই মডেলের উদ্দেশ্য।

এই পূর্বাভাসে বিশ্বকাপের দলগুলো ফিফা র‍্যাঙ্কিং এবং কনফেডারেশনভিত্তিক নির্ধারিত আসন বণ্টনের ওপর ভিত্তি করে পূরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ধরে নেওয়া হয়েছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত ৬৪ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। যদিও ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব নিয়েও ফুটবলবিশ্বে রয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক।

ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল

সুপারকম্পিউটারের সবচেয়ে বড় চমক হলো, ইউরোপের দলগুলো না থাকলেও বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হতে পারে দক্ষিণ আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে পারে আর্জেন্টিনা। অর্থাৎ ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলো না থাকলেও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের দুই পরাশক্তির লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসতে পারে আলবিসেলেস্তেরা।

সুপারকম্পিউটারের হিসাবে, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ পুরো টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনায় আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের চেয়ে মাত্র ২ শতাংশ এগিয়ে।

যদিও এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং বর্তমান দলগুলোর শক্তি ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তৈরি একটি সম্ভাব্য মডেল। বাস্তবে বিশ্বকাপের ফলাফল নির্ভর করে খেলোয়াড়দের ফর্ম, ইনজুরি, ড্র, ম্যাচের কৌশল এবং মাঠের পারফরম্যান্সসহ অসংখ্য বিষয়ের ওপর।

বিশ্বকাপে অভিষেক হতে পারে অনেক দেশের

তবে এই পূর্বাভাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য শিরোপা জয় নয়। বরং ইউরোপের দলগুলো না থাকলে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে এমন অনেক নতুন দেশের নাম।

ইউরোপের জাতীয় দলগুলো বিশ্বকাপ থেকে সরে গেলে তাদের জন্য বরাদ্দ থাকা বিপুলসংখ্যক জায়গা খালি হয়ে যাবে। ফলে অন্যান্য মহাদেশের অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দলগুলোর সামনে বিশ্বকাপ খেলার বড় সুযোগ তৈরি হবে।

সুপারকম্পিউটারের সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, গুয়াতেমালা, বাহরাইন, উগান্ডা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মোজাম্বিক ও মাদাগাস্কারের মতো দেশগুলো বিশ্বকাপে অভিষেক করতে পারে। এসব দেশের জন্য বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবার খেলার সুযোগ তৈরি হলে তা হবে তাদের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন।

বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ইউরোপের দলগুলোর অনুপস্থিতিতে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারে। এর ফলে টুর্নামেন্টের বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও প্রতিযোগিতার মান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

সেমিফাইনালে উঠতে পারে নাইজেরিয়া

পূর্বাভাসে আরও একটি বড় চমক হিসেবে উঠে এসেছে নাইজেরিয়ার নাম। ইউরোপের দলগুলো না থাকলে নাইজেরিয়া বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।

এমনটা হলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নাইজেরিয়া হবে সেমিফাইনালে ওঠা দ্বিতীয় আফ্রিকান দল। আফ্রিকার ফুটবলে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার একমাত্র নজির তৈরি করেছে মরক্কো। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তারা ইতিহাস গড়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয় এবং প্রথম কোনো আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার কৃতিত্ব অর্জন করে।

সেই ধারাবাহিকতায় নাইজেরিয়া সেমিফাইনালে উঠলে আফ্রিকান ফুটবলের জন্য তা হবে আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

বদলে যেতে পারে বিশ্বকাপের শক্তির ভারসাম্য

ইউরোপের দলগুলোর অনুপস্থিতিতে বিশ্বকাপের শক্তির ভারসাম্য যে পুরোপুরি বদলে যাবে, তা এই পূর্বাভাসেই স্পষ্ট। বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস ও ইতালির মতো দলগুলো বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই দলগুলো না থাকলে দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পাশাপাশি আফ্রিকা, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দলগুলোর সামনে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ আরও বাড়বে। বিশ্বকাপের মূল পর্বে নতুন নতুন দেশের অংশগ্রহণও টুর্নামেন্টকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে পারে।

তবে অন্যদিকে ইউরোপের দলগুলো না থাকলে বিশ্বকাপের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান ও বাণিজ্যিক আকর্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী জাতীয় দলগুলোর বড় একটি অংশই ইউরোপের। তাদের অনুপস্থিতি টুর্নামেন্টের দর্শকসংখ্যা, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং সামগ্রিক বাণিজ্যিক মূল্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাস্তবে কি এমন বিশ্বকাপ সম্ভব?

ইউরোপের দলগুলোকে ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজনের এই সম্ভাব্য চিত্র মূলত একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। উয়েফা ও ফিফার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ইউরোপের দেশগুলো বিশ্বকাপ বয়কট করবে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো নেই।

তাই সুপারকম্পিউটারের এই পূর্বাভাসকে বাস্তব ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক সম্ভাব্য মডেল, যেখানে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি তৈরি করে তার সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তবে এই পূর্বাভাস একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিশ্বকাপ থেকে ইউরোপের দলগুলো সরে দাঁড়ালে টুর্নামেন্টের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। একদিকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মতো দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো শিরোপার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবে, অন্যদিকে নাইজেরিয়ার মতো দল সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়তে পারে। একই সঙ্গে গুয়াতেমালা, বাহরাইন, উগান্ডা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মোজাম্বিক ও মাদাগাস্কারের মতো দেশগুলোর সামনে খুলে যেতে পারে বিশ্বকাপের দরজা।

সব মিলিয়ে, ইউরোপের দলগুলোকে ছাড়া ২০৩০ বিশ্বকাপ হলে সেটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ফুটবল মহাযজ্ঞ, যেখানে পুরোনো শক্তির পাশাপাশি নতুন দেশগুলোর উত্থান দেখা যেতে পারে। আর সেই কাল্পনিক বিশ্বকাপে সুপারকম্পিউটারের হিসাবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট উঠতে পারে আর্জেন্টিনার মাথায়, ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles