বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার প্রস্তাবিত বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন, এএফসি। ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ও উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এএফসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ফিফা বিশ্বকাপ বয়কটের সম্ভাবনাও এখন প্রকাশ্য আলোচনায় এসেছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই ফিফা সভাপতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে তার সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরোর পদত্যাগ। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ফিফার প্রস্তাবিত পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক প্রধান এই কর্মকর্তা।
কর্দেইরো বলেন, “ফিফা সভাপতির সিনিয়র উপদেষ্টা, সাবেক ব্যাংকার এবং আজীবন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমি ফিফার বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করার সময় নীরব থাকতে পারি না। এই প্রস্তাবের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং আমি এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করছি।”
তিনি আরও বলেন, এই পরিকল্পনা ফিফার সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য খারাপ চুক্তি, ফুটবলের জন্য খারাপ এবং খেলাটির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর।
ফিফা প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইউরোপ ও উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থাগুলোর অবস্থানের পরই কর্দেইরোর পদত্যাগের ঘটনা সামনে আসে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ফিফা জানিয়েছিল, পরিকল্পনাটি নিয়ে তারা একটি “উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক” পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।
ফিফার পরিকল্পনার বিষয়ে এএফসি এক বিবৃতিতে উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বলেছে, প্রস্তাবটি নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ৪৭টি সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত এএফসি বলেছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছানো, যেখানে বিশ্বকাপ বয়কটের বাস্তব সম্ভাবনা প্রকাশ্য আলোচনায় এসেছে—এটি ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তাদের সবার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
এএফসির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান ও সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল দেশও।
তবে ফিফা জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবের বিষয়ে সব সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। সংস্থাটির দাবি, “কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না।” ফিফা আরও বলেছে, এমন কোনো বিষয় তারা কখনোই বিবেচনা করবে না।
ফিফা জানিয়েছে, উয়েফা ও কনকাকাফের কাছ থেকে তারা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের কথা শুনেছে। এর মধ্যে কনকাকাফের ৪১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনই ফিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। তবে ফিফার দাবি, কিছু ভুল সংবাদ প্রতিবেদনের কারণে তাদের পরিকল্পনা নিয়ে নির্ধারিত পরামর্শ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
ফিফা আরও বলেছে, তারা প্রকাশ্যে উঠে আসা উদ্বেগ ও মতামতকে সম্মান করে এবং একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরামর্শ প্রক্রিয়ার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন যেন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করেই পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
কী আছে ফিফার প্রস্তাবে?
মঙ্গলবার ঘোষণা করা ফিফার প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংস্থাটি তাদের বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)-এর মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলার ধরে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পারে। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন ২০২৭ সালের শুরুতে এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার করে পেতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চক্রে প্রতিটি সদস্যের তহবিল বরাদ্দ ৮ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে।
এই পরিকল্পনার আওতায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির অংশীদারিত্ব কিনতে পারবে। তবে তারা সংখ্যালঘু অংশীদার হিসেবেই থাকবে বলে জানিয়েছে ফিফা।
উয়েফার কঠোর অবস্থান
ফিফার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে উয়েফা। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রস্তাবটি বহাল থাকলে তাদের কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।
উয়েফার ভাষায়, “বিশ্বকাপকে কোনো বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এর কোনো অংশই কখনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।”
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো অবশ্য এই উদ্যোগকে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নকে আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার “সুবর্ণ সুযোগ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন ফিফার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেছেন, বিশ্ব ফুটবলে এমন একটি মডেলের কোনো জায়গা নেই। তার মতে, যাদের প্রধান লক্ষ্য আর্থিক মুনাফা সর্বোচ্চ করা, তাদের প্রত্যাশা দিয়ে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে না।
সেফেরিন আরও বলেন, জাতীয় ফুটবল সংস্থা, লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ কখনোই বিনিয়োগকারীদের আর্থিক লাভের নিচে চলে যেতে পারে না। আর্থিক লাভের জন্য ফুটবল তার ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও উয়েফার অবস্থানকে সমর্থন করে ফুটবলের অখণ্ডতা রক্ষায় তাদের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।
মাঠের বাইরেও সমালোচনা
ফিফার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কে যোগ দিয়েছেন চেলসির স্প্যানিশ কোচ জাবি আলোনসোও। ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের সদস্য আলোনসো বলেন, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ খুব ভালো হয়েছে এবং কিছু বিষয় একইভাবে ধরে রাখা উচিত। ফুটবলের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে “ফিফার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ভুল ব্যক্তি” হিসেবে মন্তব্য করেছেন এবং প্রস্তাবটিকে “আপত্তিকর” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সবশেষে, ফিফার অন্যতম বড় স্পনসর একটি বিয়ার ব্র্যান্ডও ব্যঙ্গাত্মক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিতর্কে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছে। বিশ্বকাপের ম্যাচে খেলোয়াড়দের জন্য নির্ধারিত বিরতির প্রসঙ্গ টেনে বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছে—“জিয়ান্নি, হাইড্রেশন ব্রেক নেওয়ার সময় হয়েছে? সম্ভবত।”
ফলে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে ফিফার সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটবল প্রশাসনের বিরোধ এখন আরও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। একদিকে ফিফা পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফের বিরোধিতা এবং ফিফার শীর্ষ পর্যায়ের একজন উপদেষ্টার পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন ফিফার এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়, নাকি আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলের তীব্র বিরোধিতায় তা থেকে সরে আসতে হয়—সেদিকেই তাকিয়ে ফুটবল বিশ্ব।


