টিম সিফার্টের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ইতিহাস গড়ল ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস। লর্ডসে দ্য হান্ড্রেডের পুরুষ বিভাগের ফাইনালে ট্রেন্ট রকেটসকে ৫ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস।
ফাইনালে ট্রেন্ট রকেটসের দেওয়া ১৫৯ রানের লক্ষ্য ২ বল হাতে রেখে ৫ উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে যায় সুপার জায়ান্টস। জয়ের নায়ক নিউজিল্যান্ডের টিম সিফার্ট। মাত্র ৩৮ বলে ৭২ রানের বিধ্বংসী ইনিংসে তিনি মেরেছেন ৭টি ছক্কা। তার ঝড়ো ব্যাটিংয়েই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ম্যানচেস্টারের হাতে।
ট্রেন্ট রকেটস প্রথমে ব্যাট করে ১০০ বলে ৮ উইকেটে তোলে ১৫৮ রান। দলের হয়ে অ্যানিউরিন ডোনাল্ড ১৯ বলে ৩৮, লুইস গ্রেগরি ১৬ বলে ৩২ এবং বেন ডাকেট ৩১ রান করেন। ম্যানচেস্টারের হয়ে আফগানিস্তানের লেগস্পিনার নূর আহমেদ নেন ৩ উইকেট। পরে ১৫৯ রানের লক্ষ্যে নেমে সিফার্টের ব্যাটে ভর করে ৫ উইকেটের সহজ জয় পায় সুপার জায়ান্টস। ট্রেন্ট রকেটসের হয়ে মোহাম্মদ আমির ৩ উইকেট নিলেও দলকে জেতাতে পারেননি।
তিন ম্যাচ হারের পর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন
ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টসের শিরোপা জয় এবারের মৌসুমের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। কেননা গ্রুপ পর্বে টানা তিন ম্যাচ হেরে তারা বাদ পড়ার দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে শেষ পর্যন্ত শিরোপা ঘরে তোলে তারা।
এই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের সময় দলের নেতৃত্বেও আসে পরিবর্তন। ব্যক্তিগত কারণে এইডেন মার্করাম দেশে ফিরে যাওয়ার পর অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নেন জস বাটলার। এরপর বাটলারের নেতৃত্বেই বদলে যায় সুপার জায়ান্টসের ভাগ্য।
পুরো মৌসুমে দুর্দান্ত ছিলেন সিফার্টও। চারটি হাফসেঞ্চুরি করেছেন তিনি এবং মৌসুমের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে টুর্নামেন্ট শেষ করেন।
ওয়াল্টার-সিফার্ট জুটিই বদলে দেয় ম্যানচেস্টারের ভাগ্য
এইডেন মার্করামের অনুপস্থিতিতে ওপেনিংয়ে এসেক্সের পল ওয়াল্টারকে সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটিও ম্যানচেস্টারের জন্য বড় সাফল্য হয়ে আসে।
রকেটসের বিপক্ষে ফাইনালেও দ্রুত রান করেন ওয়াল্টার। মাত্র ১৪ বলে ২২ রান করেন তিনি। পাঁচ ইনিংসে তার মোট রান দাঁড়ায় ২৪৭, আর স্ট্রাইক রেট ছিল দুর্দান্ত ১৭৯।
বাঁহাতি ওয়াল্টার ও ডানহাতি সিফার্টের ওপেনিং জুটি পুরো টুর্নামেন্টেই প্রতিপক্ষের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে। বাটলারও স্বীকার করেছেন, এই জুটি ম্যানচেস্টারের শিরোপা জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ফাইনালে দু’জন মিলে মাত্র ৩১ বলে ৬৬ রান যোগ করেন। সিফার্ট ইনিংসের প্রথম বলেই কভার দিয়ে চার মারেন। চতুর্থ ওভারেই লেগ সাইড দিয়ে হাঁকান ছক্কা। এরপর বাটলারের সঙ্গে ছক্কার লড়াইয়ে নামেন তিনি।
বাটলার ৩৪ রানে লং-অফে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেও সিফার্ট থামেননি। পরে লিউস ডু প্লয়ের সঙ্গে জুটি গড়ে দলকে জয়ের আরও কাছে নিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ আমিরের ওয়াইড ইয়র্কারে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন সিফার্ট। তার ৭২ রান দ্য হান্ড্রেড ফাইনালের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
শেষ মুহূর্তে ম্যাচ জমিয়ে তুলেছিল সুপার জায়ান্টস
সিফার্ট আউট হওয়ার সময় ম্যানচেস্টারের প্রয়োজন ছিল ২২ বলে ২৩ রান। জয় তখন প্রায় নিশ্চিতই মনে হচ্ছিল। কিন্তু এরপর নাটক জমে ওঠে।
আমিরের বলে ডিপ মিডউইকেটে ক্যাচ দেন হেনরিখ ক্লাসেন। এরপর মাইকেল ব্রেসওয়েলকে এলবিডব্লিউ করেন আমির।
অন্যদিকে বেন স্যান্ডারসনের বলে পরপর দুইবার শট মিস করেন লিয়াম ডসন। তবে শেষ পর্যন্ত ডিপ মিডউইকেটের ওপর দিয়ে বল সীমানা পার করে দেন তিনি। দুই বল বাকি থাকতেই ছক্কা মেরে দলের জয় নিশ্চিত করেন ডসন।
নূর আহমেদের স্পিনে বিপর্যস্ত রকেটস
এর আগে ট্রেন্ট রকেটসের ইনিংস শুরু হয়েছিল ভালোভাবেই। পাওয়ারপ্লেতে কোনো উইকেট না হারিয়ে তারা তুলেছিল ৩৩ রান। অবশ্য ভাগ্যও সহায় ছিল রকেটসের। লিয়াম ডসনের বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বেন ডাকেটের ক্যাচ শর্ট থার্ডম্যানে ফেলেন জশ টাং।

কিন্তু নূর আহমেদ বোলিংয়ে আসতেই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে যায়।
টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ সময় খুব বেশি আলো ছড়াতে পারেননি নূর। গ্রুপ পর্বের আট ম্যাচ এবং এলিমিনেটর মিলিয়ে তার উইকেট ছিল মাত্র পাঁচটি। কিন্তু ফাইনালে নিজের সেরা পারফরম্যান্সটাই তুলে রাখেন আফগান স্পিনার।
প্রথম বলেই ফিন অ্যালেন লং-অফে ক্যাচ দেন। চতুর্থ বলে বেন ডাকেটের ভেতরের এজ ও প্যাডে লেগে বল চলে যায় বাটলারের হাতে। মাত্র চার বলের মধ্যে দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে রকেটসকে বড় ধাক্কা দেন নূর।
ডোনাল্ডের পাল্টা আক্রমণ
তবে তিন নম্বরে নেমে অ্যানিউরিন ডোনাল্ড ব্যাট হাতে নূরকে পাল্টা আক্রমণ করেন। প্রথম বলেই ল্যাপ-সুইপে চার মারেন তিনি। এরপর নূর টানা দুই ওভার করতে এলে ছক্কা ও চার মেরে তার ওপর চাপ তৈরি করেন।
ডোনাল্ড পরে সনি বেকারের বলেও আরও দুটি বাউন্ডারি মারেন। কিন্তু মাঝের দিকে একটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে সাম বিলিংস রানআউট হন। বল হাতে ডসন স্টাম্প ভাঙতে সক্ষম হন।
এরপর আবার আঘাত হানেন নূর। টিম ডেভিডের ব্যাট থেকে গুগলি এজ হয়ে বাটলারের হাতে যায়। পুরো মৌসুমে টিম ডেভিডের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। ৩ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডে তাকে দলে নেওয়া হলেও মৌসুমে তার রান ছিল মাত্র ৯০।
এরপর ডসনকে আক্রমণ করতে গিয়ে নিজেই ইয়র্কারে উইকেট হারান ডোনাল্ড। মাত্র ১৯ বলে ৩৮ রান করেন তিনি। ফলে মাত্র ৩২ বলের মধ্যবর্তী এক পর্যায়ে ৪৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে রকেটস।
গ্রেগরি-স্যান্টনারের লড়াই
রকেটসের ইনিংসকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার মতো জায়গায় নিয়ে যান লুইস গ্রেগরি। গত মৌসুমে তিনি ম্যানচেস্টারের হয়ে খেলেছিলেন, তখন দলের নাম ছিল ম্যানচেস্টার অরিজিনালস। তবে দ্য হান্ড্রেডের শুরু থেকেই রকেটসের সঙ্গে ছিলেন এবং ২০২২ সালে দলটির অধিনায়ক হিসেবে শিরোপাও জিতেছিলেন।
ফাইনালে ম্যানচেস্টারের বিপক্ষে তিনি আবারও গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। মিচেল স্যান্টনারের সঙ্গে মাত্র ২৫ বলে ৪৬ রানের জুটি গড়েন গ্রেগরি।
নূর আহমেদের পরপর দুটি বলে বাউন্ডারি মেরে তার বোলিংয়ের হিসাবও কিছুটা খারাপ করে দেন। এরপর লেগ সাইডে টানা তিনটি ছক্কা মারেন গ্রেগরি।
শেষ পর্যন্ত টাংয়ের ধীরগতির বলে লং-অনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। তার ব্যাট থেকে আসে ১৬ বলে ৩২ রান।
এরপর স্যান্টনার ও ক্রেইগ ওভারটন শেষ দিকে গুরুত্বপূর্ণ বাউন্ডারি মেরে রকেটসকে দেড়শ রানের গণ্ডি পার করান। ইনিংসের শেষ দুই বলে উইকেট নেন সনি বেকার। তারপরও ১০০ বলে ১৫৮ রানকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্কোরই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু সিফার্টের ঝড়ো ব্যাটিংয়ের সামনে শেষ পর্যন্ত সেই স্কোর যথেষ্ট হয়নি।
ম্যানচেস্টারের ইতিহাসে প্রথম হান্ড্রেড শিরোপা
এই জয়ের মাধ্যমে দ্য হান্ড্রেডে প্রথমবারের মতো পুরুষ কিংবা নারী, ম্যানচেস্টারের কোনো দলই চ্যাম্পিয়ন হলো। একই সঙ্গে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস ফ্র্যাঞ্চাইজির দীর্ঘ শিরোপা-খরাও কাটল।
ফ্র্যাঞ্চাইজিটির ট্রফির অপেক্ষা ছিল সাতটি আইপিএল মৌসুম ও চারটি এসএ২০ মৌসুমজুড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল লর্ডসে।
আর পুরো যাত্রার শেষ অধ্যায় লিখলেন টিম সিফার্ট। টানা তিন ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হওয়া দলটিই শেষ পর্যন্ত টানা পাঁচ জয়ে প্রথমবারের মতো দ্য হান্ড্রেডের চ্যাম্পিয়ন হলো। যেখানে সিফার্টের ৩৮ বলে ৭২ রানের ঝড়ো ইনিংস এবং নূর আহমেদের ৩ উইকেট বড় অবদান রেখেছে।


