দুই হাত নেই, পা-ই ভরসা; এশিয়ান প্যারা গেমসে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নেপালের হরকা মান ঘার্তির

দুই হাত নেই, তাই বলে থেমে থাকেননি নেপালের ২১ বছর বয়সী প্যারা সাঁতারু হরকা মান ঘার্তি। হাতের বদলে শক্তিশালী দুই পা আর শরীরের ওপরের অংশের জোরে পানিতে ছুটে চলেছেন তিনি। এবার তার লক্ষ্য জাপানে এশিয়ান প্যারা গেমসে পদক জিতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন ইতিহাস তৈরি করা।

প্রতিদিন সকালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি সুইমিংপুলে নেমে পড়েন ঘার্তি। মাত্র ২৫ মিটারের পুলটিই তখন তার কাছে হয়ে ওঠে বিশাল এক স্বপ্নের মঞ্চ। অন্য সাঁতারুরা যেখানে হাতের দীর্ঘ স্ট্রোকের ওপর নির্ভর করেন, সেখানে ঘার্তিকে পুরোপুরি ভরসা করতে হয় পা ও শরীরের শক্তির ওপর।

অক্টোবর মাসে জাপানে অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ান প্যারা গেমস। সেখানে নেপালের প্রতিনিধিত্ব করবেন চারজন প্যারা সাঁতারু। তাদেরই একজন ঘার্তি। দেশের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কঠোর অনুশীলন করে বড় মঞ্চে পদকের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

ঘার্তির কাছে এটি শুধুই আশা নয়, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য। প্রতিযোগিতায় একটি পদক জিততে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিতে চান তিনি।

তবে তার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না।

প্রায় এক দশক আগে পশ্চিম নেপালের বাগলুং জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন ঘার্তি। সেই দুর্ঘটনায় চিরতরে হারান দুই হাত।

যে ঘটনা তার জীবনের সব স্বপ্ন থামিয়ে দিতে পারত, সেটিই যেন তাকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বাধা না বানিয়ে নতুন করে জীবন সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

২০২০ সালে প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে যাত্রা শুরু করেন ঘার্তি। শুরুতে ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ধীরে ধীরে সাঁতার হয়ে ওঠে তার ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের পথ।

কাঠমান্ডুর যে হোস্টেলে থাকেন ঘার্তি, সেখানে তার বিছানার ওপর সাজানো রয়েছে একের পর এক পদক। প্রতিটি পদক যেন তার লড়াই ও সাফল্যের গল্প বলে।

অনুশীলনের সময় পানিতে শরীরের অবস্থান ও কৌশলের দিকে বিশেষ নজর দেন তিনি। কিন্তু প্রতিযোগিতা শুরু হলে কৌশলের হিসাব যেন ভুলে যান। তখন তার একমাত্র চিন্তা, গতি।

ঘার্তির ভাষায়, রেসের সময় শরীরের ভারসাম্য বা কৌশল নিয়ে বেশি ভাবেন না। যতটা সম্ভব জোরে সাঁতার কাটেন। গতি বাড়াতে পা দিয়ে আরও শক্তি প্রয়োগ করেন।

তার এই পায়ের শক্তিই মুগ্ধ করেছে কোচকেও।

ঘার্তির কোচ শুভা শ্রেষ্ঠার মতে, তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো যে জিনিসটি তিনি হারিয়েছেন সেটি নয়, বরং যা নিজের মধ্যে তৈরি করেছেন। দুই হাত না থাকলেও ঘার্তি দুই পায়ের অসাধারণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন।

কোচের ভাষায়, “তার পা-ই তার স্তম্ভ, আর তার পা দুটো ভীষণ শক্তিশালী।”

গত বছর জাপানে অনুষ্ঠিত প্যারা সুইমিং ওয়ার্ল্ড সিরিজে ঘার্তির পারফরম্যান্স তাকে এশিয়ান প্যারা গেমসে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা এনে দেয়। নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতার সময় পূরণ করে এবার এশিয়ার বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

জাপানে S5 শ্রেণিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ঘার্তি। এর মধ্যে রয়েছে পুরুষদের ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল। এই ইভেন্টে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ চীনের গুও জিনচেং। S5 শ্রেণিতে পুরুষদের ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে গুওয়ের বিশ্বরেকর্ড ২৯.৩৩ সেকেন্ড।

তবে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় লড়াই করার আগে নেপালের অ্যাথলেটদের আরও একটি বড় বাধা মোকাবিলা করতে হয় সীমিত সুযোগ-সুবিধা।

আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় নেপালের ক্রীড়া অবকাঠামো এখনও বেশ সীমিত। প্যারা অ্যাথলেটদের জন্য অর্থায়ন কম, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সুবিধা অপ্রতুল এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগও খুব বেশি নয়।

তারপরও ঘার্তির স্বপ্ন বড়।

এশিয়ান প্যারা গেমসে নেপালের পদক জয়ের ইতিহাসও খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। এখন পর্যন্ত দেশটির মাত্র একজন অ্যাথলেট এই আসর থেকে পদক জিতেছেন। তায়কোয়ান্দো অ্যাথলেট পালেশা গোবর্ধন আগের আসরে ব্রোঞ্জ জেতার পর প্যারালিম্পিকেও পদক অর্জন করেছেন।

ফলে বড় আন্তর্জাতিক আসরে নেপালের অ্যাথলেটরা অনেক সময় অংশগ্রহণের মধ্যেই সাফল্য খুঁজে নেন। কিন্তু ঘার্তির স্বপ্ন সেই প্রচলিত ধারণা বদলে দেওয়া।

নেপাল ন্যাশনাল প্যারা সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সরোজ শ্রেষ্ঠার মতে, নেপালের অ্যাথলেটরা শুধু অংশ নিতে যায়, এমন ধারণা বদলাতে চান তারা। ঘার্তিকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন আরও বড়। এমন একটি সাফল্য চান, যা অনেক সক্ষম অ্যাথলেটও এখনো অর্জন করতে পারেননি।

তবে ঘার্তির স্বপ্ন শুধু পদক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়।

সম্প্রতি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছেন তিনি। এবার কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। দুই হাত না থাকলেও পায়ের আঙুল ব্যবহার করেই কম্পিউটার পরিচালনা করেন ঘার্তি।

সাঁতার তার কাছে নিজের জীবন বদলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করেন, বড় কোনো রেকর্ড গড়তে পারলে তার জীবনের সুযোগও আরও বাড়বে।

আর তখনই অন্যদের অনুপ্রাণিত করার মতো জায়গায় নিজেকে দেখতে চান ঘার্তি।

দুই হাত হারিয়েও থেমে যাননি। বরং দুই পায়ের শক্তিকে সম্বল করে এগিয়ে চলেছেন। এবার জাপানে এশিয়ার সেরা প্যারা সাঁতারুদের সঙ্গে লড়াই করে নেপালের পতাকাকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার স্বপ্ন হরকা মান ঘার্তির।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles