পুনর্বাসন থেকে প্যারা সাঁতারের চ্যাম্পিয়ন, ১৬ বছরেই মালয়েশিয়ার নতুন তারকা আসিইল রাজিন

চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু হয়েছিল সাঁতার। উদ্দেশ্য ছিল শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করা। কিন্তু সেই পুনর্বাসনের সাঁতারই ১৬ বছর বয়সী আসিইল রাজিন রাজমানকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার মঞ্চে। এখন মালয়েশিয়ার হয়ে একের পর এক প্রতিযোগিতায় পদক জিতছেন কুয়ালালামপুরের এই তরুণ প্যারা-সাঁতারু।

ছোটবেলায় শেখার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে আসিইলকে। তার চিকিৎসক মনে করেছিলেন, সাঁতার তার বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই পুনর্বাসনের অংশ হিসেবেই পানিতে নামা শুরু করেন তিনি।

তখন কি আর জানতেন, সেই সাঁতারই একদিন তার জীবনের অন্যতম বড় পরিচয় হয়ে উঠবে?

ধীরে ধীরে সাঁতারের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় আসিইলের। থেরাপি থেকে শুরু হওয়া পথটা পরিণত হয় প্রতিযোগিতামূলক খেলায়। একসময় দেশের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান তিনি। এরপর সাফল্যও আসতে থাকে দ্রুত।

১৬ বছর বয়সী প্যারা সাঁতারু আসিইলের কাছে সাঁতার শুধু খেলা নয়, এটি তার গভীর ভালোবাসা ও আবেগ।

২০২৪ সালের প্যারা সুকমায় নারীদের S14 ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে সোনা জিতে নিজের প্রতিভার জানান দেন আসিইল। সেখানে তার সময় ছিল ১ মিনিট ২৩ দশমিক ৩৫ সেকেন্ড। এই পারফরম্যান্সে আগের গেমস রেকর্ডও ভেঙে দেন তিনি। আগের রেকর্ড ছিল ১ মিনিট ২৬ দশমিক ২৯ সেকেন্ড।

এরপর আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজেকে মেলে ধরেন এই তরুণী। ২০২৫ এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস অনুষ্ঠিত হয় দুবাইয়ে। সেখানে মালয়েশিয়ার হয়ে অংশ নিয়ে পদক জেতেন আসিইল। একই বছর থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আসিয়ান প্যারা গেমসেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।

অল্প বয়সেই ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিও পেয়েছেন আসিইল। ২০২৫ সালের কেপিএম-মিএসএসএম-মিলো ক্রীড়া পুরস্কার অনুষ্ঠানে তাকে দেওয়া হয় সেরা নারী প্যারা ক্রীড়াবিদের পুরস্কার

তবে পদক জেতাই আসিইলের কাছে সবকিছু নয়। নিজের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন নিজেকেই। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় আগের পারফরম্যান্সকে ছাড়িয়ে যাওয়াই তার মূল লক্ষ্য।

দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৫ এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে আসিইল রাজিন রাজমান।

তার ভাষায়, সাঁতারে সবচেয়ে ভালো লাগে এই বিষয়টি, এখানে সবসময় নিজের জন্য নতুন একটি লক্ষ্য তৈরি করা যায়। পদক অবশ্যই আনন্দ দেয়, কিন্তু নিজের সেরা সময়কে উন্নত করা এবং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠাই তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

আসিইল বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা বা এস১৪ শ্রেণিতে প্যারা সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।। পাশাপাশি সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় একটি সাধারণ স্কুলে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে তার প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাসহায়তা দেওয়া হয়।

একজন প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারু হিসেবে তার দৈনন্দিন জীবনও বেশ কঠিন। প্রায় প্রতিদিনই পুলে অনুশীলন করতে হয়। শুধু সাঁতার নয়, সঙ্গে থাকে শক্তি ও ফিটনেস বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ।

পুলের বাইরেও রয়েছে কঠোর নিয়ম। খাবারের মান, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম, সবকিছুর দিকে নজর রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সহায়তা পান বাবা-মায়ের কাছ থেকে।

আসিইলের মতে, অ্যাথলেট হওয়া মানে শুধু পুলে কঠোর পরিশ্রম করা নয়। অনুশীলনের বাইরে নিজের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবেই প্রতিযোগিতায় নিজের সেরা পারফরম্যান্স দেওয়া সম্ভব।

সাঁতার তার জীবনে শুধু সাফল্যই এনে দেয়নি, বদলে দিয়েছে আত্মবিশ্বাসও। একসময় নিজেকে নিয়ে ভয় ও অনিশ্চয়তায় ভুগতেন আসিইল। কিন্তু খেলাধুলা তাকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।

২০২৫ সালের আনুগেরাহ সুকান কেপিএম-এমএসএসএম-মিলো অনুষ্ঠানে ‘আনুগেরাহ পুতেরি প্যারা’ পুরস্কার পাওয়ার পর বাবা-মা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আসিইল রাজিন রাজমান।

তবে পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। ভালো ফল না এলে হতাশা তৈরি হয়, অনুশীলনে খারাপ দিন আসে। এসব পরিস্থিতি সামলানোই আসিইলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন তিনি জানেন, প্রতিদিন ভালো যাবে না। ব্যর্থতা এবং পিছিয়ে পড়াও একজন অ্যাথলেটের যাত্রার অংশ। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো এবং নতুন করে চেষ্টা করাটাই আসল।

এই মানসিক শক্তির পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার বাবা-মা। ছোটবেলা থেকে তারা মেয়ের পাশে থেকেছেন, তার স্বপ্ন পূরণে নানা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আসিইলের সাফল্যের পেছনে তাই বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন তিনি।

কোচদের প্রতিও কৃতজ্ঞ এই তরুণ সাঁতারু। কঠিন সময়ে তাকে উৎসাহ দেওয়া, নিয়মের মধ্যে রাখা এবং প্রতিদিন আগের চেয়ে ভালো করার জন্য চাপ দেওয়ার কৃতিত্ব দেন কোচদের।

অন্য প্যারা অ্যাথলেটরাও আসিইলের অনুপ্রেরণা। তাদের সাফল্য দেখে তার বিশ্বাস আরও শক্ত হয়েছে, শারীরিক বা অন্য কোনো সীমাবদ্ধতা সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।

মালয়েশিয়ার প্যারা স্পোর্টস নিয়েও ইতিবাচক আসিইল। তার মতে, গত কয়েক বছরে প্যারা অ্যাথলেটরা আগের তুলনায় বেশি পরিচিতি ও স্বীকৃতি পাচ্ছেন। তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না।

তরুণ প্যারা অ্যাথলেটদের জন্য আরও সুযোগ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে প্রতিভাবান অনেক শিশু-কিশোর এখনো পর্যাপ্ত সুযোগ বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে খেলাধুলায় আসতে পারছে না বলেও মনে করেন আসিইল।

মিলোর মতো ক্রীড়া উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার প্রত্যাশাও তার।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় স্বপ্ন রয়েছে আসিইলের। প্রতিটি ইভেন্টে সময় আরও কমানো, নিজের পারফরম্যান্স উন্নত করা এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে চান তিনি।

আর নতুন প্রজন্মের অ্যাথলেটদের জন্য তার বার্তা খুবই সহজ, শুরু করতে ভয় পেও না, নিয়ম মেনে অনুশীলন করো এবং সহজে হাল ছেড়ো না।

কারণ প্রথম দিনেই কেউ সেরা হয় না। পথে ক্লান্তি আসবে, হতাশা আসবে, প্রত্যাশামতো ফলও নাও আসতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ব্যর্থতা, প্রতিটি ছোট অর্জন এবং প্রতিটি কঠিন অভিজ্ঞতাই একজন অ্যাথলেটকে আরও পরিণত করে।

পুনর্বাসনের জন্য পানিতে নামা সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজ মালয়েশিয়ার প্যারা সাঁতার এর সম্ভাবনাময় তারকা। ১৬ বছর বয়সে আসিইল রাজিনের গল্প তাই শুধু পদক জয়ের গল্প নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় আর সীমাবদ্ধতাকে জয় করার গল্প।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles