দুই কোচের হাতাহাতি, ৯৯৯ – এ কল করে পুলিশ ডাকলেন বাংলাদেশের ব্রিটিশ কোচ

এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ বাছাইপর্ব সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির সময় বাংলাদেশ যুব ফুটবল দলে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। প্রধান কোচ জেরার্ড জোন্স ও সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে বিরোধ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এমনকি দুই কোচের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কিতে গড়ালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ ডাকেন ব্রিটিশ কোচ জোন্স।

আগামী ৩১ আগস্ট উজবেকিস্তানে শুরু হবে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্ব। যুব এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২৭ আগস্ট দেশ ছাড়ার কথা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের। এর ঠিক আগে দলের কোচিং স্টাফদের মধ্যে এমন বিরোধ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার ঢাকার একটি টিম হোটেলে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেরার্ড জোন্স ও সহকারী কোচ মিশুর মধ্যে প্রথমে কথাবার্তা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে দুজনের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হয়েছে বলে দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।

এরপরই জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন জোন্স। খবর পেয়ে পুলিশ রাজধানীর হোটেল হলিডে ইনে যায়। তবে পুলিশ পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আর বড় ধরনের সংঘাতে গড়ায়নি। ঘটনাটি নিয়ে এখনো দুই কোচের কারও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় দলের ক্যাম্পে পুলিশ যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ফুটবলে খুব একটা দেখা যায় না। তাই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে এমন ঘটনা নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন।

দলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ডেভেলপমেন্ট কমিটির সদস্য ও ম্যানেজার সামিদ কাশেম জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। তার আশা, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দলের খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করাই তাদের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

তবে দলের ম্যানেজারের ক্যাম্পে নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা ক্যাম্পের বড় একটি অংশ অনুষ্ঠিত হয়েছে যশোরের শামসুল হুদা একাডেমিতে। ম্যানেজার জানিয়েছেন, ঢাকার বাইরে ক্যাম্প হওয়ায় সবসময় সরাসরি উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি। তবে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে দলের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি তার।

জেরার্ড জোন্সকে নিয়ে এর আগেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। কোচিংয়ের দিক থেকে তার যোগ্যতা নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার আচরণ নিয়ে একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। কিছুদিন আগে বেতনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েও আলোচনায় এসেছিলেন এই ব্রিটিশ কোচ।

জানা গেছে, বেতন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ও পরিবারের দুর্ভোগ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জোন্স। বিষয়টি নিয়ে বাফুফের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

শুধু মিশুর সঙ্গে নয়, এর আগে যশোরের ক্যাম্পেও কোচিং স্টাফের অন্য সদস্যদের সঙ্গে জোন্সের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে দলের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভাষ্য। স্প্যানিশ গোলরক্ষক কোচের সঙ্গেও তার মতবিরোধের কথা জানা গেছে। একপর্যায়ে ওই কোচ ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরে অবশ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

দলের সঙ্গে থাকা একজন চিকিৎসকও জোন্সের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে যশোর ক্যাম্প থেকে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে জোন্সের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সহকারী কোচ মিশু আসন্ন উজবেকিস্তান সফরে দলের সঙ্গে থাকবেন কি না। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিশুকে সফরে না নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন জোন্স। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ব্রিটিশ কোচ মার্ক কক্সের নিয়োগ নিয়েও কোচিং সনদ ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এবার জেরার্ড জোন্সের কোচিং যোগ্যতা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও তার আচরণ ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

জোন্সের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডেভেলপমেন্ট কমিটির সদস্য সামিদ কাশেম। তার ব্যাখ্যা, কোচ বাছাইয়ের সময় প্রার্থীদের সিভি, যোগ্যতা এবং সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে কাউকে সরাসরি কাজের সুযোগ না দিলে তার আচরণ বা কর্মপরিবেশে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবেন, সেটি পুরোপুরি বোঝা কঠিন।

জেরার্ড জোন্সের সঙ্গে বাফুফের চুক্তির মেয়াদ দুই বছর। তবে উজবেকিস্তানে অনুষ্ঠেয় বাছাইপর্ব শেষ হওয়ার পর তাকে আর দায়িত্বে রাখার বিষয়ে ফেডারেশনের আগ্রহ নেই বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে কোচ নিজেও বাংলাদেশে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে নানা পক্ষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, জোন্স হয়তো দ্রুত বাংলাদেশ ছাড়ার চেষ্টা করতে পারেন। এমনকি চুক্তির আর্থিক বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যাওয়ার সম্ভাবনাও কেউ কেউ দেখছেন। তবে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাঠের বাইরে কোচিং স্টাফদের এই দ্বন্দ্ব যেন খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে প্রভাব না ফেলে। সামনে অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাছাইপর্ব। সেখানে বাংলাদেশের লক্ষ্য যুব এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া।

অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের মাত্র কয়েক দিন আগে দলের ভেতরে কোচদের বিরোধ, ধাক্কাধাক্কি এবং পুলিশ ডাকার ঘটনা তৈরি করেছে বিব্রতকর পরিস্থিতি। এখন বাফুফের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, দ্রুত কোচিং স্টাফের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে খেলোয়াড়দের মনোযোগ পুরোপুরি মাঠের খেলায় ফিরিয়ে আনা।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles