ফিফার নির্বাচনে জিততে ইনফান্তিানোর নতুন কৌশল

নির্বাচনে জিততে নতুন কৌশল ইনফান্তিানো। ‘দুর্বল ফেডারেশনগুলোর চ্যাম্পিয়ন’-পুনর্নির্বাচনের ইশতেহারে নিজের পরিচয় এভাবেই তুলে ধরেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আগামী মার্চের নির্বাচনে আবারও সভাপতি হওয়ার লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত তিনি। তবে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার সভাপতি আলেকসান্দের চেফেরিন জানিয়েছেন, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। তবে ইনফান্তিনোর একজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবেন বলে মনে করছেন তিনি।

ফিফা টুর্নামেন্টগুলোর স্বত্ব নিয়ে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সেটির ২০ শতাংশ ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব সম্প্রতি বাতিল করেছেন ইনফান্তিনো। সেই বিতর্কের এক মাস পরও বিশ্ব ফুটবলের শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাঁর সঙ্গে ইউরোপের বিরোধ কমেনি। বরং ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে।

উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল কনফেডারেশন (কনক্যাকাফ)-এর জোটগুলো ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চেফেরিনও একাধিকবার ফিফা সভাপতির পদত্যাগ দাবি করেছেন।

‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিক্স: লিডিং’ পডকাস্টে চেফেরিন বলেছেন, সামনে তিনি দুটি সম্ভাবনা দেখছেন। তাঁর মতে, ইনফান্তিনো বুঝতে পারেন যে তাঁর প্রয়োজনীয় সমর্থন নেই। আর যদি তিনি মার্চের নির্বাচনে অংশ নেন, তাহলে তাঁর বিপরীতে একজন প্রার্থী দাঁড়াতে পারেন।

চেফেরিন বলেন, ‘দুটি বিকল্প আছে। একটি হলো, তিনি বুঝতে পারবেন যে তাঁর সমর্থন নেই। আর এই সমর্থন শুধু ভোটারদের রাজনৈতিক সমর্থন নয়; ফুটবল কমিউনিটি, সমর্থক, ফুটবলার, সাবেক ফুটবলার ও কোচদের সমর্থনও এর সঙ্গে জড়িত।’

তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, তিনি মার্চের নির্বাচনে যাবেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, তাঁর বিরুদ্ধে একজন প্রার্থী থাকবেন। যদিও আমি এখনো জানি না, সেই প্রার্থী কে।’

চেফেরিনের মন্তব্যের বিষয়ে ইনফান্তিনো ও ফিফার বক্তব্য জানতে চেয়েছে রয়টার্স। এরই মধ্যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী বছরের মার্চের নির্বাচনের আগে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে উয়েফা, এএফসি ও কনক্যাকাফ।

চেফেরিনের দাবি, বিতর্ক শুরু হওয়ার পর থেকে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তাঁর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ফিফা সভাপতির উত্তরসূরি হওয়ার ব্যাপারে তাঁর নিজের কোনো আগ্রহ নেই—এটিকেই নিজের বিশ্বাসযোগ্যতার অন্যতম কারণ মনে করেন তিনি।

ইনফান্তিনোর বাণিজ্যিক পরিকল্পনাকে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের চেয়েও ফুটবলের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করেন চেফেরিন। ২০২১ সালে সুপার লিগের বিরুদ্ধে উয়েফার সফল লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিরোধিতা শুধু ইউরোপের বড় ফুটবল দেশগুলো থেকেই আসেনি।

‘একদিকে ছিল ইংল্যান্ড, জার্মানি-যারা এটা চায় না, কারণ এই অর্থ তাদের জন্য খুব বড় নয়। অন্যদিকে ছিল সান মারিনো, সাইপ্রাস, লিখটেনস্টাইন… তারাও বলেছে, আমরা বিক্রির জন্য নই,’ বলেন চেফেরিন।

২০১৬ সাল থেকে ফিফা সভাপতির দায়িত্বে থাকা ইনফান্তিনোর অবশ্য সরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং ২০৩১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকতে পুনর্নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য তুলনামূলক কম সচ্ছল ফুটবল ফেডারেশনগুলোর সমর্থনের ওপরই ভরসা করছেন তিনি।

সম্প্রতি ডমিনিকান রিপাবলিকে ক্যারিবিয়ান ফুটবল ইউনিয়নের (সিএফইউ) সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ফিফার প্রকাশিত এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো বলেন, ধনী ও দরিদ্র ফুটবল ফেডারেশনগুলোর ব্যবধান কমানোই ফিফার অন্যতম দায়িত্ব।

ইনফান্তিনোর ভাষায়, ‘আমরা বিশ্বের ২১১টি দেশের প্রতিটিতে ফুটবলের প্রসার ঘটাতে চাই। সবার জন্য বিনিয়োগ ও সুযোগ তৈরি করতে হবে আমাদের। বিশ্ব ফুটবলের জন্য সুযোগ, প্রবেশাধিকার ও সম্পদ খুঁজে বের করে তা সবার মধ্যে পৌঁছে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু দেশের উন্নতির প্রয়োজন নেই এবং তারা সেটি চায়ও না। কিন্তু বড় দেশগুলোর সঙ্গে বাকিদের যে ব্যবধান, আমাদের তা কমাতে হবে। গত ১০ বছর ধরে, এমনকি গত ১০ সপ্তাহেও আমরা সেটাই করার চেষ্টা করেছি। আগামী বছরগুলোতেও আমরা তা করে যাব।’

দরিদ্র ফুটবল দেশগুলোর উন্নয়নে ইউরোপ বাধা দিচ্ছে-ইনফান্তিনোর এমন বক্তব্য অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন চেফেরিন। উয়েফাকে সুবিধাভোগী অভিজাতদের সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেন তিনি।

চেফেরিন বলেন, ‘আমি যা শুনি, তা হলো-তারা এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন অহংকারী ইউরোপ আমাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাকে (ইনফান্তিনো) কেউ মনে করিয়ে দেওয়া উচিত যে, তিনিও একজন ইউরোপীয়। তাঁর প্রতি উয়েফার সমর্থন ছিল, যা তিনি ভুলে গেছেন।’

বিতর্কের মধ্যেই ফিফার ছয় নর্ডিক সদস্য-ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও ফ্যারো আইল্যান্ডস-রোববার হেলসিঙ্কিতে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে তারা ইনফান্তিনোর পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে।

আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক জোটগুলোর সমর্থন পাওয়া ইনফান্তিনো অবশ্য কনফেডারেশনগুলোর বিরোধিতা পাশ কাটিয়ে সরাসরি সদস্যদেশগুলোর কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। ডমিনিকান রিপাবলিকে গিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডও এরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

সেখানে একটি অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে পাওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনায় সন্তুষ্ট ইনফান্তিনো। ফিফার উন্নয়ন তহবিল থেকে আয়োজিত ওই টুর্নামেন্টকে নিজের নেতৃত্বে ফিফার কাজের বড় উদাহরণ হিসেবেও তুলে ধরেছেন তিনি। যদিও কনক্যাকাফের সভাপতি চেয়েছিলেন, ইনফান্তিনো যেন টুর্নামেন্ট থেকে দূরে থাকেন। তাঁর উপস্থিতিতে মূল আয়োজনের বদলে ফিফা সভাপতিকে ঘিরেই বেশি আলোচনা হতে পারে-এমন আশঙ্কাই ছিল এর পেছনে।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles