কাবাডি, আর্চারি, শুটিং ও ক্রিকেটে পদকের প্রত্যাশা; জাপানে যাচ্ছে ২৬০ সদস্যের বাংলাদেশ দল
জাপানের আইচি-নাগোয়ায় আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে ২০তম এশিয়ান গেমস। মহাদেশের অন্যতম বড় এই ক্রীড়া আসরে এবার ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেবে বাংলাদেশ। পদকের সম্ভাবনা বিবেচনায় কাবাডি, আর্চারি, শুটিং ও ক্রিকেটকে এগিয়ে রাখছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)। পাশাপাশি উশু, জুডো ও কারাতেতেও ভালো ফলের প্রত্যাশা রয়েছে।
এশিয়ান গেমস সামনে রেখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের শেফ দ্য মিশন ও বিওএর সহসভাপতি মেজর ইমরোজ আহমেদ (অব.) এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট কয়েকটি ডিসিপ্লিন থেকে পদকের আশা করছে বাংলাদেশ। তবে প্রতিদিনের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে। সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবারের গেমসে বাংলাদেশের অন্যতম বড় দল যাচ্ছে ক্রিকেট ও হকিতে। পুরুষ ও নারী ক্রিকেট দল মিলিয়ে ৩০ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকবেন ১১ কর্মকর্তা। হকির দুই দলের ৩৬ খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকবেন ৯ কর্মকর্তা। নারী ফুটবল দলে থাকছেন ২৩ খেলোয়াড় ও সাত কর্মকর্তা।
কাবাডিতে পুরুষ ও নারী দল মিলিয়ে খেলোয়াড় ২৪ জন, সঙ্গে থাকবেন ছয় কর্মকর্তা। আর্চারিতে ১২ খেলোয়াড় ও চার কর্মকর্তাসহ ১৬ সদস্যের দল অংশ নেবে। শুটিংয়ে থাকছেন ১২ খেলোয়াড় ও চার কর্মকর্তা। ব্যাডমিন্টনে পাঁচ খেলোয়াড় ও দুই কর্মকর্তা, টেবিল টেনিসে ছয় খেলোয়াড় ও দুই কর্মকর্তা, ভারোত্তোলনে চার খেলোয়াড় ও তিন কর্মকর্তা এবং উশুতে চার খেলোয়াড় ও দুই কর্মকর্তা থাকছেন।
এ ছাড়া সার্ফিংয়ে নারী ও পুরুষ একজন করে খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকবেন একজন কর্মকর্তা। সাঁতারে দুই খেলোয়াড় ও দুই কর্মকর্তা, অ্যাথলেটিকসে দুই খেলোয়াড় ও দুই কর্মকর্তা এবং বক্সিংয়ে দুই খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকবেন তিন কর্মকর্তা।
অ্যাথলেট ভিলেজের বদলে ক্রুজ শিপে আবাসন
এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে সাধারণত একই এলাকায় খেলোয়াড়দের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়, যা ‘অ্যাথলেট ভিলেজ’ নামে পরিচিত। তবে আইচি-নাগোয়ায় আবাসন সংকট থাকায় এবার ভিন্ন পদ্ধতি বেছে নিয়েছে আয়োজকরা। হোটেল, রিসোর্টের পাশাপাশি ক্রুজ শিপেও ক্রীড়াবিদদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আটটি ডিসিপ্লিনের সদস্যরা থাকবেন একটি ক্রুজ শিপে। সেখানে আর্চারি, জিমন্যাস্টিকস, জুডো, কাবাডি, ভারোত্তোলন, রেসলিং, টেবিল টেনিস ও উশুর সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি ডিসিপ্লিনগুলোর জন্য বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। তবে কোন দল ঠিক কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানাবে বিওএ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সীমিত উপস্থিতি
এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৬৫ জন কর্মকর্তা ও অফিসিয়াল অংশ নিতে পারবেন। সমাপনী অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৪৫ জন অ্যাথলেট ও কর্মকর্তার জায়গা।
তবে যেসব অ্যাথলেটের পরদিনই প্রতিযোগিতা রয়েছে, তাদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে না রাখার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। কারণ খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও বিশ্রামকে অগ্রাধিকার দিতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মার্চপাস্টে বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন শুটার আবদুল্লাহ হেল বাকী ও কারাতেকা হুমায়রা আক্তার অন্তরা।
গেমস শুরুর আগেই মাঠে নামবে নারী ফুটবল
এবার বাংলাদেশের দুটি ডিসিপ্লিন এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই প্রতিযোগিতায় নামবে। নারী ফুটবল দলের ম্যাচ রয়েছে ১৪ ও ১৭ সেপ্টেম্বর। তাই দলটি নির্ধারিত সময়ের আগেই জাপানে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল বর্তমানে চীনে প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে নারী ক্রিকেট দল ব্যস্ত রয়েছে এশিয়া কাপ নিয়ে। পুরুষ ক্রিকেটাররাও এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতিতে রয়েছেন। পুরুষ ও নারী হকি দলও চীনে অবস্থান করে প্রস্তুতি ম্যাচের মাধ্যমে নিজেদের ঝালিয়ে নিচ্ছে।
২৬০ সদস্যের কন্টিনজেন্ট
সব মিলিয়ে এবার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ২৬০ সদস্য। এর মধ্যে পুরুষ অ্যাথলেট ৯০ জন এবং নারী অ্যাথলেট ৯৭ জন। দলের সঙ্গে থাকবেন ৬১ জন পুরুষ কর্মকর্তা ও ১২ জন নারী কর্মকর্তা।
তবে বড় কন্টিনজেন্ট নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যেসব ডিসিপ্লিনে পদকের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, সেসব খেলায় এত বড় বহর পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
জবাবে শেফ দ্য মিশন মেজর ইমরোজ আহমেদ বলেন, এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার একমাত্র লক্ষ্য পদক জয় নয়। বড় আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদরা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। অনেক ডিসিপ্লিনে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও এ ধরনের বড় মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ করে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মকর্তা বাছাইয়ে ফেডারেশনের মনোনয়ন
কন্টিনজেন্টে কর্মকর্তাদের সংখ্যা ও নির্বাচন নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ওঠে। বিওএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোচ, ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম দিয়েছে নিজ নিজ ফেডারেশন। বিওএ মূলত মনোনীত কর্মকর্তাদের ন্যূনতম যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি যাচাই করেছে।
ডোপিং ও শৃঙ্খলায় বিশেষ নজর
বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের ঘিরে ডোপিং কিংবা শৃঙ্খলাজনিত কোনো ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়েও এবার বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
ইমরোজ আহমেদের তথ্য অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আলাদা মনিটরিং কমিটি কাজ করছে। পাশাপাশি ক্রীড়াবিদদের অ্যান্টি-ডোপিং, সেফগার্ডিং এবং প্রতিযোগিতা প্রভাবিত করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে।
জাপানে যাওয়ার আগে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের আচরণবিধি সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। কোথায় কীভাবে থাকতে হবে, কোন ধরনের কর্মকাণ্ড করা যাবে কিংবা যাবে না—এসব বিষয়েও দলকে আগেই অবহিত করা হয়েছে।
এশিয়ান গেমসে এবার বড় বহর নিয়ে গেলেও পদকের মূল প্রত্যাশা চার ডিসিপ্লিনে—কাবাডি, আর্চারি, শুটিং ও ক্রিকেট। তবে বিওএর আশা, প্রত্যাশার তালিকার বাইরে থাকা উশু, জুডো ও কারাতের মতো ডিসিপ্লিন থেকেও চমক আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে জাপান থেকে বাংলাদেশের অর্জনের পাল্লা কতটা ভারী হয়।


