স্মৃতি মান্ধানার দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে ১৪৭ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে এশিয়ান গেমসে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নারী ক্রিকেটে স্বর্ণপদক জিতেছে ভারত। মঙ্গলবার নাগোয়ার কোরোগি অ্যাথলেটিক পার্কে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ব্যাট হাতে ঝড় তোলেন মান্ধানা। তাঁর ৪৫ বলে ৭৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংসের ওপর ভর করে ভারত গড়ে এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে নারী ক্রিকেটের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।
২০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ভারত তোলে ২১৬ রান। ইনিংসে ছিল ১৮টি চার ও ১৩টি ছক্কা। জবাবে ভারতীয় বোলারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি শ্রীলঙ্কা। ১৫.৪ ওভারে মাত্র ৬৯ রানে অলআউট হয়ে রুপার পদক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের।
এই জয়ে এশিয়ান গেমসে নারী ক্রিকেটে নিজেদের দ্বিতীয় সোনা নিশ্চিত করল ভারত।
মান্ধানার ব্যাটে ঝড়
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতের অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌর। ইনিংসের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন স্মৃতি মান্ধানা ও শেফালি ভার্মা।
দুজন মিলে মাত্র ১০ ওভারে ৯৯ রানের দুর্দান্ত জুটি গড়েন। তবে ২৯ বলে ৪৮ রান করে শেফালি অপ্রয়োজনীয় রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন।
এর আগেই নিজের অর্ধশতক পূরণ করেছিলেন মান্ধানা। এরপর আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠেন ভারতের এই ওপেনার। শ্রীলঙ্কার বোলারদের যেকোনো ভুল বলকে সীমানাছাড়া করেন তিনি। তাঁর ৪৫ বলের ইনিংসে ছিল ৫টি চার ও ৭টি ছক্কা।
ইনিংসের ১৭তম ওভারে বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে ভারতকে বড় সংগ্রহের ভিত্তি তৈরি করে দেন মান্ধানা।
শেষদিকে রিচা-ভারতীর তাণ্ডব
মান্ধানা ফেরার পর ভারতের রান তোলার গতি আরও বাড়িয়ে দেন রিচা ঘোষ ও ভারতী ফুলমালি। বিশেষ করে শেষ ওভারে শ্রীলঙ্কার মিথালি আয়োধ্যার ওপর চড়াও হন তারা।
শেষ ওভার থেকেই ভারত সংগ্রহ করে ২৫ রান। মিথালি আটটি ওয়াইডসহ মোট ২৫ রান দিয়ে বসেন। রিচা ঘোষ মাত্র ২২ বলে ৪৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ৬টি চার ও ৩টি ছক্কা। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ২১৬ রান করে ভারত, এশিয়ান গেমসে নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।
৬৯ রানেই শেষ শ্রীলঙ্কা
বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে শ্রীলঙ্কা। ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে তারা। অধিনায়ক চামারি আতাপাত্তু ২৯ রান করে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ করেন। কিন্তু তাঁর ইনিংসও দলকে ম্যাচে ফেরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ১৫.৪ ওভারে মাত্র ৬৯ রানে অলআউট হয় শ্রীলঙ্কা। ফলে ১৪৭ রানের বিশাল জয় নিয়ে স্বর্ণপদক নিশ্চিত করে ভারত।
‘ভারতের প্রথম সোনা জিততে পেরে ভালো লাগছে’
এটি ছিল এবারের এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রথম স্বর্ণপদক। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মান্ধানা বলেন, দেশের হয়ে প্রথম সোনা জিততে পারাটা বিশেষ অনুভূতি। মান্ধানা বলেন, “ভারতের হয়ে প্রথম স্বর্ণপদক জিততে পারাটা দারুণ ব্যাপার। অসাধারণ লাগছে। আমরা টেলিভিশনে অন্য ক্রীড়াবিদদের স্বর্ণপদক জিততে দেখেছি। এবার নিজেরাই পডিয়ামে দাঁড়াতে পারছি, এটা সত্যিই ভালো লাগার।” অন্যদিকে অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌরও দলের ব্যাটিং নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, মান্ধানা ও শেফালির শুরুটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“স্মৃতি ও শেফালি আবারও আমাদের দারুণ শুরু এনে দিয়েছে। এরপর একাধিক জুটি গড়ে উঠেছে, যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা খুব ভালোভাবে নিজেদের কাজ করেছে এবং ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আমরা যা চেয়েছিলাম, শেষ পর্যন্ত তা অর্জন করতে পেরেছি,” বলেন হারমানপ্রীত।
ব্রোঞ্জ পাকিস্তানের, বাংলাদেশের বিদায়
এদিকে নারী ক্রিকেটের ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে বাংলাদেশকে ৩১ রানে হারিয়েছে পাকিস্তান। প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৪৫ রান করে পাকিস্তান। শুরুতে মাত্র ১২ ওভারে ৬৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে তারা। সেখান থেকে পাকিস্তানের অধিনায়ক ফাতিমা সানা দলের ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
ফাতিমা ৩০ বলে ৪৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ৩টি চার ও ৩টি ছক্কা। আলিয়া রিয়াজের সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে তাঁর ৬৭ রানের জুটি পাকিস্তানকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়।
জবাবে বাংলাদেশ ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১১৪ রান করতে সক্ষম হয়। ফলে ৩১ রানের জয় নিয়ে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করে পাকিস্তান। ফাইনালের পর স্বর্ণজয়ী ভারত, রুপাজয়ী শ্রীলঙ্কা ও ব্রোঞ্জজয়ী পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা একসঙ্গে পডিয়ামে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন।
‘এশিয়ান গেমসে সোনা আমাদের কাছে অনেক কিছু’
হারমানপ্রীত কৌর জানান, বহু-ক্রীড়া আসরে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা ভারতের নারী ক্রিকেট দলের জন্য এখনও খুব বেশি নয়। তাই এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয় তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ভারতীয় অধিনায়ক বলেন, “আমরা বহু-ক্রীড়া আসরে খেলার সঙ্গে খুব বেশি অভ্যস্ত নই। তাই এটি আমাদের কাছে অনেক অর্থ বহন করে। আমরা খুবই আনন্দিত যে এই দরজা খুলতে পেরেছি। আশা করি, ভবিষ্যতে ভারতের জন্য আরও অনেক স্বর্ণপদক আসবে।” তিনি আরও বলেন, এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপানে আসার জন্য দলটি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিল।
টানা দ্বিতীয়বার নারী ক্রিকেটে এশিয়ান গেমসের স্বর্ণপদক জিতে ভারত সেই অপেক্ষারই সফল সমাপ্তি টানল। আর স্মৃতি মান্ধানার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে পাওয়া এই জয় ভারতের নারী ক্রিকেটে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে আধিপত্য আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।




